দ্রোণাচার্যের কাছে সেই অস্ত্র ছিল, যাতে তিনি তক্ষুনিই বিপদ-মুক্ত হতে পারতেন, কিন্তু তিনি ভাবলেন যে, শিষ্যদের অস্ত্র-লঘুতা পরীক্ষা করার এই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। দ্রোণ চেঁচিয়ে উঠলেন–আরে শিগগির, শিগগির মার এটাকে, আমাকে কামড়ে নিয়ে যাচ্ছে–গ্রাহং হত্বা মোয়ধ্বম্। দ্রোণের সমস্ত শিয্যেরা গঙ্গা নদীর তীরভূমিতে দাঁড়িয়ে কেউ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। কেউ বিশাল অস্ত্র-যোজনার চেষ্টা করল, কেউ অন্যকে অনুরোধ করল, কেউ বা ভাবল যে, লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যদি তার অস্ত্র দ্রোণের গায়ে লাগে–ইত্যাদি নানা বিচিত্র চিন্তায় কেউই আর অস্ত্ৰমোক্ষণের প্রয়াসটুকু নিল না। সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল–ইতরে ত্বথ সংমূঢ়াস্তত্র তত্র প্রপেদিরে।
কিন্তু এরই মধ্যে যাঁর করার ছিল, তিনি কিন্তু কাজটি করে ফেলেছেন। দ্রোণের আর্ত চিৎকার এবং নির্দেশ ভেসে আসার সঙ্গে সঙ্গে অসম্ভব তীব্রতায় পাঁচ-পাঁচটি বাণ নিক্ষেপ করে জলচর জন্তুটিকে খণ্ড-খণ্ড করে ফেললেন অর্জুন। দ্রোণাচার্যের জঙ্ মুক্ত হল নিমেষেই এবং দ্রোণাচার্য আবারও বুঝলেন যে, তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অর্জুনই শ্রেষ্ঠতম। আরও একটা জিনিস খেয়াল করুন। একলব্য যখন সেই চিৎকার করা কুকুরকে বাণবিদ্ধ করেছিলেন, তখন তার অস্ত্রলঘু অর্থাৎ বাণ-মোক্ষণের শীঘ্রতা ছিল পরপর সাতটি বাণ। আর অর্জুন এই জলজন্তুটিকে বধ করলেন প্রায় একসঙ্গে পাঁচটি বাণ মেরে, কিন্তু একলব্যের ক্ষেত্রে বধ্য বস্তু দৃষ্টির বাইরে ছিল না, অর্জুনের ক্ষেত্রে জলজন্তু জলের ভিতরে ছিল–অবাৰ্য্যৈঃ পঞ্চভি-গ্রাহং মগ্নমম্ভস্যতাড়য়ৎ। এখনকার দিনের স্পিড় মাপার যন্ত্র তখন ছিল না, কিন্তু এই বাণ সংখ্যার নিরিখে বোঝা যায় অর্জুন প্রায় এক মুহূর্তে বা কিঞ্চিদধিক সময়ে পাঁচ-পাঁচটি শর মোচন করতে পারতেন, যে ক্ষমতা অন্য কারও ছিল না। একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে যাবার পর অর্জুনই রইলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি অস্ত্রমোক্ষণের তীব্রতায় সর্বশ্রেষ্ঠ।
দ্রোণাচার্য এত খুশি হলেন যে, সেই রক্তাক্ত অবস্থাতেই গঙ্গার তীরভূমিতে উঠে এসে তিনি অর্জুনকে বললেন–অর্জুন! আমার কাছে একটি দিব্য অস্ত্র আছে। এর নাম ব্রহ্মশির। এই অস্ত্র কীভাবে ক্ষেপণ করতে হবে এবং কীভাবেই বা সম্বরণ করতে হবে–সব আমি তোমাকে শিখিয়ে দেব–অস্ত্রং ব্রহ্মশিরা নাম সপ্রয়োগ-নিবর্তন। তবে এখানে একটাই কথা বলার আছে–এই অস্ত্র তুমি কখনও মানুষের ওপর প্রয়োগ করবে না। কেননা সাধারণ জনের ওপরে প্রয়োগ করলে এই অস্ত্র জগৎ বিনাশ করতে পারে–জগদ্ বিনির্দহেদেত অল্পতেজসি পাতিত।
