যাই হোক, সমুদ্রমন্থন করে উৎকৃষ্ট ঘৃতই উঠুক আর ভেষজ বনস্পতিই উঠুক, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হল এই প্রাপ্তিটুকু অথবা আবিষ্কার। পণ্ডিতেরা অনেকে বলেন আর্যরা তাদের পূর্বভূমি থেকে এদিকে আসতে আসতে যত নতুন জিনিস দেখতে পেয়েছেন, সবই তারা সমুদ্র মন্থনের ফল বলে বর্ণনা করেছেন। সে যাই হোক, সমুদ্র থেকে ঘি ওঠার পরেই কিন্তু দেব-দানব সবারই দম ফুরিয়ে গেল। সামনে সমাসীন ব্রহ্মার কাছে গিয়ে দেবতারা আর্জি জানালেন, কতকাল ধরে এই সমুদ্র মন্থন করে যাচ্ছি, অমৃত যে ওঠেই না প্রভু। একমাত্র বিষ্ণু ছাড়া দেব-দানব সবাই যে বড় ক্লান্ত হয়ে গেলেন ঋতে নারায়ণং দেবং সর্বে’ন্যে দেবদানবাঃ। সবার অবস্থা দেখে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে বললেন, আপনি সবাইকে বল দিন, ভগবান! সবাই যে ক্লান্ত হয়ে গেল।
বিষ্ণু বললেন, আমি সবাইকে শক্তি দিচ্ছি, তোমরা সমুদ্র মন্থন চালিয়ে যাও। এই শক্তি কোনও অলৌকিক ঐশ্বর্য কিনা জানি না, তবে বিষ্ণু হয়তো কর্মরত সমস্ত দেব-দানবকে সেইভাবে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিলেন, যাতে আবার সবাই সমুদ্র মন্থনে লেগে পড়েন। সেই মন্থনের ফলে এবার পাওয়া গেল চাঁদকে। পূর্ব-দিগবধুর মুখ-চুম্বন করে চাঁদ উঠল আকাশে। পুরাণ-ইতিহাসের উদাসীন অকিঞ্চন বৈরাগী শিব সেই চাঁদকে চেয়ে নিলেন আপন জটাকলাপের আভূষণ হিসেবে–যযাচে শঙ্করা দেবো জটাভূষণকৃম্মম। এ খবর আমরা অবশ্য মহাভারতে পাইনি, মহাদেবের এই শশাঙ্ক-প্রার্থনার সংবাদ দিয়েছে পদ্মপুরাণ। স্বয়ং মহাদেব যেহেতু আহ্লাদ করে চন্দ্রকে যাচনা করে নিয়েছেন, তাই দেব-দানব কেউ সে ব্যাপারে কথা বললেন না।
মহাভারতের সমুদ্রমন্থন বর্ণনায় এবারে যাঁকে পাওয়া গেল, তিনি হলেন লক্ষ্মী। লক্ষ্মীকে নিয়ে দেব-দানবদের মধ্যে যে একটা বিশাল গণ্ডগোল পেকে গিয়েছিল, তার সম্বন্ধে মহাভারতের কবি একটি দুর্দান্ত ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন পরে। কিন্তু লক্ষ্মীর আবির্ভাবের সময় কবি একেবারে নিশ্চুপ। ভাগবত পুরাণ কিম্বা পদ্ম পুরাণ কিন্তু জানিয়েছে যে, লক্ষ্মী লাভের জন্য দেবতা দানব সবার মধ্যে রীতিমতো হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। দানব দৈত্যরা অবশ্য বেশি কিছু করেননি। তারা শুধু একবার লোলদৃষ্টিতে লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়েছিলেন। তা সে দেবতারাও তাকিয়েছিলেন। আর না তাকানোর মতো অহেতুক কিছু ছিল না। পৌরাণিক বর্ণনায় লক্ষ্মী যেভাবে সবার মধ্যে সলজ্জ হাসিতে, পায়ে নুপুরের ধ্বনি তুলে হাঁটতে আরম্ভ করেছিলেন–ততস্ততে নূপুরবস্তু শিঞ্জিতে / বিসপতী হেমলতেব সাবভৌ –তাতে দেব দানব সবারই দৃষ্টি পড়তে বাধ্য। যাই হোক, লক্ষ্মীর নিজের পছন্দটি কিন্তু একেবারে সপ্তম সুরে বাঁধা। দেব-দানব তার দিকে তাকিয়েই রইলেন শুধু, আর তিনি সাবহেলে বিসর্পিণী স্বর্ণলতার মতো আস্তে আস্তে গিয়ে ত্রিভুবনপতি ভগবান শ্রীহরির বুকে মুখ লুকোলেন- পশ্যতাং সর্বদেবানাং যযৌ বক্ষঃস্থলং হরেঃ। কিছু কিছু পুরাণ অবশ্য বলেছে যে, লক্ষ্মীকে দেখে দেব-দানবের সোচ্ছ্বাস অগ্রসর-ভাব পিতামহ ব্রহ্মাকে একটু চিন্তিত করে তুলেছিল। তিনি তাই দেব-সংসারে সবচেয়ে বুড়ো অভিভাবকের মতো লক্ষ্মীকে নারায়ণের হাতে তুলে দিলেন।
