দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরের বর্ধমান পুরদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে সোজাসুজি রাজসভায় এলেন। ধৃতরাষ্ট্র তখন সিংহাসনে বসে আছেন। তার চারপাশে বসে আছেন ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রীরা-কৃপাচার্য, সোমদত্ত, বাহ্বীক, ভীষ্ম, বিদুর এবং স্বয়ং সত্যবতীনন্দন ব্যাস। দ্রোণাচার্য সকলকে উদ্দেশ করে ধৃতরাষ্ট্রকে বললেন–মহারাজ আপনার কুমাররা সকলেই যথোচিত বিদ্যা-লাভ করেছে। এখন আপনি যদি অনুমতি করেন, তবে কুমারগণ তাদের শিক্ষা প্রদর্শন করতে পারে–তে দর্শয়েষুঃ স্বাং শিক্ষাং রাজনুনুমতে তব।
ধৃতরাষ্ট্র খুব খুশি হয়ে বললেন–আপনি আমাদের খুব বড় একটা কাজ করে দিয়েছেন, ঠাকুর। অতএব আপনি যে সময়ে, যেভাবে ইচ্ছে যা কিছু করা ভাল মনে করেন, তাই আমাকে আদেশ করুন–যদানুমন্যতে কালং যস্মিন্ দেশে যথা যথা। কুমারদের অস্ত্রশিক্ষার নৈপুণ্য দেখার জন্য আজকে আমার সেই মানুষগুলির ওপর ঈর্ষা হচ্ছে, যাঁরা এই প্রদর্শনী নিজের চোখে দেখবেন–ধৃতরাষ্ট্র অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনের মঞ্চ তৈরি করার জন্য বিদুরকে আদেশ দিয়ে বললেন–গুরু দ্রোণাচার্য যেমন যেমন আদেশ করেন তেমন তেমন ব্যবস্থা করে দাও। এমন ঘটনা সব সময় ঘটবে না। অতএব তুমি দেখ কী করতে হবে।
মহামতি বিদুর ধৃতরাষ্ট্রকে অভিবাদন জানিয়ে দ্রোণাচার্যের সঙ্গে বাইরে এলেন। রাজগৃহের বাইরেই একটি বড় জায়গা পছন্দ করলেন দ্রোণ এবং বিদুর। অস্ত্রশিক্ষা প্রদর্শনের জন্য ঠিক কতখানি জায়গা লাগবে দ্রোণাচার্য সেটা নিজে মেপে দিলেন–ভারদ্বাজো মহাপ্রাজ্ঞো মাপয়ামাস মেদিনীম্। মনে রাখতে হবে–সেই বৈদিক কাল থেকেই ভারতবর্ষের তথাকথিত আর্যজাতি মাপজোকের নিয়ম-কানুন খুব ভালই জানতেন। বৈদিক যজ্ঞের জন্য বিভিন্ন বেদি নির্মাণের প্রয়োজনে জ্যামিতিক নকশা ব্যবহার হত। আর আজকের যুগে যাকে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং বলি তার প্রাথমিক বোধটা যে কত ভাল ছিল, তা মহেঞ্জোদরো–হরপ্পার গৃহ ধ্বংসের অবশেষ দেখলেই বোঝা যাবে। ভাল রকম টাউন–প্ল্যানিং না জানলে মহেঞ্জোদরোর নাগরিক শৈলীর এত খ্যাতি হত না।
যাই হোক, এ তো বেদের যুগেরও আগের কথা। বেদের যুগেই মোটামুটি মাপজোকের জ্যামিতিক রূপায়ণ আরম্ভ হয়ে গেছে, আর কৌটিল্যের সময় বা মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতেই আমরা মাপজোকের বহু পারিভাষিক শব্দ ব্যবহৃত দেখছি। এবং এই পারিভাষিক শব্দগুলি মহাভারতের অন্যত্রও বেশ সুসংহতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। দ্রোণাচার্যের হয়তো এত বোধ ছিল না। কিন্তু তার প্রয়োজনটুকু তিনি জানতেন। যে নোক ধনুঃশরের শিক্ষা প্রদর্শন করছে, তার যে জায়গা লাগবে, তার চেয়ে বেশি জায়গা লাগবে গদাযুদ্ধের ক্ষেত্রে। আবার তার চেয়েও বেশি লাগবে বর্ষা-ক্ষেপণে বা অসি-যুদ্ধে। দ্রোণাচার্য সবগুলি অস্ত্রের চালন-চিত্র মাথায় রেখে বেশ বড়ো একটা জায়গা মেপে দিলেন বিদুরকে।
