যাই হোক, কৌরব এবং পাণ্ডব কুমারদের অস্ত্রশিক্ষার পালা শেষ হয়ে গেছে। এবার রাজবাড়িতে প্রদর্শনীর আগেভাগে দ্রোণাচার্য শিষ্যদের একটু পরীক্ষা করে নিতে চাইলেন। দ্রোণাচার্য একদিন কাউকে না জানিয়ে হস্তিনাপুরের বণিকপথে, যেখানে পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন হয়, সেইখানে উপস্থিত হলেন। এখান থেকে বিশেষ বিশেষ খবর নিয়ে তিনি চলে এলেন নগরের অন্য প্রান্তে। এখানে বড় বড় ঘরে কতগুলি লোক কাজ করছে। তারা শিশুদের ক্রীড়ানক তৈরি করে যাচ্ছে একের পর এক। একটি লোকের কাছে দ্রোণাচার্য নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বললেন–আমাকে একটি খেলনা পাখি তৈরি করে দিতে হবে, যেটি দেখতে লাগবে একেবারে সজীব পাখির মতো। পাখিটি একটু বড় অর্থাৎ একটি শকুনের মতো চেহারা হলেই ভাল হয়।
নির্দিষ্ট দিনে দ্রোণাচার্য খেলনা পাখি পেয়ে গেলেন এবং রাজকুমাররা কেউই এই পাখির খবর জানতে পারলেন না–অবিজ্ঞতং কুমারাণা। দ্রোণাচার্য নিজের লোকজনের সাহায্যে পাখিটিকে একটি পত্রপুষ্পসমন্বিত বৃক্ষের ওপর স্থাপন করলেন। পাখিটিকে যেখানে বসানো হল, তার এদিক-ওদিক পেলব বৃক্ষপল্লব একটু-আধটু দুলতে লাগল, যাতে পাখিটি সম্পূর্ণ দেখতে অসুবিধে হয়, যাতে শরসন্ধান করার পরেও হঠাৎই একটা আবরণ তৈরি হতে পারে। শেষ মুহূর্তে হাওয়ায় দুলে একটি পুষ্পসমন্বিত বৃক্ষপল্লব পাখিটিব ওপর চলে আসতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র-চালনার সময়ে শত্রুপক্ষের রথী পুরুষ তো আর স্থির হয়ে বাণ খাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবেন না। তার রথ চলবে উচ্চাবচ ভূমিতে। ঘোড়া দৌড়বে। অন্য পদাতিক, অশ্বারোহী রথী পুরুষের আবরণ তৈরি করতে পারে। এই সবরকম কথা মনে রেখেই দ্রোণাচার্য শকুনটিকে একটি পুষ্প-সমন্বিত বৃক্ষের চূড়ায় স্থাপন করলেন বেশ কায়দা করে। কৃত্রিমং ভাসামা রোপ্য বৃক্ষাগ্রে শিল্পিভিঃ কৃতম্।
দ্রোণাচার্য অস্ত্রচালনার প্রাথমিক পরীক্ষা নেবার জন্য প্রস্তুত হলেন। শিষ্যদের সবাইকে তিনি ডেকে নিয়ে এলেন বনভূমির সেই নির্দিষ্ট বৃক্ষটির তলায়। প্রত্যেক শিষ্যকে তিনি পাশাপাশি জায়গায় পরপর দাঁড় করিয়ে দিলেন একটি পংক্তিতে। দুই জনের মধ্যে অনেকটা করে ফঁক। দ্রোণাচার্য বললেন–তোমরা বৃক্ষের ওপরে ওই পাখিটিকে সকলেই দেখতে পাচ্ছ তো? সকলে সম্মতিসূচক শিরঃকম্পন করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন–তোমরা প্রত্যেকে খুব তাড়াতাড়ি ধনুক-বাণ হাতে নিয়ে ওই পাখির দিকে শর–সন্ধান করে লক্ষ্য স্থির করার চেষ্টা করো–শীঘ্রং ভবন্তঃ সর্বেপি…তিষ্ঠধ্বং সংহিতেষবঃ। এর পর আমি একেক জনের নাম করার সঙ্গে সঙ্গে তোমরা শরচালনা করে ওই পাখিটির মাথা কেটে ফেলবে–শিরোস্য বিনিপাত্যতাম। তোমরা সকলে একসঙ্গে বাণ মোক্ষণের চেষ্টা করো না, তাতে কার বাণ লক্ষ্যভেদ করল বুঝতে পারব না। তোমাদের প্রত্যেককে আমি আলাদা করে ডাকব এবং তার পরেই যা করার তাই করবে–একৈকশো নিষোক্ষ্যামি তথা কুরুভ পুত্রকাঃ।
