দ্রোণাচার্যের প্রশিক্ষণ-নৈপুণ্যের কথা তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। নানাদেশ থেকে রাজপুত্রেরা আসছেন দ্রোণাচার্যের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য। ঠিক এইরকম রাজপুত্রদের আনাগোনার মধ্যেই একদিন দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষার পাঠভবনে এসে উপস্থিত হলেন নিষাদরাজ হিরণ্যধনুর পুত্র একলব্য–একলব্যো মূয়াজ..হিরণ্যধনুষঃ সুতঃ। একলব্যের গায়ের রঙ কালো, একেবারে পেটাই করা শরীর মেদবাহুল্যবর্জিত। পরনে একখণ্ড পশুচর্ম। ঝাকড়া চুল তার মাথার চারদিকে ছড়িয়ে আছে। সে চুল আঁচড়ায় না ভাল করে। শরীরে একটু-আধটু ধুলো লেগে আছে, তাও সে পরিষ্কার করার চেষ্টা করে না। কিন্তু তার চক্ষুদুটি ভীষণ সরল এবং উজ্জ্বল–কৃষ্ণং মলদিগ্ধাঙ্গং কৃষ্ণাজিনজটাধরম্।
দ্রোণাচার্যের কাছে একলব্য শিক্ষার্থী হয়ে এসেছে। সে তার পাঠশালায় শিষ্য হয়ে থাকতে চায়। দ্রোণাচার্য মহা ফাঁপরে পড়লেন। শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দিতে হবে, এই তো সাধারণ নিয়ম, সেখানে তো অন্য বিচার চলে না। কিন্তু সমসাময়িক কালের জাতি-গোষ্ঠীর বিচারে নিষাদ-পুরুষদের পক্ষে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সঙ্গে ওঠা-বসা বা মেলামেশা করা মুশকিল ছিল। তার কাছে থাকা আবাসিক রাজপুত্রেরা যদি এ ব্যাপারে আপত্তি তোলে, তাহলে দ্রোণাচার্য কিঞ্চিৎ অস্বস্তিতে পড়বেন। তার চেয়ে নৈষাদি একলব্যকে প্রত্যাখ্যান করাটাই তিনি শ্রেয় মনে করলেন বৃহত্তর স্বার্থে।
মনে রাখার দরকার, জাতি বা গোষ্ঠী হিসেবে নিষাদরা কিন্তু সময়ের দিক থেকে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় বা আর্যসভ্যতার সমবয়সী। জন্মগতভাবে নিষাদরা হলেন চতুর্বর্ণের পরের বর্ণ; নিষাদরা সংকরজন্ম। মনু মহারাজ জানিয়েছেন–ব্রাহ্মণ পিতার ঔরসে এবং শূদ্রা মাতার গর্ভে যে পুত্রের জন্ম হবে তাদের সংজ্ঞা হবে নিষাদ। ব্রাহ্মণরা যজ্ঞকার্যের প্রয়োজনে বা সামাজিক কারণে অবশ্যই একজন ব্রাহ্মণ-কন্যারই পাণি গ্রহণ করতেন। কিন্তু কামজ প্রয়োজন যখন ঘটত, তখন ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্রের ঘরের সুন্দরী রমণীটি ব্রাহ্মণের তৃপ্তির পরিসর থেকে বাদ পড়তেন না। কিন্তু সামাজিক নিয়মে ব্রাহ্মণ পিতার এই কামতৃপ্তির ফল ভোগ করতেন তাদের পুত্রেরা যাঁরা কেউ নিষাদ, কেউ পারশব ইত্যাদি সংজ্ঞায় চিহ্নিত হতেন।
