ধৃতরাষ্ট্রের দক্ষিণা-উপহার সম্পন্ন হওয়ার পর আবারও পুণ্যাহ ঘোষণা করলেন ব্রাহ্মণেরা–অথ পুণ্যাহঘোষস্য পুণ্যস্য সমনন্তর–আর ঠিক তার পরেই রাজকুমাররা তাদের অস্ত্র-শস্ত্রের সম্ভার নিয়ে প্রদর্শনী মঞ্চে প্রবেশ করলেন। কুমারগণ প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই দর্শকাসন থেকে তুমুল হর্ষধ্বনি হল এবং কুমারেরা তাদের কৌশল প্রদর্শনের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। অস্ত্রভার নামিয়ে রেখে তাদের কেউ কটিদেশের বস্ত্র ভাল করে এঁটে নিলেন, কেউ কঁধ এবং উদরের বস্ত্রখণ্ড ঠিক-ঠাক করে নিলেন, অতিরিক্ত অস্ত্রঘর্ষণে আঙুল ফেটে যায় বলে অঙ্গুলি-ত্রাণ ধারণ করলেন কেউ–ততো বদ্ধাঙ্গুলিত্ৰাণা বদ্ধকক্ষা মহারথাঃ। যাঁরা তীর-ধনুকের কৌশল দেখাবেন, তারা স্কন্ধে তৃণ-সন্নিবেশ করে ধনুকের গুণ পরালেন টেনে টেনে, টংকার দিয়ে, এবং আবারও টেনে তীরমোক্ষণের একান্ত উপযোগী করে।
মহামতি বিদুর অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে কুমারদের অস্ত্রশিক্ষা-প্রদর্শনের ধারাভাষ্য শোনানোর জন্য প্রস্তুত হলেন। অন্যদিকে মনস্বিনী কুন্তী সমস্ত ঘটনার অনুপুঙ্খ বিবরণ শোনাতে লাগলেন আবৃত-নয়না গান্ধারীকে। মহাভারতের কবি যেমন বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখছি–বয়সের অনুক্রমেই অস্ত্রপ্রদর্শনী আরম্ভ হয়েছিল কুমার যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে–অনুজ্যেষ্ঠন্তু তে তত্র যুধিষ্ঠির-পুরোগমাঃ। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আরও অন্যান্য কুরু কুমাররাও ছিলেন বলেই মনে হয় এবং তাঁদের নাম এবং বীরত্বও তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এঁরা প্রস্তুত হবার সঙ্গে সঙ্গে এদিক-ওদিক নানাভাবে বাণ ছুঁড়তে লাগলেন। কখনও ঘোড়ার পিঠে চড়ে ছুটতে ছুটতে বাণ-চালনা করছেন, কখনও বা ছুটন্ত ঘোড়া হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে লক্ষ্যভেদ করছেন।
প্রত্যেকটি বাণেই কুমারদের নিজস্ব নাম লেখা ছিল। কাজেই বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না কে কৃতিত্বের অধিকারী। দ্রোণাচার্যের শকুন-লক্ষ্যভেদে সকলেই প্রায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন। বলে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, রাজকুমাররা তেমন কিছু শেখেননি। আসলে সেই পরীক্ষার মধ্যে দ্রোণের আরও বড় পরীক্ষা ছিল। সেই পরীক্ষায় তারা ফেল করেছেন বটে, কিন্তু তাই বলে রঙ্গমঞ্চে সবার সামনে অস্ত্রবিদ্যার নানা কৌশল দেখাতে তাদের অসুবিধা হল না–চরস্ত্ৰং মহাবীর্যা কুমারাঃ পরমাদ্ভুত। কুমারদের শরচালনার ভয়ে দর্শকাসনে বসে থাকা হস্তিনাপুরের জনপদবাসীরা অনেকে মাথা নিচু করে নিজেদের প্রাণ-বাঁচানোর চেষ্টা করল, যেন নিক্ষিপ্ত শরগুলি তাদের গায়ে এসেই লাগবে, অতএব চাচা আপন বাঁচা শিরাংস্যবননামিরে। গ্রাম্য-স্বভাববশত সবাই খুব ঠাসাঠাসি করে বসে থাকল, যেন একসঙ্গে থাকলেই তারা অনেক বিপদ থেকে রক্ষা পাবে। কিন্তু যে যাই করুক, যার যেমন ভাবই হোক কোনও অস্ত্-কৌশল দেখা থেকে তারা বিরত হচ্ছে না এবং বেশ মজাও পাচ্ছে তারা–মনুজা ধৃষ্টমপরে বীক্ষাঞ্চঃ সুবিস্মিতাঃ। সমস্ত আকাশ জুড়ে কৌরব-পাণ্ডবদের অস্ত্রোন্মাদনা দেখে সমস্ত দর্শক একদিকে যেমন অবাক হয়ে গেল, অন্যদিকে, তেমনই সাধুবাদ দিতে থাকল।
