তস্মিন্ আচার্যবৃত্তিঞ্চ পরমামাস্থিতস্তদা।
ইম্বস্ত্রে যোগমাতস্থে পরং নিয়মমাস্থিতঃ।
.
১০২.
দিনের পর দিন অস্ত্রাভ্যাস করতে করতে ক্লান্তি আসে, একঘেয়েমিও আসে। যে কোনও শিল্প-কলার ক্ষেত্রে শিক্ষারম্ভ এবং শিক্ষান্তিম প্রয়োগ যথেষ্ট উত্তেজনাময়। কিন্তু মাঝখানের যে সময়টুকু, যখন অভ্যাসের নৈরন্তর্যে শিক্ষিত বিদ্যাকে শাণিত করতে হয়, সেই সময় ধৈর্য দেখাতে দেখাতে অতি উত্তম শিক্ষার্থীও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। পাণ্ডব-কৌরবদেরও এই ক্লান্তি এসেছিল। শেষে তারা একদিন দৈনন্দিন অস্ত্রাভ্যাসের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাবার জন্য গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে অনুমতি চাইল মৃগয়ায় যাবার জন্য।
দ্রোণাচার্য শিষ্যদের পরিশ্রম বোঝেন। অতএব তিনিও অনুমতি দিলেন। তাছাড়া মৃগয়ার মধ্যে তাঁর শিষ্যদের অস্ত্রাভ্যাসের একটা আন্দাজ পাওয়া যাবে বলে দ্রোণাচার্য তাদের এক কথায় মৃগয়ার অনুমতি দিলেন। রাজকুমাররা রথে করে মৃগয়ায় বেরিয়ে পড়লেন। সঙ্গের আজ্ঞাবহ কর্মর্করটি শিকার ধরার জাল, দড়ি এবং শিকারের অন্যান্য উপকরণ নিয়ে রাজপুত্রদের সঙ্গে চলল। তাদের সঙ্গে একটি শিকার ধরার কুকুরও চলল–রাজনুনুজগামৈকঃ শ্বানমাদায় পাণ্ডবান।
শিকারী কুকুর নিয়ে মৃগয়ায় যাবার চল সে যুগে যথেষ্টই ছিল। আমরা, মহাকবি বাণভট্টের লেখায় এই শিকারী কুকুরদের স্বাস্থ এবং শক্তির কথা বেশ ভালভাবেই পেয়েছি। প্রশিক্ষণ পাওয়া এই কুকুরগুলির প্রধান কাজ ছিল শিকারের খোঁজ দেওয়া এবং শিকার আহত হয়ে তীব্র বেগে পালাতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া।
পাণ্ডব-কৌরব কুমারেরা বনের মধ্যে শিকার–যোগ্য পশুপক্ষী খোঁজা আরম্ভ করলেন। শিকারী কুকুরটিও তার নিজের কাজে লেগে গেল। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে করতে এক সময় সবার অলক্ষে কুকুরটি নিষাদ-পুত্র একলব্যের কাছাকাছি অঞ্চলে পৌঁছল–শ্বা চরন বনে গঢ়ো নৈষাদিং প্রতি জগ্নিবান। কুকুরটির এতকালের অভ্যাস ছিল শিকার দেখলেই ঘেউ ঘেউ করে চেঁচিয়ে ওঠা। আজ একব্যকে দেখেও কুকুরটি তাই করল। এর কারণ হল–শিকার দেখে চেঁচিয়ে ওঠাটা যেমন কুকুরের অভ্যাস, তেমনই অদ্ভুত কোনও জিনিস বা চেহারা দেখলেও কুকুর স্বভাববশত চেঁচায়। এখানে একলব্যকে দেখে রাজকুমারদের কুকুর চেঁচিয়ে উঠল। একলব্যের ওই পাগলের মতো চেহারা, ধূলিধূসর দেহ, কালো গায়ের রঙ, তার মধ্যে কৃষ্ণাজিন পরিধানে। সব কিছু মিলে একলব্যকে অস্বাভাবিক এক ব্যক্তি বলে মনে করল কুকুরটি এবং ভয়ে চেঁচাতে লাগল–নৈষাদিং শ্বঃ সমালক্ষ্য ভয়ং তস্থৌ তদন্তিকে।
কুকুরটিকে চেঁচাতে দেখে একলব্য বিরক্ত হলেন এবং তার আকস্মিক চিৎকার বন্ধ করার জন্য একলব্য অন্তত সাত-সাতটি তীর ছুঁড়লেন কুকুরটির মুখে–শুনঃ সপ্ত শরা মুখে–এবং সেই তীর ছোঁড়ার মধ্যে এতটাই শীঘ্রতা ছিল, যাতে মনে হল যেন সাতটি শরই একবারে এসে কুকুরটির মুখে লাগল। কুকুরের চিৎকার এক লহমায় স্তব্ধ হল এবং বাণহত শরীর নিয়ে পোষা শিকারী কুকুর দৌড়ে এল পাণ্ডবদের কাছে–স তু শ্বঃ শরপূর্ণাস্যঃ পাণ্ডবানাজগাম হ।
