পুরোপুরি না হলেও মহাভারতের সময়কালে নিষাদদের মর্যাদার অবনতি ঘটেছে। অরণ্য এবং পার্বত্যভূমিতে প্রতিষ্ঠিত এই মানুষগুলিকে তখন এমন চোখে দেখা হচ্ছে যেন, তাঁরা মানুষখেকো জানোয়ার–নিষাদান্ পুরুষাদাংশ্চ। অথচ ব্রাহ্মণ্যের চরম হুংকার যে গ্রন্থে শোনা যায় সেই মনু পর্যন্ত লিখেছেন যে, নিষাদরা মাছ ধরে এবং বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। মহাভারতের পরিশিষ্ট হিসেবে পরিচিত হরিবংশে আবার দেখছি যে, নিষাদরা নদী থেকে মণি-রত্ন সংগ্রহ করে বিক্রি করত এবং তারই মূল্যে জীবন ধারণ করত। হরিবংশ-মনুতে এক রকম আর প্রাচীনতর সংহিতাগুলিতে আরেক রকম, হঠাৎ করে মাঝখানে এই মহাভারতের সময়ে নিষাদদের মর্যাদা এমন ভ্রষ্ট হল কেন, সেকথা ভাল করে বোঝা যায় না।
যদি বা এমন হয় যে, মাছ-ধরা বা রত্ন সংগ্রহের দ্বারাই তাদের জীবিকা নির্বাহ হত এবং সত্যিই তারা এতটা অপোগতি প্রাপ্ত হননি যতটা ওই নরমাংসভোজিতার অতিশয়োক্তিতে আছে, তবু বলতে হবে তখনকার সামাজিক দৃষ্টিতে নিষাদদের সঙ্গে রাজপুত্রদের একসঙ্গে ওঠা-বসা এবং চলা-ফেরা করাটা দ্রোণাচার্য ঠিক মনে করেননি। অর্থাৎ সামাজিকতার দিক থেকে পারস্পরিক ভেদ এবং সংশয় মহাভারতের আমলে এতটাই তৈরি হয়ে গেছে যে, ক্ষত্রিয় রাজপুত্র এবং নিষাদ রাজপুত্র একই গুরুর কাছে শিক্ষা লাভ করতে চাইলে, ক্ষত্রিয় শিষ্যদের বিরক্তি হবে ভেবে স্বয়ং গুরু এই অবর জাতির নিরীহ কিশোরটিকে প্রত্যাখ্যান করলেন–ন স তং প্রতিজগ্রাহ নৈষাদিরিতি চিন্তয়। নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য গুরু দ্রোণাচার্যের এই প্রত্যাখ্যান শান্ত মনে মেনে নিয়েছেন। কারণ প্রত্যাখ্যাত হতে হতে অবর-জনের মধ্যেও এক বিপন্ন মনস্তত্ব ক্রিয়া করতে থাকে। তারা আগে থেকেই মনকে তৈরি করে রাখে যে, প্রত্যাখ্যাত হতে পারি। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একলব্য কোনও মন্তব্য করেননি। তিনি পরম শ্রদ্ধায় দ্রোণাচার্যের চরণ দুটি আপন মস্তকে ধারণ করে অরণ্যের দিকে পা বাড়িয়েছেন–স তু দ্রোণস্য শিরসা পাদৌ গৃহ্য পরন্তপ।
দ্রোণের কাছে একলব্যের এই যে প্রত্যাখ্যান সূচনা হল, সঙ্গে সঙ্গে কিছু অল্পত ব্যক্তি চেঁচিয়ে উঠবেন–দেখলেন তো ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের কীরকম দাপট? সমাজের মাথায় দাঁড়িয়ে হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির প্রসাদ পেয়ে একটি ব্রাহ্মণ শুরু কীভাবে বড়লোক রাজা এবং রাজপুত্রের স্বার্থে একটি নিষাদকে প্রত্যাখ্যান করলেন। এরাই হচ্ছে সমাজের ভেস্টেড গ্রুপ। স্বার্থসিদ্ধির জন্যই এঁরা এইভাবে কতগুলি সাধারণ মানুষকে হীন করে রাখেন আর কতগুলি মানুষের স্বার্থরক্ষা করেন। আমাদের নিবেদন–ব্যাপারটা এইভাবে দেখলে মহাভারতকেই নেগেটিভলি দেখা হয়। আর যদি পজিটিভলি দেখেন, তাহলে বুঝবেন–আপনারা আজকে যে কথা সাড়ম্বরে ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে পারছেন, স্বয়ং মহাভারতের কবিই তা সাড়ম্বরে বলে গেছেন এবং তিনি যা সোচ্চারে বলে গেছেন আপনারা তার পুনরাবৃত্তি করছেন মাত্র।