আশ্চর্য ব্যাপার হল, সামাজিকতার বিচারে নিষাদরা হীনজাতির মধ্যে পরিগণিত হলেও বৈদিক যুগের শেষ কল্পেও তারা খুব তাড়াতাড়িই ব্রাহ্মণ্য বর্ণবিভাগের একতম হয়ে গিয়েছিলেন। ঋগবেদের–পঞ্চজন মম হোত্রং জুষধ্ব–এই মন্ত্রবর্ণ ব্যাখ্যা করতে সুপ্রাচীন আভিধানিক নিরুক্তকার যাস্ক পঞ্চজন শব্দের অর্থ করলেন–ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এবং নিষাদ। বাজসনেয়ী সংহিতার মধ্যেও ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় ইত্যাদি চতুর্বর্ণের সঙ্গে পঞ্চম জাতি হিসেবে আমরা নিষাদদের নাম একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হতে দেখি। সবচেয়ে বড় কথা কোনও প্রাচীন সংহিতা নিষাদদের অধিপতিকে বৈদিক ইষ্টি (যাগ) সম্পন্ন করারও নির্দেশ দিয়েছেন।
এমন হতেই পারে যে, ভারতবর্ষে আর্যায়গের প্রথম প্রক্রিয়ায় নিষাদরা সংখ্যায় অনেক ছিলেন এবং মনুষ্যজীবনের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের কর্ম এবং শিল্প–জ্ঞান অনেকের চেয়েই বেশি ছিল বলে ব্রাহ্মণ্য বর্ণবিভাগের অন্তরে শেষ স্থানটি দখল করে নিতে তাদের সময় লাগেনি। পৌরাণিকেরা অবশ্য নিষাদের জন্মকথা শুনিয়েছেন এই পৃথিবীর প্রথম রাজা মহারাজ পৃথুরও পূর্বকাল থেকে। অত্যাচারী বেনের এক হস্ত মন্থন করে নিষাদদের লাভ করেছিলেন ঋষি-ব্রাহ্মণেরা, আর অন্য হস্ত মন্থন করে নারায়ণ-সম পুমান্ পৃথুকে। কাজেই মহারাজ পৃথুর মতো এক পুরাণ–গুণসম্পন্ন ব্যক্তির বিপরীত কোটিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও মহারাজ পৃথুর পূর্বজত্ব তথা জন্মের সঙ্গে একাত্মতার নিরিখে ভারতবর্ষের অন্যান্য সংকর জাতির চেয়ে নিষাদদের মাহাত্ম বেশি। হয়তো এই মাহাত্ম রামায়ণের কালেও অটুট ছিল বলেই শৃঙ্গবেরপুরের নিষাদরাজ গুহকের সঙ্গে আর্য-সভ্যতার ধুরন্ধর পুরুষ রামচন্দ্রের পরম বন্ধুত্ব স্থাপিত হয়েছিল।
নিষাদদের থাকবার জন্য যে একটা নির্দিষ্ট জায়গা ছিল, তা মনে হয় না। কৌষিতকী ব্রাহ্মণ অথবা লাট্যায়ন শ্ৰেীতসূত্রের মতো প্রাচীন বৈদিক গ্রন্থে দেখা যায় যে, যিনি বিশ্বজিৎ যজ্ঞ করবেন, তাঁকে নিষাদ-পুরীতে গিয়ে বসতি গ্রহণ করতে হবে সাময়িকভাবে। এতে বোঝা যায় যে, নিশ্চয়ই প্রত্যেক আর্য রাষ্ট্রেই কোনও একটা জায়গায় নিষাদদের পৃথক আবাসস্থল ছিল। তবে বেশিরভাগ প্রাচীন গ্রন্থের প্রমাণ একত্রিত করলে দেখা যাবে যে, সাধারণভাবে নিষাদরা থাকতেন বিন্ধ্যপর্বতের আশপাশের পার্বত্য উপত্যকায় এবং বনাঞ্চলে। মহাভারতের সভাপর্ব অনুযায়ী ভারতবর্ষের মধ্যদেশ এবং মালব অঞ্চলে আবার বনপর্ব অনুযায়ী সরস্বতী নদীর তীরভূমি এবং পশ্চিম ভারতেও নিষাদদের আবাস দেখা যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে প্রচলিত মত হল এই যে, নিষাদরা ভারতবর্ষের মধ্যদেশে অথবা আরও একটু দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে থাকতেন। বাজসনেয়ী সংহিতার টীকাকার মহীধর যা ইঙ্গিত করেছেন, তাতে নিষাদদের ভিল-উপজাতির মানুষ বলে মনে করেছেন পণ্ডিতরা এবং তারাও ভারতের মধ্যদেশ এবং বিন্ধ্যপর্বতের বলয়ে থাকা মানুষ।
