যাই হোক, নির্জন বনে এক নিরীহ ছাত্রের ওপর দ্রোণাচার্যের ওই অন্যায়–আচরণের জায়গা থেকে আমরা আবার হস্তিনাপুরের শিক্ষাশ্রমে ফিরে আসি। এতদিন অস্ত্রশিক্ষা যা হল, তাতে সকলকে একরকম শিক্ষা দিলেও কৌরব-পাণ্ডবদের মধ্যে একেক জন একেক শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করলেন। ভীম কিংবা দুর্যোধনকে দিয়ে ধনুর্বেদ শিক্ষা হল না। এঁরা দুজনেই বিচক্ষণ হয়ে উঠলেন গদাযুদ্ধে। এই দুজনের পারস্পরিক হিংসাতেই দুজনের শিক্ষাটা আরও বেশি ভাল হল। নকুল এবং সহদেব তরবারি চালনা শিখলেন ভাল, গদাযুদ্ধ বা ধনুশ্চালনায় তাঁরা সুবিধে করতে পারলেন না। অর্জুন যেমন হাতি-ঘোড়া-রথ যে বাহনই হোক, তাতে চড়েই যুদ্ধে পারদর্শিতা অর্জন করলেন, অন্য কেউ তেমন হলেন না। পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির তো রথ ছাড়া অন্য কোনও বাহনে যুদ্ধই করতে পারতেন না।
যাই হোক, একটি নির্দিষ্ট সময়ের শেষে প্রত্যেক ব্যক্তিগত ছাত্রের নিজস্ব প্রতিভা যেমন বোঝা যায়, এখানে দ্রোণাচার্যের আশ্রমে অস্ত্র-প্রশিক্ষণের শেষ কল্পে কে কোন ধরনের অস্ত্র ভাল চালাতে পারছেন, কে কোন বাহনে অভ্যস্ত হয়েছেন, কে কতটা কুশল হয়েছেন অস্ত্রচালনায়, তার একটা হিসেব কষার দরকার হয়ে পড়ল এবার। দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির বৃত্তি ভোগ করেন। অতএব কোন রাজকুমার কতটুকু অস্ত্রচালনা শিখেছেন, সেটা রাজবাড়ির সবার সামনে প্রদর্শন করার তগে দ্রোণাচার্য নিজে তার ছাত্রদের বিশেষভাবে একটু পরীক্ষা করে নিতে চাইলেন।
.
১০৩.
যাঁরা চিত্রকলা শিক্ষা করেন, কোনও বিশিষ্ট শিল্প, অথবা সঙ্গীত শিক্ষা করেন, এমন অনেক মানুষকেই আমরা গুরুর তত্ত্বাবধান ছাড়াই অনেক দূর যেতে দেখেছি। জন্মগত প্রতিভা এমনই এক বস্তু যে সে কারও শিক্ষা-সদুপদেশের বালাই না রেখে নিজেই নিজের পথ করে নেয়। চিত্র, সঙ্গীত অথবা অস্ত্রচালনার মতো এক অসাধারণ শিল্পকেই ধরা যাক, নির্দিষ্ট প্রতিভা নিয়ে যে জন্মেছে, সে এইসব বিষয়ের যে কোনও একটির সংস্পর্শে আসা মাত্রেই কৌতূহলী হয়ে ওঠে। তারপর চলতে থাকে তার সাধনা, ইচ্ছাপূরণ অথবা স্বেচ্ছাচার। প্রতিভাবান ব্যক্তি এর যে কোনও একটাই অঙ্গীকার করতে পারেন, কেননা তিনি তো বিষয়কে ধরেন না, বিষয় তাকে অবলম্বন করে নিজে পরিস্ফুট হয়। রবীন্দ্রনাথকে কবিতা লেখা শিখিয়ে দিতে হয়নি, রাফায়েল-পিকাসোকেও আঁকা শেখাতে হয়নি, নেপোলিয়নকেও শেখাতে হয়নি যুদ্ধবিদ্যার কৌশল।
