সুসজ্জিত অর্জুন রঙ্গ-প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত মানুষের উৎসাহ-ধ্বনি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের কানে এসে পৌঁছল। তিনি সহর্ষে বিদুরকে জিজ্ঞাসা করলেন–এ কিসের শব্দ বিদুর! বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের গর্জনের মতো এই শব্দ কিসের? বিদুর বললেন–পাণ্ডব অর্জুন অস্ত্রসজ্জিত হয়ে রঙ্গস্থলে প্রবেশ করেছেন। তারই এই শব্দ। ধৃতরাষ্ট্র বললেন–কুন্তীর গর্ভ থেকে যে তিন পাণ্ডব জন্মেছে, তাদের জন্য আমার গর্ব হয়। আমার বিশ্বাস এই কুরুবংশকে তারা রক্ষা করবে।
রঙ্গমঞ্চের সমস্ত মানুষ একই সঙ্গে আনন্দিতও হল, স্তব্ধও হল। সকলে এখন অর্জুনের যুদ্ধ-কৌশল দেখতে চায়। অর্জুন দ্রোণাচার্যের দিকে তাকিয়ে তার অস্ত্রশিক্ষার কৌশল দেখাতে আরম্ভ করলেন। অর্জুন আগ্নেয় অস্ত্র দ্বারা আগুন সৃষ্টি করলেন, বরুণাস্ত্রে সৃষ্টি করলেন জল। রঙ্গমঞ্চে প্রবল হাওয়া উঠল। বোঝা গেল–এ হল অর্জুনের বায়ব্য অস্ত্রের কৌশল। রঙ্গমঞ্চে বৃষ্টি হল অর্জুনের পর্জন্য-অস্ত্রের সুনিপুণ প্রয়োগে। বস্তুত অর্জুনের এই অস্ত্র-কৌশল বর্ণনা করার সময় মহাভারতের কবি উপমার অঙ্গুলি–সংকেতে গৌণ বস্তুকে মুখ্য করে দেখানোর চেষ্টা করেননি। এ বর্ণনা এতই সরল, এতই সেটা সাদামাটা যে মনে হবে–মহাভারতের কবির পক্ষে সে একেবারেই অনুপযুক্ত। আসলে কবি জানেনএই অস্ত্রকৌশল বর্ণনা করার ভাষা হয় না। অতএব কতগুলি অলৌকিক মাত্রা যোগ করে ব্যাস লিখলেন–এই তিনি পর্বতাস্ত্রে পর্বত সৃষ্টি করলেন, এই ভৌম অস্ত্রে পাতাল প্রবেশ করলেন আবার কখনও বা অন্তর্ধান-অস্ত্রে অন্তর্হিত হলেন। এই সাধারণ বর্ণনার মধ্যে লৌকিক অতি বৈচিত্র্যের ঘটনা এইটুকুই যে, অর্জুন একটি লোহার তৈরি ঘুরন্ত শূকরছানার মুখে পরপর পাঁচটি বাণ গেঁথে দিলেন–ভ্রমতশ্চ বরাহস্য লৌহস্য প্রমুখে সম–অথবা দড়িতে বাঁধা একটি ঝুলন্ত গোরুর শিঙের মধ্যে গব্যে বিষাণকোষে চ চলে, রজ্জ্বাবলম্বিনি–একসঙ্গে একুশটা বাণ প্রবেশ করিয়ে দিলেন।
অর্জুন তার অসি যুদ্ধের কৌশলও দেখালেন, দেখালেন গদাযুদ্ধের কৌশলও। অর্থাৎ ধনুর্বেদে বিশেষজ্ঞ হলেও অন্যান্য অস্ত্রবিদ্যাও তাঁর করায়ত্ত বটে। অর্জুন তার অস্ত্রের নিপুণতায় সমস্ত রঙ্গমঞ্চ একেবারে মুখর করে দিয়েছেন। সকলের উৎসাহ-ধ্বনি আর বাদ্যধ্বনি মিশে সে এক আকুল অবস্থা। ধনুর্বেদের বিচিত্র কৌশল দেখে রঙ্গমঞ্চের আসনে বসা সমস্ত মানুষ যখন একেবারে অভিভূত হয়ে রয়েছেন, অর্জুনের প্রদর্শনীও যখন শেষ হয়ে আসছে, শব্দ-চিৎকারও যখন কিছু মন্দীভূত–মন্দীভূতে সমাজে চ বাদিত্ৰস্য নিঃস্বনে–ঠিক তখনই রঙ্গমঞ্চের দ্বারদেশে একটি একক হাততালি শোনা গেল। সে শব্দ বড় প্রখর, বড় কঠিন; সেই হাততালির মধ্যে কর্তা পুরুষের অহংকার আছে, আর আছে পরপক্ষের প্রতি অবজ্ঞা–দ্বারদ্বেশাৎ সমুদ্ভূত মাহাত্মবলসূচকঃ।
