হস্তিনাপুরে এখন দিন-রাত মঞ্চ তৈরির কাজ চলছে। সমস্ত রাজকুমার নিজের নিজের অস্ত্র কৌশল দেখাবেন অতএব রাজবাড়ির প্রত্যেকটি সদস্যের মনে টান টান উত্তেজনা আছে। দ্রোণাচার্য যে সব শিল্পীকে নিয়োগ করে গেছেন, তারা বিভিন্ন পরিকল্পনায় মঞ্চ তৈরি করছেন। মঞ্চের উত্তর দিকটা ঢালু অতএব সেই দিকটাই সাধারণের প্রবেশ-পথ হিসেবে ছেড়ে দিয়ে মঞ্চের দু-দিকে রীতিমতো স্টেডিয়াম বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য স্টেডিয়াম না বলে এটাকে গ্যালারি বলাই ভাল। মঞ্চের দক্ষিণ দিকে নির্মিত হয়েছে একটি অতি উচ্চ সুদর্শন প্রেক্ষাগার–প্রেক্ষাগারং সুবিহিতং চক্রুস্তে তস্য শিল্পিনঃ। এই প্রেক্ষাগারে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র অন্যান্য রাজন্যবর্গ এবং কুরুবৃদ্ধদের সঙ্গে বসে থাকবেন। আর এখানেই এক পাশে বসবেন রাজবাড়ির স্ত্রীলোকেরা। যাতে রাজা, রাজন্যবর্গ এবং স্ত্রীলোকরা কোনও দুর্ঘটনা বা জন-কোপ থেকে মুক্ত থাকেন তার জন্য প্রচুর পরিমাণ অস্ত্র-শস্ত্রও মজুদ করা হয়েছে এই প্রেক্ষাগারে–রাজ্ঞঃ সৰ্বায়ুধোপেতং স্ত্রীণাঞ্চৈব নরর্যভূ।
মঞ্চের উত্তরদিকে সাধারণ প্রবেশপথ, দক্ষিণদিকে রাজদর্শন-মঞ্চ আর বাকি দুই দিকে পশ্চিমে এবং পূর্বে দুটি বিশাল মঞ্চ তৈরি করলেন হস্তিনাপুরের দেশীয় শিল্পীরা। মহাভারতের প্রমাণেই বলা যায় যে, এই মঞ্চ দুটি এমনভাবেই তৈরি করা হয়েছিল, যাতে রাজকুমারদের দেখতে কোনও অসুবিধা না হয়–বিপুলা উচ্ছুয়োপেতা শিবিকাশ্চ মহাধনাঃ। অস্ত্রপরীক্ষার দিন রাজপুরনারীদের সসম্মানে নিয়ে আসার জন্য বহুতর এবং বিচিত্র শিবিকা তৈরি হল। এই শিবিকা পুরনারীদের পর্দার আড়ালে রাখার জন্য নয়, এগুলি তাদের সম্মান এবং আড়ম্বর ঘোষণার জন্যই, কারণ মহাভারতের যুগে পর্দা-প্রথার চল হয়নি। স্ত্রীলোকেরা যথেষ্ট স্বাধীনভাবেই চলা-ফেরা করতে পারতেন।
অস্ত্র-পরীক্ষার নির্দিষ্ট দিনে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের দর্শনমঞ্চটিকে আরও দর্শনীয় করে তোলা হল। চারদিকে মুক্তার ঝালর দুলছে চন্দ্রাতপ থেকে–মুক্তাজাল-পরিক্ষিপ্তং। মঞ্চের নির্মাণ-স্তম্ভগুলি মুড়ে দেওয়া হয়েছে সোনার সুতোয় আর তার মাঝে মাঝে উৎকীর্ণ করা হয়েছে বৈদুর্যমণি–শাতকুম্ভময়ং দিব্যং বৈদুর্যমণিশোভিত। ধৃতরাষ্ট্র তার মন্ত্রীদের নিয়ে প্রেক্ষাগারের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, তাঁর সামনে সামনে যাচ্ছেন কুরুবৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম আর কুলগুরু কৃপাচার্য। রাজার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই সুদৃশ্য শিবিকাগুলিতে করে মঞ্চের একদিকে উপস্থিত হলেন ধৈর্যশীলা গান্ধারী এবং মনস্বিনী কুন্তী। তাঁদের সঙ্গে তাঁদের দাসীরা। সবার পরনে বিচিত্র সাজ, আভরণ–স্ত্রিয়শ্চ রাজ্ঞঃ সর্বাস্তা সপ্ৰেষ্যাঃ সপরিচ্ছদাঃ। হস্তিনাপুরের জনপদবাসী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র–সকল জাতির লোকেরা অনেক আগে থেকেই দুধারের মঞ্চে আসন সংরক্ষণ করছিল–চাতুর্বর্ণং পুরাদ দ্রুত। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র উপস্থিত হবার সঙ্গে সঙ্গে দুধারে প্রেক্ষামঞ্চগুলি একেবারে মুহূর্তের মধ্যে পূর্ণ হয়ে গেল। এরা সকলেই রাজকুমারদের শিক্ষা-কৌশল দেখার জন্য কৌতূহলী হয়ে এসেছে–ক্ষণেনৈকস্থতাং তত্র দর্শনেঙ্গুর্জগাম হ।
