বিদুর এবং কুন্তী কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর কাছে তাদের নিপুণ ধারাভাষ্য দিয়ে চলেছেন–ন্যবেদয়তাং তৎসর্বং কুমারাণাং বিচেষ্টিত।
এতক্ষণ কুমারগণ যে একক অস্ত্রকৌশল দেখাচ্ছিলেন, এখন দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের কারণে সেই কৌশল-সূক্ষ্মতা চাপা পড়ে গিয়ে দর্শকাসনে নতুন উন্মাদনার সৃষ্টি হল। ভীম অত্যন্ত দীর্ঘকায় এবং শারীরিকভাবে অতিবলশালী। গদাযুদ্ধে শরীরের এই ভার এক নতুন মাত্রা যোগ করে। অন্যদিকে দুর্যোধন ভীমের চেয়ে শারীরিকভাবে কম সম্পন্ন হলেও তার কৌশল-শিক্ষা অনেক বেশি, অভ্যাসও অনেক বেশি। দুর্যোধন যেটা কৌশল করেন, ভীম সেটা পূরণ করেন গায়ের জোরে। দুজনে দু-চারবার গদা-ঠোকাঠুকি করতেই উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে তুমুল চিৎকার আরম্ভ হল। সম্পূর্ণ রঙ্গস্থল মোটামুটি দুভাগ হয়ে গেল। একদল–ভীম জিতবেন, ভীম জিতবেনবলে চেঁচাচ্ছে, আরেক দল দুর্যোধন, দুর্যোধন বলে চেঁচাচ্ছে–জয় হে কুরুরাজেতি জয় হে ভীম ইত্যুত। দর্শকদের এই দ্বিধাকৃত চিৎকার-শব্দের সঙ্গে বাজনদারদের উৎসাহসূচক বাদ্যধ্বনি মিশে সম্পূর্ণ রঙ্গস্থল এক অতি বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের আকার ধারণ করল–ক্ষুব্ধার্ণবনিভঃ রঙ্গ।
ভীম এবং দুর্যোধন পরস্পর হানাহানি আরম্ভ করলেন। কেউ কিছু কম যান না। দুজনের লৌহগদার ঠোকাঠুকিতে উল্কাপাত ঘটতে আরম্ভ করল। দর্শকাসন থেকে জনপদবাসীরা মুষ্টি উত্তোলন করে দাঁড়িয়ে পড়ছে উত্তেজনায়। প্রলয় চিৎকার আরম্ভ হয়েছে–ভীম, ভীম! দুর্যোধন, দুর্যোধন–পুরুষাণাং সুবিপুলাঃ প্রণাদাঃ সহসোখিতাঃ।
গুরু দ্রোণাচার্য দেখলেন–ভীম-দুর্যোধনের দ্বন্দ্বে জনপদবাসীরা যেভাবে পক্ষপাতগ্রস্ত হয়ে একেক জনের প্রতি আত্মীয়তাবোধ করছে–পক্ষপাতকৃতস্নেহঃ স দ্বিধবাভজ্জনঃ–তাতে উৎসাহিত হয়ে এই দুই বীর যে কোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। দ্রোণাচার্য নিজপুত্র অশ্বত্থামাকে কাছে ডেকে বললেন–দেখ,ভীম এবং দুর্যোধন দুজনেই পরম বীর এবং দুজনেই গদাযুদ্ধে পরম সুশিক্ষিত। কিন্তু এঁদের দ্বন্দ্ব অবলম্বন করে দর্শকাসনে যে উন্মাদনা এবং উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে যে কোনও মুহূর্তে এই দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দর্শকাসনে ছড়িয়ে পড়বে। এরা চেঁচাচ্ছে, বাজি রাখছে এবং যেভাবে উত্তেজনা বাড়িয়ে চলেছে, তাতে যে কোনও সময় এদের নিজেদের মধ্যেই লড়াই লেগে যাবে। সেটা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যোভূদ্রঙ্গে প্রকোপোয়ং ভীম–দুর্যোধনোবঃ! দ্রোণাচার্য অশ্বত্থামাকে বললেন–তুমি যাও। এখনই কোনও কিছু সাংঘাতিক কাণ্ড ঘটে যাবার আগেই, তুমি এই দুই বীরকে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ থেকে বিযুক্ত করবারয়ৈতৌ মহাবীর্যৌ কৃতযোগ্যাবুবপি।
অশ্বত্থামা নেমে এলেন রঙ্গস্থলে। এসে দেখলেন–প্রলয়কালীন সমুদ্রে হাওয়া লাগলে সমুদ্রের যেমন উথাল-পাথাল অবস্থা হয়, দর্শকদের চিৎকার-পক্ষপাত, বাদ্যধ্বনি এবং উত্তেজনার হাওয়ায় ভীম-দুর্যোধনেরও সেই অবস্থা হয়েছে–যুগান্তানিল-সংক্ষুক্কেী মহাবেলা বিবার্ণবৌ। অশ্বত্থামা, ভীম এবং দুর্যোধনের নাম করে চেঁচাতে লাগলেন। বারবার বলতে লাগলেন–গুরু দ্রোণাচার্য বারণ করছেন, তোমরা বিযুক্ত হও। এর পরেও পূর্ববেগের তাড়নায় আরও দু-একবার গদা হানাহানি করে ভীম এবং দুর্যোধন পরস্পর পরস্পরের দিকে ঘৃণার বাষ্প ছড়িয়ে অগ্নিচক্ষু হেনে অশ্বত্থামার মর্যাদা রক্ষা করলেন–ততস্থাবুদ্যতগদৌ গুরুপুত্রেণ বারিতৌ।
১০৫. ভীম-দুর্যোধনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
১০৫.