অতএব প্রখর দৃষ্টিশক্তি, অভীষ্ট সম্পাদনের তীব্রতা, এবং উন্মেষশালিনী প্রজ্ঞার জোরে অর্জুন যেমন বিশাল ধনুর্ধরে পরিণত হয়েছেন, হয়তো তার চেয়ে বেশি প্রতিভা ছিল একলব্যের। যার জন্য সামান্য তত্ত্বাবধান ছাড়াও তিনি শুধু আপন আত্মবিশ্বাস এবং একাগ্রতার জোবে–পরয়া শ্রদ্ধয়োপেতো যোগেন পরমেণ চ~~শর-গ্রহণ, শর-নিক্ষেপ এবং লক্ষ্যবস্তুকেই আঘাত করার সমস্ত কৌশল এবং শীঘ্রতা আয়ত্ত করে ফেললেন। সত্যি কথা বলতে কী, ধনুর্বিদ্যার ক্ষেত্রে শর–গ্রহণ, শর-মোক্ষণ এবং লক্ষ্যে আঘাত হানার সময় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি যে যত তাড়াতাড়ি করতে পারবে এবং সেই তাড়াতাড়ির মধ্যেও লক্ষ। যত কম ভ্রষ্ট হবে, সেই তত বড় ধনুর্ধর হয়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। কোনও সন্দেহ নেই যে, একলব্য আপন প্রতিভায় অস্ত্রচালনার সেই চরম বিন্দুতে পৌঁছেছিলেন, যে বিন্দুতে অর্জুনও পৌঁছতে পারেননি এবং পারেননি বলেই তাকে অধম উপায় অবলম্বন করে একলব্যের পক্ষচ্ছেদন করতে হয়েছে।
তবু মহাভারতের কবি ব্যাস এসব কথা লুকোননি। পাণ্ডুর এই তৃতীয় পুত্রটি তার আপন বংশজাত সন্তান। তার প্রতি ব্যাসের মমতা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু মহাভারত যেহেতু শুধু ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়েরই শৌর্যকাহিনী নয়, এবং তবু যে সেখানে এক নিষাদ পুত্রের সহজ প্রতিভা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের চক্রান্তে বিপর্যস্ত হয়–ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সেই কলঙ্ক কাহিনী ব্যাস লুকিয়ে রাখেননি। সমস্ত জগতের সামনে উত্তম সামাজিকের এই চক্রান্ত তিনি প্রকাশ করে বুঝিয়েছেন যে, চিরকাল এই হয়, এই হয়েছে এবং এই হবে।
দ্রোণাচার্যের সমস্ত শিষ্যরাই একেকজন একেক ধরনের অস্ত্রচালনায় বিশেষত্ব অর্জন করলেন বটে, কিন্তু তাঁর পুত্রটি, যাকে তিনি বহুবার বহুরকমভাবে আলাদা করে শেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু পারেননি বলে শুনেছি, সেই দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামাও কিন্তু একটি বিশেষ ব্যাপারে পারদর্শিতা অর্জন করলেন এবং সেটি হল গুপ্ত অস্ত্র, রহস্য–অস্ত্র। অর্থাৎ যেসব অস্ত্রচালনার শিক্ষা সচরাচর কেউ জানে না, সেই সব অস্ত্রক্ষেপণেই সবচেয়ে বেশি দক্ষতা অর্জন করলেন অশ্বত্থামা–অশ্বত্থামা রহস্যেষু সর্বেভ্যোধিকোভবৎ। ওই কথাটা আমরা বার বার শুনেছি, দ্রোণাচার্য সকলকেই একই রকম শিক্ষা দিতেন–তুল্যেম্বস্ত্রোপদেশে কিন্তু সকলেই একরকম ধারণ করতে পারত না। যার ধারণ ক্ষমতা অধিক এবং যার সহজ প্রতিভা আছে, সে তো বেশি শিখবেই। কিন্তু অন্যদিকে এও ঠিক দ্রোণাচার্য যত সমদৃষ্টিসম্পন্ন আচার্যই হোন না কেন, অর্জুনের প্রতি তিনি যেমন বিশেষ পক্ষপাতগ্রস্ত ছিলেন, নিজের পুত্রের প্রতিও কিন্তু তিনি কম পক্ষপাতগ্রস্ত ছিলেন না। আর এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ঠিক সেই জন্যই শত সমদর্শিতার মধ্যেও তিনি পিতার কাছে অস্ত্রশিক্ষার গোপন পাঠ লাভ করেছেন এবং অন্যেরা যা জানতেন না, তিনি তা শিখে গিয়েছিলেন ওই গোপনীয়তার মধ্যেই।