সমুদ্র মন্থন আবারও আরম্ভ হল। মহাভারতে কালকূট বিষ উঠেছে সবার শেষে। কিন্তু পৌরাণিকেরা অমৃত-মন্থনের উপাখ্যানে নাটকীয়তা সৃষ্টি করার জন্য বাসুকির মুখ দিয়ে বিষোদগার দেখতে পেয়েছেন আগেই। ভাগবত এবং অগ্নিপুরাণের মতো আবার প্রথমেই বিষ সৃষ্টি। বিষ্ণুপুরাণ এবং পদ্ম-পুরাণে দেখা যাচ্ছে সুরভি’র মতো আকুল মনমাতানো গন্ধ পাওয়া গেল আগে। অন্য মতে এই সুরভি হল স্বর্গের কামধেনুটি আর স্বর্গের সুগন্ধ বয়ে এনেছিল পারিজাত ফুল। সুরভির পরেই মন্থনের মুখে উঠে এসেছে উৎকৃষ্ট বারুণী মদ্য। মহাভারতে এই সুরার নামমাত্র উল্লেখ থাকলেও পদ্মপুরাণ এই সুরা-দেবীকে নায়িকার প্রতিরূপে চিহ্নিত করেছে। সে মদঘূর্ণিতলোচনা, স্বলিতপদা এবং টলটলে কাপড় পরা–দেবতারা নাকি ত্যাগ করেছিল তাকে, আর ঠিক সেই কারণেই অসুরেরা তাকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন।
আমাদের মৎস্য পুরাণ অবশ্য বারুশী মদ্যের ব্যাপারে সবচেয়ে বাস্তব তথ্যটি দিয়েছেন। একথা কিছুই অবোধ্য নয় যে, এতক্ষণ মন্দর-দণ্ড ঘুরিয়ে সমুদ্র মন্থন করে। দেব-দানব-দু’পক্ষেরই যা পরিশ্রম হয়েছিল, তাতে তাদের শক্তি উদ্ৰিক্ত করবার প্রয়োজন ছিল। মৎস্য পুরাণ তাই বলেছে– নানা ওষধি আর জীব জন্তুর বসা মেদে তৈরি হল উৎকৃষ্ট বারুণী মদতদঘুমেদ-সোৎসর্গাবারুণী সমপদ্যত। বারুণীর গন্ধে দেব-দানব সাবই আকুল হলেন এবং অন্য পুরাণগুলি দেবতাদের সম্মান রক্ষার জন্য যতই বলুন–তারা মদ্য স্পর্শ করেননি, আমরা জানি- দেব দানবেরা সবাই বানিকটা করে বারুণী পান করে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করে নিলেন তদাস্বাদেন বলিনো দেবদৈত্যাদয়ো’ভব। দ্বিগুণ শক্তিতে পুনরায় মন্দর পরিবর্তন আরম্ভ হল।
দেব দানব সকলের মিলিত শক্তিতে সমুদ্র থেকে অনেক কিছুই উঠেছিল। ঐরাবত হস্তী, উচ্চৈঃশ্রবা অশ্ব, নন্দনের মন্দার মঞ্জরী– এগুলি তো মন্থনের সাধারণ ফল। বিষ যা উঠেছিল মহাদেব তা পান করে নীলকণ্ঠ হলেন। পৌরাণিকদের অনেক কাহিনী এবং মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের পরম্পরায় অনেকের মধ্যে এইরকম ধারণা আছে যে, স্বয়ং লক্ষ্মী অমৃতের পাত্র হাতে উঠেছিলেন সমুদ্রের গভীর থেকে। কিন্তু আমাদের মহাভারত এবং অধিকাংশ পুরাণে যা পাই তাতে দেখা যায় অমৃতের ভাণ্ড হাতে নিয়ে যিনি সমুদ্র থেকে উঠলেন, তিনি হলেন দেব বৈদ্য ধন্বন্তরী। শুভ্র কমণ্ডলুর মধ্যে অমৃত ধারণ করে ধন্বন্তরী দাঁড়ালেন দেব-দানবে সবার সামনে–শ্বেতং কমণ্ডলুং বিভ্র অমৃতং যত্র তিষ্ঠতি।