ভীম-দুর্যোধনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন তুঙ্গ মাত্রায় পৌঁছেছিল যে অশ্বত্থামা এই দুই মহাবীরকে বিযুক্ত করার পরেও বাজনদারেরা তাদের বাজনায় বিরাম দেয়নি। এবার গুরু দ্রোণাচার্য নিজে তাঁর দর্শন–মঞ্চ ত্যাগ করে নেমে এলেন রঙ্গভূমিতে এবং প্রথমেই তিনি হস্ত উত্তোলন করে বাদ্যকরকে থামতে বললেন। দর্শকাসনের জনপদবাসীরা স্তব্ধ হয়েছে, স্তব্ধ হয়েছে বাদ্যধ্বনি, দ্রোণাচার্য জলদগম্ভীর স্বরে তার শিষ্যদের প্রতিযোগিতা প্রদর্শনীর শেষ আকর্ষণ ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন–আমার পুত্রের চেয়েও যে আমার প্রিয় এবং সমস্ত অস্ত্র চালনার কৌশল যে নিপুণভাবে শিক্ষা করেছে–যো মে পুত্ৰাৎ প্রিয়তরঃ সর্বশস্ত্রবিশারদঃ–সেই অর্জুনের অস্ত্রশিক্ষার কৌশল দেখুন আপনারা। ইনি স্বয়ং ইন্দ্রপুত্র, বিষ্ণুর মতো তার পরাক্রম।
দ্রোণাচার্যের কথা শুনে অর্জুন বুঝলেন–এবার তার সময় হয়েছে। তিনি প্রস্তুতি নিলেন অস্ত্রের প্রদর্শনীর জন্য। শরনিক্ষেপের পর ধনুগুণের উলটো আঘাত যাতে হাতে না লাগে তার জন্য হাতে একটি চর্মময় আবরণ পরলেন অর্জুন। একে বলে গোধা। হাতের আঙুলে পরলেন অঙ্গুলিস্রাণ। পৃষ্ঠে বাণপূর্ণ তৃণ, দেহে সোনার বর্ম। সব মিলিয়ে অর্জুনের নিকষ-কালো গায়ের রঙের মধ্যে ঝকঝকে তৃণের জ্যোতি আর সোনার বর্ম এমন ঝলসাতে লাগল যেন মনে হল সন্ধ্যাকালের ঘন মেঘে বিদ্যুৎ খেলছে–সার্কঃ সোয়ুধতড়িৎ সসন্ধ্য ইব তোয়দঃ।
দর্শকদের আসন থেকে কেউ মন্তব্য করল–আরে এটা সেই কুন্তীর ছেলে। মধ্যম পাণ্ডব বলে পরিচিত বটে, কিন্তু আসলে ইন্দ্রের পুত্র। অন্য জন বলল–অস্ত্র–শস্ত্রের কথাই বল আর ধর্মতত্ত্বের কথাই বল–সব জানে এই ছেলেটা। অন্যের স্বভাব যেমন বোঝে, তেমনই এর নিজের স্বভাবটাও খুব ভাল। দর্শকাসনের নানান প্রশংসাসূচক মন্তব্য ভেসে আসতে লাগল দক্ষিণ দিকের সুউচ্চ মঞ্চে বসা জননী কুন্তীর কানে। পুত্রের গর্বে এবং স্নেহে তার বুকের দুধ উৎলে উঠল যেন–কুন্ত্যাঃ প্রশ্নব-সংযুক্তৈরঃ ক্লিন্নমুরোভবৎ–আনন্দে তার চোখে জল এসে গেল।