রাজা ধৃতরাষ্ট্র, কুরুবৃদ্ধগণ, অন্যান্য রাজন্যবর্গ এবং কুরুবাড়ির স্ত্রীলোকেরা আসন গ্রহণ করলেন, জনপদ-পুরবাসীরাও আসন গ্রহণ করলেন। একটু পরেই যে এই প্রদর্শনী-উৎসব শুরু হবে, তার ইঙ্গিত দেবার জন্য বাজনদারেরা এবার বাজনা শুরু করল। তাল-লয় সমন্বিত বাদ্যধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে দর্শকাসন থেকে তাল দিতে লাগল হস্তিনাপুরের জনপদবাসীরা। প্রবল কৌতূহল এবং উত্তেজনায় তারা উঠে-বসে নেচে-কুঁদে তাল দিতে লাগল বাজনদারের বাদ্যি–বাজনার সঙ্গে। তাদের দেখতে লাগছিল তরঙ্গ-ভঙ্গুর এক মহাসমুদ্রের মতো–মহার্ণব ইব ক্ষুব্ধঃ সমাজঃ সোভবত্তদা।
এর পর মঞ্চের প্রবেশপথে একটি বৃদ্ধ মানুষকে আসতে দেখা গেল। তার যুবক পুত্রটি তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে। বৃদ্ধের পরনে ধবধবে সাদা কাপড়। মাথায় পাকা চুল, কিঞ্চিদবিন্যস্ত। পাকা দাড়ি হাওয়ায় উড়ছে। কাঁধে সাদা পৈতে ঝুলছে। আর আজকের এই উৎসবমুখর দিনের কথা মাথায় রেখেই যেন বৃদ্ধ কিঞ্চিৎ শ্বেত চন্দনের অনুলেপন গ্রহণ করেছেন। তার গলায় একটি সাদা-ফুলের মালা। শ্বেত চন্দনের অলকা-তিলকার সঙ্গে সাদা মালাখানি গলায় দিয়ে বৃদ্ধ যখন যুবক পুত্রের সঙ্গে মঞ্চভূমিতে প্রবেশ করলেন তখন তাদের দেখে মনে হল যেন মঙ্গল গ্রহের সঙ্গে আকাশের স্নিগ্ধ চাঁদখানি নেমে এসেছে ডুয়ে–নভো জলধরৈ-ইনিং সাঙ্গারক ইবাংশুমান্।
এই বৃদ্ধ হলেন অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য এবং যুবকটি তাঁর পুত্র অশ্বত্থামা। মঙ্গল গ্রহ লাল। রজগুণের অতি সাহসের তথা নির্ভীকতার প্রতীক। আর চাঁদ স্নিগ্ধকিরণসঞ্চারী বৃদ্ধত্বের প্রতীক এখানে। সপুত্র দ্রোণাচার্য রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই বাজনদাররা বাজনা থামাল। এই মুহূর্তে দর্শকাসনের জনসমূহ নিস্তরঙ্গ সমুদ্রে পরিণত হল। রঙ্গমঞ্চের পরিবেশ হয়ে উঠল গম্ভীর।
দ্রোণাচার্য রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করে প্রথমে ইষ্টদেবতার উদ্দেশে পূজা নৈবেদ্য প্রদান করলেন। পূজা শেষের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণরা স্বস্তিবাচন করলেন–স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র উঠে দাঁড়ালেন। প্ৰেষ্যজনের হস্তস্থিত স্থালী থেকে সুবর্ণ, মণি এবং বিচিত্র বর্ণের বহুমূল্য বস্ত্র গ্রহণ করে অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য এবং প্রথম গুরু কৃপাচার্যের পায়ে নিবেদন করলেন–প্রদদৌ দক্ষিণাং রাজা দ্রোণায় চ কৃপায় চ।