কুকুরটির ওই অবস্থা দেখে পাণ্ডবরা একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। শুধু তাড়াতাড়ি তীর ছোঁড়াই নয়, একলব্য কুকুরের চিৎকার শুনেই বাণ-মোক্ষণ করেছিলেন। কুকুরটিকে তিনি চোখে দেখেননি। অর্থাৎ লক্ষ্যলব্ধতা এবং শব্দভেদ–এই দুটি বিদ্যাতেই একলব্য এতটাই পারদর্শী যে, পাণ্ডবরা শুধু অবাকই হলেন না, তারা লজ্জাও পেলেন এবং সেই অজ্ঞাতনামা ধনুর্ধরের প্রশংসাও করতে লাগলেন–প্রেক্ষ্য তং ব্রীড়িতাশ্চাস প্রশশংসুশ্চ সর্বশঃ। পাণ্ডবদের এবার মনে হল–মানুষটিকে একবার দেখা দরকার। তারা সকলে মিলে বনের ভিতর খোঁজাখুঁজি আরম্ভ করলেন। অনেকক্ষণ পর এক জায়গায় শরক্ষেপের শন্ শন্ শব্দ ভেসে এল। পাণ্ডবদের কানে। অবাক হয়ে তারা দেখলেন–মানুষটির শরক্ষেপের কোনও বিরাম নেই। ক্লান্তিহীন অভ্যাসে একের পর এক শরক্ষেপ করে এই কুমার–পুরুষটি তার বিদ্যা শাণিত করে যাচ্ছেন–দদৃশুঃ পাণ্ডবা রাজন্ অস্যন্তমনিশং শরা।
পাণ্ডবরা দেখলেন–তাদেরই বয়সী একটি ছেলে, যদিও তার চেহারা রাজপুত্রের মতো মোটই নয়, বরঞ্চ বলা যায় চেহারাটা একটু বিকৃতই বটে–তদা বিকৃতদর্শন। পাণ্ডবরা জিজ্ঞাসা করলেন–আপনি কে, আপনার পিতৃ–পরিচয়ই বা কী? অস্ত্রধারী উত্তর দিলেন–আমি নিষাদ রাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য। আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়–আমি দ্রোণাচার্যের শিষ্য এবং আমি ধনুর্বিদ্যায় অবিরাম পরিশ্রম করে চলেছি–দ্রোণশিষ্যঞ্চ মাং বিদ্ধি ধনুর্বেদকৃতশ্রম।
জীবনে এই ছেলেটিকে দ্রোণাচার্যের আশপাশেও দেখেননি পাণ্ডবরা। আর সে বলে কিনা–আমি দ্রোণাচার্যের শিষ্য! পাণ্ডবরা ভাল করে একলব্যের খবর নিলেন এবং তার জীবনের সব কিছু খবরও জানার চেষ্টা করলেন সাধ্য মতো। তারপর দ্রোণাচার্যের কাছে এসে পাণ্ডবরা সমস্ত ঘটনা নিবেদন করলেন–যথাবৃত্তং বনে সর্বং দ্ৰোণায়াচষ্যরদ্ভুতম্।
নির্জন বনের মধ্যে দ্রোণাচার্যের মূর্তি স্থাপন করে একলব্য যে সাধনা করে যাচ্ছিলেন, তাতে সবচেয়ে বিব্রত হয়েছিলেন অর্জুন। অস্ত্র ক্ষেপণের শীঘ্রতা, শব্দ শ্রবণমাত্র লক্ষ্যভেদ ধনুর্বিদ্যার এইসব কৌশল বিপুল পরিশ্রমে শিখতে হয় এবং একলব্য তা অর্জুনের চেয়েও ভাল শিখেছেন। অন্তত অর্জুন সেটা ভাল করেই বুঝেছেন। নীতি শাস্ত্রের কথায় বলে–একজন বিদ্বান ব্যক্তিই শুধু অপর বিদ্বানের পরিশ্রম এবং যত্ন বুঝতে পারেন। একজন বন্ধ্যা রমণীর পক্ষে তো আর পুত্র–প্রসবিনী জননীর কষ্ট বোঝা সম্ভব নয়। অর্জুন নিজের অভিজ্ঞতাতেই জানেন যে, একলব্য ধনুর্বিদ্যার এমন একটি পর্যায় অধিগত করেছেন, যা হয়তো তার নিজের পক্ষেও সম্ভব নয়। মনে মনে অর্জুনের বড় কষ্ট হল। জীবনে এত কষ্ট করে, এত পরিশ্রম করে তিনি অস্ত্রবিদ্যার দুরূহ সাধনা চালিয়ে গেছেন। অথচ সেই সাধনা তাকে এমন জায়গায় পৌঁছে দিল না, যাতে অর্জুনের নাম করলে অস্ত্রবিদ্যার ক্ষেত্রে আর দ্বিতীয় কোনও সংখ্যায় করাঙ্গুলি প্রসারিত হবে না।
