অর্জুন সামান্য অভিমানে আহত হয়েও রইলেন। একদিন নিজেকে রুদ্ধ করতে না পেরে দ্রোণাচার্যের কাছে উপস্থিত হলেন। এখন দ্রোণের আশপাশে কেউ নেই। অর্জুন মনের কথা বলবেন পিতৃ-প্রতিম গুরুর কাছে। রাগ করে বলবেন না, সপ্রণয়ে বলবেন, সাভিমানে বলবেন–রহো দ্রোণং সমাসাদ্য প্রণয়দাদিদমব্রবীৎ। অর্জুন বললেন–গুরুদেব! আপনিই একদিন আমাকে সানন্দে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন–আমার শিষ্যদের মধ্যে তোমার থেকে ভাল কেউ থাকবে না–ভবতোক্তো ন মে শিষ্যবিশিষ্টো ভবিষ্যতি। কিন্তু আজকে দেখছি–শুধু আমি কেন, অন্য অনেক ধনুর্ধর বীরদের চেয়েও আপনার শিষ্য একলব্য ধনুর্বিদ্যায় শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে–অথ কস্মাবিশিষ্টো লোকাদপি চ বীর্যবান্। কেমন করে হল এই ঘটনা। আমার চেষ্টা এবং বিনয়ের তো অভাব ছিল না।
দ্রোণ বিব্রত হলেন। সত্যিই তো, তিনি অর্জুনকে কথা দিয়েছিলেন এবং এটাও ঠিক যে, হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্যকে তিনি তার পাঠশালায় স্থান দেননি। তাহলে কেমন করে এই ঘটনা ঘটল। অর্জুনের প্রতি দ্রোণাচার্যের পক্ষপাত সুবিদিত, তবু কেমন করে এই ঘটনা ঘটল? দ্রোণাচার্য অর্জুনকে বললেন–ঠিক আছে। চলো আমার সঙ্গে। একা অর্জুনকে নিয়ে দ্রোণাচার্য সেই নির্জন বনে উপস্থিত হলেন। সেখানে এসে দেখলেন–সেই ধূলিধূসরিত দেহ, কৃষ্ণাজিন পরিহিত বালকটি এক মনে শরমোক্ষণ করে যাচ্ছেন লক্ষ্যের দিকে–একলব্যং ধনুপাণি অস্যন্ত অনিশং শরা। দ্রোণ একেবারে আশ্চর্য হয়ে গেলেন, তার শিক্ষা ছাড়াই শুধু নিজের অধ্যবসায়ে এই ছেলেটি কতদূর এগিয়েছেন। নিজের একটু লজ্জাও হল, অহংকারেও আঘাত লাগল একটু।
একলব্য শরক্ষেপণ করতে করতে এক সময় দ্রোণাচার্যকে দেখতে পেলেন। দেখা মাত্রই ধনুঃশর নামিয়ে রেখে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে গুরুর চরণ স্পর্শ করলেন একলব্য–জগাম শিরসা মহীম্। তারপর পাদ্য–অর্ঘ্য দিয়ে যথাবিধি দ্রোণ–গুরুর পূজা সমাপন করে হাত জোড় করে দাঁড়ালেন একলব্য। বললেন–আমি আপনার শিষ্য। আদেশ করুন গুরুদেব। গুরুদেবের। মনে তখন অর্জুনের প্রতি পক্ষপাত কাজ করছে। অতএব আত্মলব্ধ আত্মশিক্ষিত এই বিদ্যাকে তিনি যে কোনও অজুহাতে দমিয়ে দিতে চাইলেন অদ্ভুত এক আচরণে। দ্রোণ বললেন–তুমি যখন নিজেকে আমার শিষ্য বলে ভাবছ, তাহলে তো আমাকে গুরু হিসেবে একটা বেতন দেওয়া উচিত–যদি শিষ্যোসি মে বীর বেতনং দীয়ং মম।
দ্রোণাচার্য শিষ্যের জন্য কিছুই করেননি। ধনুর্বিদ্যার একটি পাঠও তিনি একলব্যকে শেখাননি। অথচ একলব্য শুধু তাকে মনে মনে গুরু বলে মেনেছেন বলেই আজকে বেতন চাইছেন। এই বিপরীত ব্যবহারের অর্থ একলব্য খুব ভাল বুঝতে পারলেন না; উলটে তিনি বরং খুশি হলেন এই কথা ভেবে যে, তার অধ্যবসায় এবং পরিশ্রমে গুরুদেব খুশি হয়ে তাকে শিষ্য বলে বুঝি স্বীকার করে নিচ্ছেন আজকে। দেরিতে হলেও, না হওয়ার চেয়ে এই শিষ্যত্বের সংজ্ঞাও তার ভাল লাগবে। এটা তো সত্যি কথাই যে, মহান গুরুর শিষ্য–সংজ্ঞার মধ্যেও গৌরব আছে, ঠিক যেমন মহান শিষ্যের গুরু–সংজ্ঞার মধ্যেও আছে ওই একই গৌরব।