দ্রোণাচার্যের কথামতো সকলেই ধনুক-বাণ হাতে স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। দ্রোণাচার্য এবার কুমার–জ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে উদ্দেশ করে বললেন–বাছা। তুমি শর স্থাপন করো ধনুকে এবং লক্ষ্য স্থির করো। এরপর আমি বললে, তবেই শরমোক্ষণ করবে–মধ্বাকান্তে বিমুঞ্চ চ। যুধিষ্ঠির গুরুবাক্য মেনে ধনুক তুলে নিলেন হাতে। তারপর ধনুকে শর-স্থাপন করে যথাসাধ্য লক্ষ্য স্থির করলেন সেই শকুনের দিকে তাকিয়ে। যুধিষ্ঠিরকে ধনুকের জ্যা-আকর্ষণ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দ্রোণাচার্য তার মনোযোগ নষ্ট করার জন্যই যেন বললেন
–যুধিষ্ঠির! ওই গাছের ওপরে যে শকুনটা বসে আছে, ওটা দেখতে পাচ্ছ তো?
–আজ্ঞে আচার্য! পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি–পশ্যামীতি।
–পাখিটা যে দেখতে পাচ্ছ, এটা তো বেশ বুঝতে পাচ্ছি। আচ্ছা যুধিষ্ঠির? তুমি কি গাছটাও দেখতে পাচ্ছ?
–দেখতে পাব না? এই ফল-পুষ্প সমন্বিত মহা বনস্পতি, এও কি না দেখে থাকা যায়? পশ্যাম্যেনং বনস্পতিম্।
–আচ্ছা যুধিষ্ঠির! তুমি কি আমাকেও দেখতে পাচ্ছ?
–আচার্য! এই আপনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে আদেশ করছেন, আপনাকে যদি আমি দেখেও না দেখি, তাহলে পূজনীয় ব্যক্তির অতিক্রম ঘটবে যে। আপনাকে তাই নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছি।
–আচ্ছা! এই যে তোমার ভাইরা দাঁড়িয়ে আছে, তুমি কি এদেরও দেখতে পাচ্ছ, যুধিষ্ঠির?
–আচার্য! আমার প্রাণাধিক ভাইদের দেখতে পাব না আমি? ওরা সব ধনুক তুলে শর-সন্ধান করে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি বলা মাত্রই শর-মোচন করবে। অবশ্য এই বৃক্ষ, এই আপনি এই আমার সব ভাইয়েরা এবং অবশ্যই ওই পাখিটিও–এ সবই আমি একাদিক্রমে দেখতে পাচ্ছি–ভবঞ্চ তথা ভ্রাতৃ ভাসঞ্চেতি পুনঃ পুনঃ।
যুধিষ্ঠিরের সমস্যা এটাই। তিনি সব দেখতে পান। জীবনের বিশাল ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ভাই, বন্ধু, শত্রু, মিত্র এমনকি সেই মুহূর্তে যে তার ক্ষতিসাধন করতে পারে, তার স্ত্রী-পুত্রের মুখও যুধিষ্ঠিরের মনে পড়ে। আমরা যখন মহাভারতের বিচিত্র উপাখ্যানের অন্তরে কৌরব–পাণ্ডবের জ্ঞাতি-শত্রুতার কথা বলতে থাকব, তখন দেখবেন–যা কেউ খেয়াল করে না, যার কথা কারও মনে থাকবার কথা নয়, সে কথা যুধিষ্ঠির মনে রাখেন। বিশ্ববাসী সকলের সঙ্গে তার সংবাদ ঘটেছে, তিনি কাউকে অবহেলা করতে পারেন না। বিশ্বজনের সকলের সঙ্গে যাঁর। সমান-হৃদয়তার সম্পর্ক, তিনি একটি পাখি থেকে আরম্ভ করে ভাই, বন্ধু, আচার্য সকলকেই দেখতে পান।
