যে বস্তুর জন্য এত অপেক্ষা এত পরিশ্রম, এমনকি যার জন্য দেব-দানবের চিরন্তন বিরোধ পর্যন্ত সাময়িকভাবে মিটে গেছে, সেই অমৃত উঠেছে–এবারে কিন্তু প্রথমে দৈত্য-দানবের মধ্যে একেবারে শশারগোল পড়ে গেল। সবাই বলে আমি নেব অমৃত। এ বলে, আমি খাব ও বলে, আমি খাব –অমৃতার্থে মহান্নাদো মমেদমিতি জল্পতা। মহাভারত, কী পুরাণ এতক্ষণ যেমন দেখেছেন, তাতে সম্পূর্ণ সমুদ্র মন্থনকালে অসুর দানবেরা সবাই একেবারে নীরব ছিলেন। দেবতারা যেভাবে কথাটা বলেছিলেন, অর্থাৎ অমৃত পাওয়া গেলে সমান ভাগে ভাগ করে নেব আমরা, সেই কথাটায় অসুরেরা এত বিশ্বাস করেছিলেন যে, অন্য কোনও পদার্থ-হাতি ঘোড়া পারিজাত ফুল,কৌস্তভ মণি কিচ্ছুটি তারা চাননি। একটি একটি করে ভাল জিনিস উঠেছে, সবই দেবতারা ভাগ করে নিয়েছেন–যতে দেবাস্তবতা জগুরাদিত্যপথমাশ্রিতা। তারপর তিন ভুবনের ধনৈশ্বর্যবিধায়িনী লক্ষ্মীও যখন ভগবান নারায়ণের বক্ষঃলগ্না হলেন, তখন তারা তাদের একমাত্র ভরসা ধন্বন্তরীর হাতে রাখা অমৃত পাত্রের দিকে হাত বাড়ালেন
ততস্তে জগৃহ দৈত্যা ধৰন্তরিকরে স্থিত।
কমণ্ডলুং মহাবী যত্রাস্তে ত দ্বিজামৃত।
এত চেষ্টা সত্ত্বেও অমৃত লাভ করা সম্ভব হল না দৈত্যদের পক্ষে। ভগবান নারায়ণ দেবতাদের আগেই কথা দিয়েছিলেন অতএব সেই মতো তিনি অপূর্ব মোহিনী মূর্তি ধারণ করে দাঁড়ালেন দৈত্যদের সামনে। মোহিনী রমণীর রূপ দেখে অসুরেরা এতটাই মোহিত হলেন যে, তারা পরম বিশ্বাসে ধন্বন্তরীর হাত থেকে কেড়ে নেওয়া সেই অমৃতের কমণ্ডলু দিয়ে দিলেন রমণীর হাতে। রমণী মায়াবিনী– সমস্ত দৈত্যকে তিনি পংক্তি ভোজনে বসিয়ে দিলেন, কিন্তু অমৃতের ভাগ তিনি দিলেন না। দৈত্যরা শুধু চেয়ে চেয়ে রমণীর ললিত-গতি, উচ্চাবচ শরীর বিভঙ্গ দেখে মেতে রইল।
ভারি আশ্চর্য, লোকের ধারণা– কালো মেয়ে নাকি (সৌন্দর্যের) কোনও কনসেপ্টের’ মধ্যে আসে না, কিন্তু মহাভারতের কবি যেহেতু পরেও বিশেষত দ্রৌপদীর মধ্যে কালো মেয়ের শ্ৰেষ্ঠতা নিরূপণ করবেন, অতএব এই মোহিনী মূর্তির মধ্যেও আমরা সেই কালো রূপের মর্যাদা দেখতে পাব। মহাভারতের কবি যেহেতু অতি সংক্ষেপে এই বর্ণনা সেরেছেন, অতএব এখানে না পেলেও আমরা ভাগবত পুরাণে খবর পেয়েছি যে, বিষ্ণুর সেই মোহিনী মায়া মুর্তি ছিল নিকষ কালো–প্রেক্ষনীয়োৎপলশ্যামাং সাবয়ব-সুন্দর। নবীন বয়সী রমণীর কাঞ্চী দামে উদ্বেলিত হাঁটা চলায় তথা স্তনভারকৃশোদরী’ মোহিনীর উদ্দাম কটাক্ষে বশীভূত দৈত্য দানবদের মনে জেগে উঠল কামনার আগুন–দৈত্য-যুথপ চেতঃস্ কামম্ উদ্দীপয়ন্ মুহুঃ। যারা এতক্ষণ, অমৃত পানের জন্য ‘অহং পূর্বং অহং পূর্বং’–আমি আগে আমি আগে–করছিলেন, তাঁরা স্তব্ধ হয়ে বসে শুধু রমণীর কটাক্ষ ভিক্ষা করছিলেন।
আর এই মোহিনীও তো যে সে নয়, স্বয়ং বিষ্ণু দৈত্যদের প্রতারণা করার নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই মোহিনী মূর্তি ধারণ করেছিলেন। তাছাড় মনোহরণ শরীর বিভঙ্গেই শুধু নয়, পদ্মপুরাণ বলেছে– মোহিনী দৈত্যদের আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন– আমি তোমাদের, তোমাদের ঘরেই আমি থাকব– যুস্মাকং বশগা ভূত্বা স্থস্যামি ভবতাং গৃহে। বিলুব্ধ দৈত্যরা রমণীকে লাভ করার বিশ্বাসে তারই হাতে অমৃতের পাত্র ন্যস্ত করলেন। আর তখনই তারা দেখতে। পেলেন–মোহিনী সেই অমৃত দেবতাদের পান করিয়ে দিলেন তাদেরই সামনে, আর এক একটি লোল অপাঙ্গ-পাতে দৈত্যদের থামিয়ে রাখলেন শুধুই।