হাততালির আওয়াজে এতটাই জোর ছিল যে রঙ্গমঞ্চে সকলের দৃষ্টি অর্জুনের দিক থেকে সরে গিয়ে সেই দ্বারদেশে পতিত হল। কেউ বলল–আরে পাথর ফাটাচ্ছে নাকি? কেউ বলল–ভূমিকম্প হচ্ছে যেন। রঙ্গমঞ্চের দর্শকাসন থেকে নানা বিস্ময়সূচক মন্তব্য ভেসে এল, কিন্তু সকলের চোখ কিন্তু একসঙ্গে সেই দ্বারপ্রান্তে দ্বারঞ্চাভিমুখো সর্বে বভূবুঃ প্রেক্ষকাস্তদা। অর্জুনের অস্ত্র-প্রদর্শনীর শেষ মুহূর্তে দ্রোণাচার্য তার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিলেন। দ্বারপ্রান্তে আগন্তুকের বাহু–স্ফোটন–শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ ভাই পাণ্ডব দ্রোণাচার্যকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদেরও সকলের চোখ দ্বারপ্রান্তে।
অর্জুনের অস্ত্র-প্রদর্শনীর কৌশলে রঙ্গমঞ্চের সমস্ত সাধারণ জনেরা যতই আমোদ লাভ করুন, ব্যাপারটা কুরু-ভাইদের জ্যেষ্ঠ দুর্যোধনের কাছে মোটেই সুখের ছিল না। মুহূর্তে মুহূর্তে তাকে যন্ত্রণা দিচ্ছিল পরপক্ষের এই অসাধারণ উন্নতি। ঠিক এই রকম একটা সময়ে অর্জুনের প্রতি তাচ্ছিল্যসূচক হাততালি শুনে দুর্যোধন দর্শকাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। উঠে দাঁড়ালেন তার একশো ভাই এবং গুরুপুত্র অশ্বত্থামা। দুর্যোধন সবাইকে নিয়ে সেই রঙ্গমঞ্চের দ্বারপ্রান্তে এসে মহাবীর আগন্তুককে স্বাগত জানালেন। দুর্যোধন তার পুরাতন বন্ধুকে চিনতে পেরেছেন। ছোটবেলায় অস্ত্রশিক্ষার সময় থেকেই দুর্যোধন এই আগন্তুককে পছন্দ করেন। পছন্দ করার একটাই হেতু। পাণ্ডব অর্জুনকে হেনস্থা করার ব্যাপারে তিনি দুর্যোধনের সঙ্গে একাত্মক ব্যবহার করেছেন চিরকাল। একশোভাই মিলে দুর্যোধন যখন আগন্তুককে ঘিরে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা জানালেন, তখন তাকে দেখতে লাগছিল–দেবতাদের দ্বারা পরিবৃত ইন্দ্র যেন-পুরন্দরো দেবগণৈঃ সমাবৃতঃ।
মহাভারতের কবি প্রথমেই তার পরিচয় না দিলেও আমরা বুঝতে পারছি–ইনি কর্ণ। গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে ব্রহ্মাস্ত্রলাভে ব্যর্থ হয়ে তিনি আশ্রম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন অন্যত্র। হয়তো শিক্ষার শেষে আজও তিনি তাঁর পূর্ব প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভুলতে পারেননি। অতএব প্রথম সুযোগেই অর্জুনকে দমিয়ে দেবার জন্য আজ এই রঙ্গমঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন কর্ণ। তবে কর্ণের এই উপস্থিতির একটা পূর্ব ইতিহাস আছে। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয় যে, কর্ণ অর্জুনকে হত্যা করার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে ব্রহ্মাস্ত্র যাচনা করেছিলেন এবং প্রত্যাখ্যাতও হয়ে গেছেন।
