কিন্তু এমন তাত্ত্বিক দৃষ্টি থাকলে আর যাই হোক তার দ্বারা অস্ত্রের মাধ্যমে লক্ষ্যভেদ সম্ভব নয়। লক্ষ্যভেদ করতে হলে যে এককেন্দ্রিক দৃষ্টি লাগে তা সারা জীবনেও যুধিষ্ঠির অর্জন করতে পারেননি, পারবেন না। অথচ দ্রোণাচার্য সেই পরীক্ষা নেবার জন্যই দাঁড়িয়ে আছেন। যুধিষ্ঠিরের প্রতি তিনি ভীষণ বিরক্ত হলেন। ক্লাসের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রটিকে মাস্টারমশাই যেমন গালাগালি দিয়ে বলেন–তোর দ্বারা কিছু হবে না। তুই বেরিয়ে যা এখান থেকে–ঠিক সেইভাবেই অখুশি দ্রোণাচার্য যুধিষ্ঠিরকে গালমন্দ করে বললেন–তুমি সরে যাও এই পংক্তি থেকে–তমুবাচ অপসপেতি। তুমি কোনওদিন একে লক্ষ্যভেদ করতে পারবে না–নৈতচ্ছক্যং ত্বয়া বেদ্ধৃং লক্ষ্যমিতেব কুৎসয়ম্।
দ্রোণাচার্য এবার তার অপরাপর শিষ্য দুর্যোধন, ভীম, দুঃশাসন, নকুল–ইত্যাদিদের ওই একই প্রশ্ন করলেন একে একে। ক্লাসের প্রশ্নোত্তরে সবচেয়ে ভাল ছাত্রটি যে উত্তর দেয়, অন্যান্য মন্দবুদ্ধি ছাত্ররা তার পুনরাবৃত্তি করে। এক্ষেত্রেও তাই ঘটল। অন্যেরা ভাবলেন–এ তো লক্ষ্যভেদ করা নয়। এ হল লক্ষ্যভেদের মানসিকতা পরীক্ষা যা একান্তই মৌখিক। অতএব যুধিষ্ঠিরের মতো জ্ঞানী ব্যক্তি–যুধিষ্ঠির যে জ্ঞানী, সে কথা কৌরব কুমাররাও মানতেন –অতএব যুধিষ্ঠির যে উত্তর দিয়েছে, তাছাড়া অন্য কোনও সদুত্তর হতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা–তারাও তো সবই দেখতে পাচ্ছেন। অবশ্য যুধিষ্ঠিরের দেখা আর তাদের দেখায় বিলক্ষণ তফাৎ আছে। একজনের দেখার মধ্যে তাত্ত্বিকতা আছে, আর অন্যজনের মনে আছে তাচ্ছিল্য। যাই হোক, যাঁরাই যুধিষ্ঠিরের বাক্য পুনরাবৃত্তি করে বললেন–সবই দেখতে পাচ্ছি, দ্রোণাচার্য তাদের সকলকে গালমন্দ করে প্রত্যেককে সরিয়ে দিলেন–তথা সর্বে তৎ সর্বং পশ্যাম ইতি কুৎসিতাঃ।
দ্রোণাচার্য এবার সবাইকে ছেড়ে ঈষৎ হেসে অর্জুনকে বললেন–এবারে তোমার পালা অর্জুন, দেখো, ভাল করে পাখিটার দিকে তাকাও–ত্বয়েদানীং গ্রহৰ্তব্যং এতল্লক্ষাং বিলোক্যতাম্। আমি যখনই বলব, তখনই কিন্তু পাখিটার মাথা কেটে ফেলতে হবে। তুমি ধনুক আকর্ষণ করে একটু অপেক্ষা করবে শুধু–বিতত্য কামুকং পুত্র তিষ্ঠ তাবলুহূর্তকম্।
অর্জুন দ্রোণাচার্যের কথামতো ধনুকের ছিলা টেনে শর স্থাপন করে দাঁড়ালেন।–মণ্ডলীকৃত–কামুকঃ। তিনি দ্রোণাচার্যের আদেশের অপেক্ষা করছেন। দ্রোণ একটু পরেই সেই একই কায়দায় বললেন–আচ্ছা অর্জুন! তুমি কি পাখিটা গাছটা এবং আমাকেও দেখতে পাচ্ছ। অন্যান্যদের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে–দ্রোণাচার্যের প্রশ্ন শোনামাত্রই ধনুকের ছিলায় ঢিল দিয়ে, দ্রোণের দিকে তাকিয়ে সকলেই বেশ সম্মানজনকভাবে তার কথার উত্তর দেবার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু অর্জুনের বেলায় এমনটি হল না। শরাকর্ষণের অতিরেকে তার ধনুক এবং ধনুকের ছিলা প্রায় গোলাকার