মনে রাখা দরকার, মহাভারতের কবি নিজে ব্রাহ্মণের ঔরস-পুত্র হলেও এক দাসরাজ বা নিষাদরাজের মেয়ে তার জননী। অতএব আজকে একলব্যের প্রত্যাখ্যানে যে ব্যথা তিনি পেলেন, তা এক কবিজনোচিত সহমর্মিতায় ব্যক্ত হয়েছে তাঁর লেখনীতে। প্রথম কথা হল–দ্রোণ যে একলব্যকে প্রত্যাখ্যান করলেন, তার কারণ মহাভারতের কবি পরিষ্কার জানিয়েছেন–রাজপুত্রদের স্বার্থ–তেষামেব অন্ববেক্ষয়া–রাজপুত্রদের সম্মানের কথা মাথায় রেখেই দ্রোণ এই প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেন করেছেন? কারণটা জলের মতো পরিষ্কার। দ্রোণ প্রথম জীবনে বহুল পরিমাণ অন্নকষ্ট পেয়েছেন। এখন তিনি কৌরব-রাজপুরীতে রাজপুত্রদের অস্ত্রশিক্ষকের মর্যাদা পেয়েছেন। তার জন্য তিনি মহামতি ভীষ্মের কাছে বৃত্তি পান। তার জন্য তিনি থাকবার জায়গা পেয়েছেন, অন্ন–পানীয়রও অভাব নেই কোনও। অতএব এই নিষাদপুত্রকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করলে আজ যদি কুরুবৃদ্ধদের সামনে তাকে জবাবদিহি করতে হয়, তবে তার নিজের বিপদ বাড়বে বই কমবে না। অতএব এই নিষাদপুত্রের মূল্যে তিনি রাজপুত্রদের স্বার্থ দেখেছেন, সঙ্গে পরোক্ষভাবে নিজের স্বার্থও।
মহাভারতের কবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে তুমি ব্রাহ্মণ আর তুমি গুরু বলে তুমি যাকে কৃপা করবে, সেই শিখবে, আর যার দিক থেকে তুমি মুখ ফিরিয়ে নিলে, সে আর কিছুই শিখবে না–এমন ভাবা ব্রাহ্মণত্বের আহাম্মকি ছাড়া কিছুই নয়। যার ভিতরে মহাবস্তু আছে, আন্তর তেজ আছে, তা আপনার আনন্দে আপনিই প্রকাশিত হয়। স্বয়ং অর্জুনকে দিয়েই সে পরীক্ষা আগে হয়ে গেছে, এবার এক নিষাদপুত্র অর্থাৎ তথাকথিত ঘৃণিত এক অধমজাতির নিকৃষ্ট জাতকের মধ্যেও যে সেই সৃষ্টির আগুন থাকতে পারে, সে যে কোনও ব্রাহ্মণ-গুরু ছাড়াও আপনিই নিজের আন্তর গুণ জাগিয়ে তুলতে পারে তার জন্যই মহাভারতের কবির লেখনী এখন প্রসারিত।
হিরণ্যধনুর পুত্র নিষাদ একলব্য দ্রোণগুরুকে নিজের বিনতি-প্রণতি জানিয়ে অরণ্যের মধ্যে ফিরে গেল। সেইখানেই তার সাময়িক আবাস গড়ে উঠল। নিষাদদের মধ্যে শিল্পকলার চল ছিল ভালই। অতএব নিষাদ একলব্য প্রথমে মাটি দিয়ে দ্রোণাচার্যের একটি প্রতিকৃতি তৈরি করল। দ্রোণাচার্য তাকে শিষ্য বলে স্বীকার না করলে কী হবে, দুনিয়ার রাজপুত্রেরা যাঁর কাছে ধনুর্বিদ্যা শিখতে আসছে, সেই পরম গুরুটিকে সে যে এতকাল অন্তর থেকে গুরু বলে মেনে এসেছে। আজ তিনি মৌখিক প্রত্যাখ্যান করলেই তো আর অন্তরের গুরু অন্তর থেকে বেরিয়ে যাবেন না। অতএব দ্রোণাচার্যকেই আপন আচার্য বলে মেনে সে তার পরিশ্রম, অভ্যাস এবং চর্চার মাধ্যমে আপন অন্তরস্থিত ক্ষমতার অভিব্যক্তি ঘটাতে লাগল–
