অতএব এ সব হয়। এ সব হত। অর্জুনের ক্ষেত্রে বরং কম হয়েছে। কারণ তিনিও কম মেধাবী নন। অতি-মেধাবী বলেই তার প্রতি পূর্বাহ্নেই দ্রোণাচার্যের পক্ষপাত ঘটে গেছে। এই পক্ষপাতের সরসতা থেকে দ্রোণ নিজেকে মুক্ত করতে পারেননি। এই সম্পূর্ণ ঘটনার মধ্যে যাঁরা দ্রোণাচার্য কর্তৃক নিষাদ একলব্যের প্রত্যাখ্যানের ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে জাত-পাতের কথা তোলেন, তাদের জানাই–জাত-পাতের ঘটনা এখানে তেমন করে দাগ কাটে না। মহাভারতের কবি নিজে একলব্যের প্রতি পক্ষপাতগ্রস্ত। একটি একটি করে করুণ শ্লোক লিখে একলব্যের প্রতি করুণা-কাতর কবি দেখিয়েছেন–কীভাবে পক্ষপাতগ্রস্ত গুরুর প্রণয়ে শ্রেষ্ঠতম ছাত্রটির ডানা হেঁটে দেওয়া হয় এবং তার চাইতে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীকে শ্রেষ্ঠতম করে রাখা হয়।
নৈষাদি একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কর্তিত হবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাণ-মোক্ষণে আর সেই শক্তি, সেই তীব্রতা এবং সেই শীঘ্রতা থাকল না, যা তার আগে ছিল। অর্জুন খুব খুশি হলেন। এই মানুষটিকে আমরা অতটা দোষ দিই না, যতটা দিই আচার্য দ্রোণকে। দ্রোণ অর্জুনকে বলতেই পারতেন যে, আমি তো বাছা! একে অস্ত্রশিক্ষা দিইনি। তবু যদি সে এই বিদ্যা শিখে থাকে, তবে সে দোষ আমার নয় এবং শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তোমাকে আরও পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু দ্রোণ এ কথা বলেননি। বললে অর্জুন হয়তো মানতেন। কারণ তিনি অর্জুন। অবশ্য দ্রোণাচার্য শুধু অর্জুনের জন্যই একলব্যকে এই শাস্তি দিয়েছেন কিনা, তাতে আমাদের সামান্য একটু সন্দেহ আছে। অর্জুনের প্রতি পক্ষপাত তো তাঁর ছিলই, কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁর অহংকারে কি একটুও লাগেনি? তার কি একবারও মনে হয়নি–যাকে আমি শিষ্য বলেই স্বীকার করলাম না, সে আমার সাহায্য ছাড়াই এমন এক ধনুধরে পরিণত হল যে আমার হাতে গড়া শ্রেষ্ঠতম অর্জুনের চেয়েও বেশি? আমাদের মনে হয়–অর্জুনের প্রতি পক্ষপাতের সঙ্গে সঙ্গে তার এই সাহংকৃত মনস্তত্ত্বও কাজ করে থাকবে। অতি বড় গুরু হলেও তাঁর উদারতার অভাব থাকতেই পারে এবং তার ইগোতেও লাগতে পারে। এমন ব্যাপার এখনও আছে, আগেও ছিল–মনুষ্য চরিত্রের এই চিরন্তন বৈশিষ্ট্যটি দেখানোর জন্যই মহাভারতের কবিকে একলব্যের কাহিনী লিখতে হয়েছে। অর্জুনের প্রতি পক্ষপাত দেখানোর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি জানাতে চেয়েছেন, ব্রাহ্মণ নয়, রাজপুত্র নয়, এমন অন্ত্যজ গোষ্ঠীর মধ্যেও সেই মেধা লুক্কায়িত থাকতে পারে যে মেধা তথাকথিত উচ্চবর্ণকে পীড়ন করে, লজ্জিত করে। কিন্তু বর্ণ-বিচারের চেয়েও এখানে বড় হয়ে উঠেছে পক্ষপাত, যে পক্ষপাত মহান গুরুদেবকে চিরকাল কলঙ্কিত করেছে এবং এখনও তা করে, হয়তো এটাকেই বলা যায় পেনাল্টি অফ গ্রেটনে।