হয়ে গিয়েছিল–মণ্ডলীকৃতকামুকঃ। ঠিক সেই অবস্থাতেই দাঁড়িয়ে রইলেন অর্জুন। তার হাত–পা এতটুকু নড়ল না। দ্রোণাচার্যের দিকে তিনি ভ্রূক্ষেপও করলেন না। এক দৃষ্টিতে পাখির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তিনি জবাব দিলেন–আমি গাছ দেখতে পাচ্ছি না, আপনাকেও দেখতে পাচ্ছি না, কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দেখতে পাচ্ছি শুধু পাখিটাকে–পশ্যাম্যেকং ভাসমিতি দ্রোণং পার্থোভ্যভাষত।
দ্রোণাচার্য বেশ খুশি হলেন। এই সময় তার দিকে তাকিয়ে আচার্যবং সসম্মানে কথা বলতে হবে–এটা যে সুশিক্ষিত শিষ্যের লক্ষণ নয়–এই বিলক্ষণ আচরণেই দ্রোণ খুশি হলেন। অর্জুন একই ভাবে স্থির লক্ষ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। দ্রোণাচার্য আবার বললেন–তুমি যে বললে পাখিটাই শুধু দেখতে পাচ্ছ, অর্জুন! তো পাখির কোন অঙ্গটা তুমি দেখতে পাচ্ছ? অর্জুন বললেন–শুধু মাথাটা। আর কোনও অঙ্গই দেখতে পাচ্ছি না–শিরঃ পশ্যামি ভাসস্য ন গাত্রমিতি সোব্রবীৎ।
দ্রোণাচার্য পূর্বে নির্দেশ দিয়েছিলেন–আমি বলবার সঙ্গে সঙ্গে পাখিটার মাথা কেটে ফেলতে হবে–শিরোস্য বিনিপাত্যতা–অতএব অর্জুন শুধুই পাখির মাথাটা দেখতে পাচ্ছেন, আর কিছুই নয়। শিয্যের উপযুক্ত উত্তর শুনে দ্রোণাচার্যের গায়ে কাঁটা দিল–দ্রোণে হৃষ্টতরুহঃ। সরোমাঞ্চে তিনি বললেন–অর্জুন! শর ত্যাগ করো। এই আদেশের মুহূর্তটি পরের মুহূর্ত স্পর্শ করতে যে সময় নেয় তার মধ্যেই অর্জুনের শরক্ষেপণ হয়ে গেছে। পাখির মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে পড়ে গেছে–শির উক্ত্য তরসা পাতয়ামাস পাণ্ডবঃ।
দ্রোণাচার্য অর্জুনকে একেবারে জড়িয়ে ধরলেন। বাল্যকালের যে বন্ধুটি তাঁকে অপমান করেছিল, তাকে পরাজিত করে অপমান করার পরিকল্পনা যেন এক্ষুনি সিদ্ধ হয়ে গেল। যেন উপযুক্ত শিষ্যের অসাধারণ অস্ত্র–প্রয়োগে সে কাজ তার হয়েই গেছে।
ধনুঃশরের লক্ষ্যভেদের পরীক্ষা তো হয়েই গেল। এবারে আরও একটা পরীক্ষা দ্রোণাচার্যকে নিতে হবে। সে পরীক্ষা হতে হবে আকস্মিকতার মধ্যে। বিপন্ন মুহূর্তে কে কত তাড়াতাড়ি অস্ত্রচালনা করতে পারে সেই অস্ত্র-লঘুতা একবার পরীক্ষা করা দরকার। যখন তখন সাজিয়ে গুছিয়ে এই পরীক্ষা করা যাবে না, এই পরীক্ষার জন্য পরম বাস্তব এক বিপন্ন মুহূর্ত চাই। কিছুদিন অপেক্ষার পর সেই সুযোগও এসে গেল। দ্রোণ একদিন গঙ্গায় স্নান করতে গেছেন। তার সঙ্গে তাঁর শিষ্যবাহিনীও রয়েছে। তারা তীরভূমিতে দাঁড়িয়ে কেউ কথা বলছিলেন, কেউ গঙ্গার শোভা দেখছিলেন, কেউ বা আপন লক্ষ্যভেদশক্তি পশু-পাখির ওপর পরীক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। হঠাৎই সেই অলস ক্রীড়াপর কুমারদের কানে দ্রোণাচার্যের আর্ত চিৎকার ভেসে এল। জলচর কোনও হাঙর-কুমির অথবা অন্য কোনও প্রাণী দ্রোণাচার্যের পা কামড়ে ধরেছে–অবগাঢ়মধো দ্রোণং সলিলে সলিলেচরঃ।