আজকে দ্রোণাচার্যের শিষ্য–গৌরব লাভ করে একলব্য রীতিমতো খুশি হয়ে বললেন–আজ্ঞা করুন গুরুদেব, কী-ই বা আমি দিতে পারি আপনাকে–কিং প্রযচ্ছামি ভগবন্ আজ্ঞাপয়তু মাং গুরুঃ। এই পার্থিব জগতে এমন কিছুই নেই, যা আপনাকে অদেয় হতে পারে আমার। আপনি আজ্ঞা করুন। শিষ্যের প্রতিজ্ঞাবাক্য শোনার সঙ্গে সঙ্গেই দ্রোণাচার্য বললেন তবে তোমার ওই দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটিই আমার চাই–তমব্রবীৎ ত্বয়াঙ্গুষ্ঠো দক্ষিণে দীয়তামিতি।
দ্রোণের আদেশটি ছিল আকাশ ভেঙে পড়ার মতো। যে ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতে চলেছে, তার কাছে শর-মোক্ষণের প্রধান সাধন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি যে কতটা প্রয়োজন, ধনুর্বিদ মাত্রই তা জানবেন। বিশেষত শরমোক্ষণের শীঘ্রতা, যা একলব্যের শিক্ষার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, সেই শীঘ্রতা সম্পন্ন হয় দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের সুচারু প্রয়োগেই। আর সেই অঙ্গুলীটিই দ্রোণাচার্য গুরুদক্ষিণা হিসেবে চাইছেন।
এই চাওয়ার মধ্যে যে ইচ্ছাকৃত অন্যায় আছে একলব্য তা জানেন। কিন্তু জানা সত্ত্বেও নিজের প্রতিজ্ঞা এবং সত্যরক্ষা থেকে মুহূর্তের জন্যও তিনি বিচলিত হলেন না– প্রতিজ্ঞামাত্মননা রক্ষন্ সত্যে চ নিয়তঃ সদা। সেই হাসিমুখটি তাঁর অবিচল রইল, মনের মধ্যে দেখা দিল না এতটুকু পঙ্কিল ভাব। গুরু বলেছেন, অতএব এতটুকুও ন্যায়–অন্যায় বিচার না করে একলব্য তার ডান হাতের বুড়ো আঙুলটি কেটে দ্রোণের হাতে দিয়ে দিলেন ছিত্ত্বাবিচাৰ্য্য তং প্রাদা দ্রোণায়াঙ্গুষ্ঠমাত্মনঃ।
এই ঘটনার মাধ্যমে কী প্রমাণ হল? এই নিদারুণ ঘটনার সাক্ষী দিয়ে মহাভারতের কবি কী বোঝাতে চাইলেন? প্রথমেই জানাই–সভ্যতা এবং সময় পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর অনেক পরিবর্তন ঘটে গেলেও মানুষের মূল চরিত্র পালটায় না। বিশ্বাস করুন–আজকের দিনেও এইরকম ঘটনা যে কত দেখেছি! এইরকম কত ঘটনার শিকার যে আমরাই। বুদ্ধি আছে, বৈষয়িক শ্রেষ্ঠতা আছে অথচ একলব্যের মতো গুরুর সঙ্গে সেঁটে থাকল না বলে জায়গা মতো তার নির্বাচন হল না, অথবা জায়গা মতো তাকে হেনস্তা করে তার রূপক বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠটি কেটে নিয়ে অন্য জনকে বহাল করা হল–এরকম ঘটনা আমরা হামেশাই দেখছি। আজকের দিনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তথাকথিত আচার্যদের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে–এঁরা কত মেধাবী ছাত্রের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কর্তন করেন। এই বাম আমলে যে কোনও মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহোদয়দের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে–কত উপযুক্ত ব্যক্তিকে পিছনে ফেলে এঁরা দলীয় নেতার সরসতায় সকলের মাথার ওপর এসে বসেছেন।