একজন প্রোফেশনাল ব্যক্তির মতোই খুশি হলেন অর্জুন। তিনি শ্রেষ্ঠ থাকতে চান, অতএব একলব্যের অঙ্গুষ্ঠ–ছেদনে অর্জুন খুশি হলেন–ততোজুনঃ প্রীতমনা বভূব বিগতজ্বরঃ। দ্রোণাচার্য অর্জুনকে কথা দিয়েছিলেন–আমি তোমাকেই সবচেয়ে বড় ধনুর্ধর বানাব, অতএব এমন সাংঘাতিক একটি অন্যায় করেও তিনি তার বাক্যে স্থিত রইলেন–দ্রোণস্য তস্য বাগাসীন্নানন্যা ভিভবিতাড়ুন। নির্জন বনের প্রান্তে সেই ছেলেটি আবারও নতুন উদ্যমে তার শরমোণ শুরু করল। সে ভাবল–বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ছাড়াই সেতার পূর্ব পারদর্শিতা লাভ করবে। সেই শন্ শন্ আওয়াজ উঠল বনের মধ্যে। কিন্তু অনেক অনেক ব্যবধান এসে গেছে। যে শীঘ্রতায় পূর্বে তার শরমোণ ঘটছিল, সেই শীঘ্রতা আর যে সম্ভব নয়, সে কথা একলব্যও বুঝলেন, দ্রোণও বুঝলেন, অর্জুনও বুঝলেন–ন তথা চ স শীঘ্ৰো ভূৎ যথা পূর্বং নরাধিপ।
একলব্য জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত পেলেন, দ্রোণাচার্য নিজের সত্যরক্ষা করে বিব্রত হলেন আর অর্জুন খুশি হলেন উপযুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর শূন্যতায়। আর মহাভারতের কবি এই করুণ উপাখ্যান বর্ণনা করে বোঝালেন–জগতে মেধাই সব নয়, তার চেয়েও বড় জিনিস হল–নেতা ব্যক্তিকে সেইভাবে ভিজিয়ে রাখতে পারলে তিনিই তার ভক্তের অভিলাষ পূর্ণ করেন। হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশকে এখানে মন্তব্য করতে হয়েছে–হ্যায়! অর্জুন যে এইভাবে বড় হতে চেয়ে খুশি হলেন, এ তার লজ্জা, আর একজন গুরু হয়েও দ্রোণাচার্য যে এই ব্যবহার করলেন–এটা চিরন্তন গুরুকুলের অত্যাচার–হস্ত! অর্জুনস্যেদং মহদেব কার্পণ্য, গুরোরপি গরীয়ানেবাত্যাচারঃ।
মহাভারতের কোনও কোনও সংস্করণের একটি অতিরিক্ত শ্লোকে দেখা যায়–দ্রোণাচার্য একলব্যকে অঙ্গুষ্ঠ কর্তন করতে বলেননি। তিনি যখন একলব্যকে তিনি যা চান তাই দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ দেখলেন, তখন নাকি তিনি একলব্যকে বলেছিলেন–ওইরকম বুড়ো আঙুল দিয়ে নয়, তুমি শর আকর্ষণ করবে তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে। দ্রোণাচার্য নাকি নিজে ওইভাবে শরাকর্ষণ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, কীভাবে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ছাড়াই তর্জনী আর মধ্যমা দিয়ে শরমোক্ষণ করতে হবে এবং দ্রোণাচার্যের চাওয়া গুরুদক্ষিণা ছিল এইটাই–তর্জনী-মধ্যমাভ্যাং শরং ধৃত্বা জ্যাকর্ষণং কর্তব্যমিতি অভিনীয় দৰ্শয়তি।
মহামতি নীলকণ্ঠ এই অতিরিক্ত শ্লোকটি আপন টীকার মধ্যে উদ্ধার করেছেন। তবে আমাদের মনে হয়–মহাভারতের মধ্যে স্থূলহস্তাবলেপী কোনও কবি দ্রোণাচার্যকে খানিকটা বাঁচানোর জন্য এই শ্লোক রচনা করেছেন। বস্তুত, দ্রোণাচার্য একলব্যের প্রতি যে ব্যবহার করেছেন এবং তাতে যে কলঙ্ক-রচিত হয়েছে, সেই কলঙ্ক-পঙ্ক দিয়ে দ্রোণাচার্যের কপালে তিলক-রচনার চেষ্টা হয়েছে এই শ্লোকে। সত্যিই এতে দ্রোণাচার্যের মহত্ত্ব কিছু বাড়ে না।