সময় বেশি লাগেনি। দৈত্য-দানবেরা খানিক পরেই বুঝলেন–সব মায়া; বিষ্ণুর মোহিনী মায়ায় তারা প্রতারিত হয়েছেন। দেবতা এবং দানবদের মধ্যে আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এরই মাঝখানে অমৃত বিন্দু লাভ করে রাহু কেতুর কী অবস্থা হল, সে ঘটনা আর বলছি না। কারণ সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণ এই রাহু-কেতুর রূপক আবরণে বাঁধা আছে। আমাদের বক্তব্য সেই দেবাসুর যুদ্ধে অসুরদের শেষ পর্যন্ত পরাজয় ঘটেছিল, কারণ দেবতারা পূর্বাহ্নেই অমৃত পানে বলীয়ান হয়েছিলেন।
অমৃত জিনিসটা যে কী, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে রীতিমতো মতভেদ আছে। কেউ বলেন–সোমরস, কেউ বলেন-সোম অর্থাৎ চাঁদের জ্যোৎস্নাই অমৃত আবার কেউ বলেন–অমৃত অমৃতই, সোম বা চাঁদ হলেন সেই অমৃত ধারণ করার পাত্র-মাত্র। এ বিষয়ে আমাদের একটা নিজস্ব প্রস্তাব আছে। সহৃদয় পাঠকুল সে প্রস্তাব মানতেও পারেন আবার উপযুক্ততর প্রমাণ দিয়ে সে প্রস্তাব অমূলক প্রতিপন্ন করতে পারেন। বস্তুত অমৃত বস্তুটা কী তার সম্বন্ধে কিছু ধারণা পাওয়া যাবে।
আমি আগে অন্যান্য পুরাণের প্রমাণে জানিয়েছি যে, অমৃত মন্থনের আগে দেবতারা কোনওভাবেই অসুরদের সঙ্গে পেরে উঠছিলেন না। তারা বারংবার অসুরদের হাতে প্রহার লাভ করছিলেন এবং অনেকে মারাও পড়ছিলেন। এখন যেহেতু সমুদ্র মন্থন করে অমৃত উঠে এসেছে, অতএব কথাটা আরও একটু অন্যভাবে বলতে চাই। আপনারা মৎস্য পুরাণের মতো প্রধান এবং প্রাচীন পুরাণে দেখবেন-সেকালে দেবতা এবং অসুরদের যুদ্ধ আরম্ভ হলে বেশি সংখ্যায় মারা পড়তেন দেবতারাই–পুরা দেবাসুরে যুদ্ধে হতাসবঃ সুরাঃ। কিন্তু দানব-দৈত্যরা যদি ভীষণভাবে আহত হয়ে মরণোন্মুখও হতেন, তবে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য তার সঞ্জীবনী মন্ত্রে বাঁচিয়ে তুলতেন তাদের। শুধুই মন্ত্র কিনা জানি না, কিন্তু দৈত্যগুরু মন্ত্রের সঙ্গে এমন ওষুধ দিতেন তার শিষ্য দৈত্যদের যাতে ক্ষত নিরাময় তো হতই, তারা মৃত্যুর মুখ থেকে জেগে উঠতেন সুপ্তোখিতের মতো জীবাপয়তি দৈত্যেন্দ্রা যথা সুপ্তোপিতানিব। এই মৃত সঞ্জীবনের মন্ত্র নাকি শুক্ৰ শিখেছিলেন দেবদেব মহেশ্বরের কাছ থেকে। একমাত্র শুক্র ছাড়া যেহেতু ব্ৰহ্মা বিষ্ণু, সুর নর দানব কেউই এই মাহেশ্বরী বিদ্যা জানতেন না, অতএব সর্বত্র শুক্রাচার্যের মর্যাদা ছিল আলাদা, তার মেজাজও ছিল আলাদা। এই প্রসঙ্গেই কচ-দেবযানীর কথাই পরে আসবে, তবে সে কথা পরেই হবে। আপাতত জানাই–শুক্রাচার্য যেহেতু অসুরপক্ষপাতী ছিলেন, তাই এই বিদ্যার প্রভাবে অসুরদের সবটাই ছিল সুবিধা আর অন্যদিকে দেবতাদের অসহায় মৃত্যু। তবে আমার মতে এই বিদ্যা যতটা মন্ত্রময়ী তার থেকেও বেশি ওষধিময়ী। ঠিক এই রকম একটা অবস্থায় অসুরদের বাড়বাড়ন্ত দেখে দেবরাজ ইন্দ্র, দেবগুরু বৃহস্পতি এবং অন্যান্য দেবতা একেবারে হতাশ হয়ে সমুদ্র মন্থনের কথা ভাবতে আরম্ভ করেন।