এতকাল পর্যন্ত শিক্ষাজীবনের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জুন লাভ করছেন গুরু-পরম্পরায়। দ্রোণাচার্য ব্রহ্মাস্ত্র লাভ করেছিলেন তাঁর গুরু অগ্নিবেশ্যের কাছ থেকে। আজ অর্জুন সেই অস্ত্রের প্রয়োগ এবং সম্বরণের শিক্ষা লাভ করছেন তার গুরুর কাছ থেকে। আগেই বলেছি– যিনি এই অস্ত্রলাভের উপযুক্ত আধার বলে বিবেচিত হবেন, তার শম-দম এবং জিতেন্দ্রিয়তার শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়া দরকার। অর্জুনের সেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হয়েছে বলেই আজ তিনি ব্রহ্মাস্ত্র–লাভের অধিকারী হচ্ছেন। দ্রোণাচার্য একবার নয়, দুবার অর্জুনকে সাবধান করে বলেছেন–মানুষ ছাড়া অন্য কোনও শত্রু যদি তোমাকে আক্রমণ করে, তবেই এই অস্ত্রের সাহায্যে তুমি তাকে বাধা দেবে–বাধেমানুষঃ শত্রু যদি ত্বং বীর কশ্চন। তদ্বাধায় প্রযুঞ্জীত…।
বাধা দেবে–তার মানে প্রয়োগ করবে কিন্তু অস্ত্র-সম্বরণের উপায়টি হাতে রেখে। আর মানুষ নয় এমন শত্রু বলতে দেবতা অসুর যাকেই বোঝানো হোক না কেন–এর আসল মানে হল–যদি কোনও অমানুষিক যুদ্ধ হয়–অর্থাৎ এমন অস্ত্র-যুদ্ধ যা অর্জুনের পক্ষেও রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, অথচ সে যুদ্ধে সাধারণের অনেক ক্ষতি হবে, তবে সেই অমানুষিক অস্ত্রকে বাধা দেবার জন্য এই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করবে, নচেৎ নয়।
অর্জুন দ্রোণ-গুরুকে কথা দিলেন। তিনি এই অস্ত্র–প্রয়োগের সম্পূর্ণ ফলাফল বিচার করেই কথা দিলেন যে, যেমনটি তিনি বলছেন, তাই হবে। পরম এবং চরম সেই অস্ত্র অর্জুনের হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রোণাচার্য বললেন–আজ থেকে তোমার মতো ধনুর্ধর এই পৃথিবীতে আর কেউ রইল না। তুমি হবে সকলের অজেয় এবং পরম কীর্তিমান–অজেয়ঃ সর্বশত্রণাং কীর্তিমাংশ্চ ভবিষ্যসি। অর্থাৎ দ্রোণ অর্জুনকে যে কথা দিয়েছিলেন–তোমাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্ধরে পরিণত করব–সেই কথা তিনি রাখলেন অর্জুনের গুণে, অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতে, একলব্যের পক্ষশাতন করে এবং পরিশেষে শ্রেষ্ঠ কোনও শিক্ষার্থীর পরম কাম্য ব্রহ্মাস্ত্র অর্জুনকে দান করে–ভবিতা ত্বৎসমো নান্যঃ পুমাল্লোকে ধনুর্ধরঃ।
.
১০৪.
দ্রোণাচার্য একদিন কৌরব-পাণ্ডব রাজকুমারদের ডেকে বললেন–তোমরা যেমন অস্ত্রাভ্যাস করে যাচ্ছ, তেমনই করে যাও। তোমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। তোমাদের পিতা-মাতা গুরুজনেরা আমার হাতে তোমাদের তুলে দিয়েছিলেন। অতএব তাদের সামনে। অস্ত্রবিদ্যা প্রদর্শন করে আমার মান রাখতে হবে তোমাদের। অতএব তোমরা অভ্যাস চালিয়ে যাও। আমি একবার রাজধানীতে যাব। সমস্ত ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