দ্রোণাচার্য যে জায়গাটা বাছলেন, সেটা সমতলভূমি। কোনও গাছ নেই, এমনকি গাছ কাটা হয়ে গেছে তার কর্তিত মূল পড়ে আছে, এমনটিও দ্রোণাচার্যের প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে অসুবিধেজনক। অতএব গাছ নেই, বৃক্ষমূলের অবশেষ নেই এবং সেই জায়গাটা উত্তরদিকে খানিকটা ঢালু হয়ে গেছে–এইরকম একটা জায়গা পছন্দ করলেন দ্রোণাচার্য–সমা অবৃক্ষাং নিগুল্ম উদ প্রস্রবণান্বিতাম্। ঢালটা এইজন দরকার, যাতে বৃষ্টি হলে জল না দাঁড়ায়। জমির মাপজোক করে দিয়ে দ্রোণাচার্য বিদুরকে একটি শুভদিনের কথা জানিয়ে গেলেন, যেদিন রঙ্গভূমির সফলতার উদ্দেশে ভূমিপূজা করবেন অস্ত্রগুরু। দ্রোণাচার্য সেদিনকার মতো ফিরে চলে গেলেন, রাজধানীর একান্তে সেই কুটিরে, যেখানে কুমারগণ অস্ত্রাভ্যাস করে যাচ্ছেন।
যেদিন রঙ্গমঞ্চের ভিতপুজো করবেন বলে ঠিক করলেন দ্রোণাচার্য, সেইদিন সকাল থেকে এক বাজনাদার জমির সেই ঢালু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ডিণ্ডিম বাজাতে লাগল। মাঝে মাঝে বাজনা থামিয়ে সে ঘোষণা করতে লাগল–হস্তিনাপুরের নগরবাসী, জনবদবাসীরা সবাই শুনুন। এই জমির ওপর দাঁড়িয়ে কুরুবাড়ির রাজকুমাররা সব অস্ত্র-শিক্ষার কৌশল দেখাবেন। আজকে শুভযোগে শুভ নক্ষত্রে অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্য ভূমিপূজা সম্পন্ন করবেন। আপনারা সকলে আসুন, বাজনাদার খুব বাজনা বাজাল আর খুব করে ঘোষণা করল–অবঘুষ্টে সমাজে চ তদর্থং বদতাং বরঃ।
দ্রোণাচার্য শুভ মুহূর্তে শাস্ত্রবিধি অনুসারে ভূমিপূজা সম্পন্ন করলেন। দেবতার পূজা বেশ ঘটা করেই হল। পূজা দেখতে আসা জনপদবাসীরা আগাম খবর পেয়ে গেল–কবে কুমারদের অস্ত্রশিক্ষার প্রদর্শনী হবে। পূজা সেরে দ্রোণাচার্য আবারও ফিরে গেলেন সেই অরণ্যপ্রান্তে শিষ্যদের অস্ত্রাভ্যাস শেষ কদিন পরখ করে নেবার জন্য। একটি ছাত্র-শিষ্য, যে পড়া তৈরি করে পরীক্ষা দেয়, পরীক্ষায় ভাল ফল করার জন্য তার যেমন তাগিদ থাকে, তেমনই যিনি গুরু, যিনি এতদিন ধরে অস্ত্রশিক্ষা দিয়ে এসেছেন, তারও তেমনই তাগিদ থাকে ছাত্রকে ভাল ফল করানোর জন্য। এই কারণে গুরু যেমন একদিকে রঙ্গমঞ্চের ভূমিপূজা সেরে দেবতাকে শিষ্যদের ওপর প্রসন্ন থাকতে বলছেন, তেমনই শিষ্যদের অস্ত্রাভ্যাসের শেষটুকু দেখে নেবার জন্যও তিনি ব্যস্ত থাকেন। দ্রোণাচার্য জানেন–শিক্ষার্থীকে যদি কৃতকার্য হতে হয়, তবে দৈবের সঙ্গে পুরুষকারের প্রয়োজন। আর ঠিক এইজন্যই একদিকে মঞ্চপূজা অন্যদিকে অস্ত্রাভ্যাস চলছে।