দ্রোণাচার্য এতটাই বড় করে রঙ্গমঞ্চের নকশা করেছিলেন যে, রথ, হাতি, ঘোড়া–সমস্ত বাহনে বসেই যেভাবে যুদ্ধাস্ত্র-চালনা করতে হবে সেটা যেন দেখানো যায়। আর অস্ত্রচালনার মধ্যে শুধু ধনুক-বাণই নয়, যাঁরা এতক্ষণ ধনুক-বাণের কৌশল শেষ করেছেন তারা আবার তরবারি চালানোর ক্ষমতাটুকুও ভালভাবে দেখিয়ে দিলেন। যুদ্ধে একটি যোদ্ধার সারথি, রথ, হাতি, ঘোড়া সব খোয়া যেতে পারে; অতএব সেই কথা মনে রেখে বাহনগুলি বাদ দিয়ে অসি-চালনার ক্ষিপ্রতা এবং দৃঢ়মুষ্টিতা দেখানো যেমন প্রয়োজন, সেইরকম শেষ অবলম্বন হিসেবে পরস্পর বাহুযুদ্ধের কৌশলও কুমারগণ একে একে সব দেখিয়ে দিল– গজপৃষ্ঠেশ্বপৃষ্ঠে চ নিযুদ্ধে চ মহাবলাঃ।
দ্রোণাচার্য সব আইটেমই একসঙ্গে ছেড়ে দেননি। এতক্ষণ যাঁরা অস্ত্র-কৌশল দেখালেন, তাদের মধ্যে যুধিষ্ঠির থেকে কৌরব-পাণ্ডব এবং অন্যান্য রাজকুমাররা সকলেই ছিলেন কিন্তু এঁদের মধ্যে অর্জুন তো ছিলেনই না। ছিলেন না ভীম এবং দুর্যোধনও। অর্জুনকে দ্রোণাচার্য প্রদর্শনীর শেষ আইটেম হিসেবে রেখেছেন। আর ভীম-দুর্যোধনের বিদ্যা হল বিশেষজ্ঞের ক্ষেত্র। ধনুঃশর নয়, বর্শা-ভল্ল নয়, গদাযুদ্ধ। কুমারগণের সাধারণ প্রদর্শনী শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে দ্রোণাচার্য ভীম এবং দুর্যোধনকে ইঙ্গিত করলেন রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করার জন্য।
কৌরব-পাণ্ডবদের অন্যান্য ভাইরা তখন রঙ্গস্থলের পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। এক প্রান্তে কৌরবদের ছাউনি থেকে দুর্যোধন বেরিয়ে এলেন। অন্য প্রান্ত পাণ্ডবদের ছাউনি থেকে বেরিয়ে এলেন ভীম। দুজনের হাতে দুটি মস্ত আয়সী গদা অর্থাৎ লোহার গদা। প্রথমটা যেমন হয়, দ্বন্দ্বযুদ্ধটা প্রথমেই আরম্ভ হয়। সামান্য একটু ওয়র্ম-আপ করার জন্য দুজনেই তাদের নিজ নিজ গদা দুটি বামাবর্তে এবং দক্ষিণাবর্তে খানিকক্ষণ ঘুরিয়ে নিয়ে হাতের জড়তা ভেঙে নিলেন–তৌ প্রদক্ষিণ-সব্যানি মণ্ডলানি মহাবলৌ। আস্তে আস্তে দুজনেই দুজনের দিকে এগোতে লাগলেন যেন দুই মত্ত কামুক হস্তী এক অদৃষ্টকায়া হস্তিনীর অধিকার লাভের জন্য এগোচ্ছে। মোটামুটি এঁদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছেন দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা। তিনি এঁদেরই সমবয়সী যুবক হলেও গুরুপুত্র এবং ব্রাহ্মণ বলে উভয়েরই সম্মানিত ব্যক্তি দ্বন্দ্ব–যুদ্ধে, কুস্তি কিংবা মুষ্টিযুদ্ধে আমরা মাঝখানে যেমন একজন রেফারিকে দেখি অশ্বত্থামা প্রায় সেই ভূমিকাতেই দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ ভীম এবং দুর্যোধন–দুজনেই দুজনের জন্ম-প্রতিদ্বন্দ্বী এবং এঁদের মধ্যে সেই কিলার ইনস্টিংক্ট আছে যাতে যে কোনও সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
