কিন্তু এইখানেই অর্জুনের সঙ্গে অন্যের তফাত। তিনি বিরক্ত তো হলেনই না, উপরন্তু অন্ধকারে খেতে খেতে তার মনে হল–আরে! বেশ তো খাচ্ছি। অন্নযুক্ত হাতটি তত মুখ ছাড়া অন্য কোথাও যাচ্ছে না–হস্ত-স্তেজস্বিনস্তস্য…নাস্যা অন্যত্র বৰ্ততে। অর্জুন বুঝলেন অভ্যাসে সব হয়। অভ্যাসে যদি খাবার অসুবিধে না হয়, তবে অভ্যাস করলে অন্ধকারেও অস্ত্ৰচালনা সম্ভব। লক্ষ্যবস্তুর শব্দ শুনে তাকে না দেখেও অস্ত্রের দ্বারা লক্ষ্যভেদ সম্ভব, যদি অভ্যাস ঠিকমতো হয়।
অর্জুন আর দেরি করেননি। সেই রাত্রেই, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ল, তখন তিনি ধনুক-বাণ হাতে বেরিয়ে পড়লেন অন্ধকারে শব্দ শুনে লক্ষ্যে আঘাত করার জন্য–তদভ্যাসকৃতং মত্বা রাত্রাবপি স পাণ্ডবঃ। রাত্রির অন্ধকারে হিংস্র শ্বাপদ এবং রাত্রিচর পশু-পক্ষীর শব্দ ছাড়া আর কীই বা শোনা যায়। অতএব শব্দভেদের প্রথম লক্ষ্য হল এরাই। অভ্যাস আরম্ভ হল। কখনও তার লক্ষ্য বিদ্ধ হল, কখনও বা নয়। প্রথম রাত্রির অভ্যাসে কতই বা তার কাছে আশা করা যেতে পারে। কিন্তু প্রত্যক্ষ বস্তু ভেদন করার শক্তিতে তিনি যেহেতু অতুলনীয়, অতএব অন্ধকারেও সে বিদ্যা কিছুটা কাজে লাগল। অতএব লক্ষ্য কিছু বিদ্ধও হল, কিছু বা হল না। কিন্তু অভ্যাস চলতে লাগল বীর যোদ্ধার একাগ্রতায়। বাণ চলতে লাগল শন-শন করে, আর ঠিক এই অবস্থাতেই দ্রোণ তার শয়ন-গৃহের শয্যা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। এসে দেখেছেন–তিনি যা চেয়েছিলেন, সেটা হয়নি বটে, কিন্তু যা হয়েছে, সেটা তিনি আগেই বুঝেছিলেন যে, একমাত্র অর্জুনের দ্বারাই এমনটা সম্ভব, অন্য কারও পক্ষে এটা সম্ভব নয়।
যে দ্রোণাচার্য আপন পুত্রের স্বার্থে অস্ত্রবিদ্যার গূঢ় একটি কৌশলমাত্র লুকিয়ে রাখবেন বলে ঠিক করেছিলেন, সেই দ্রোণাচার্য যখন দেখলেন যে, শিষ্য তার আপন উদ্ভাবনী শক্তিতে নিজেই নিজের গুরু হয়ে গেছেন, তখন তিনি শিষ্যকে জড়িয়ে না ধরে পারেননি। রাতের অন্ধকারে আপন প্রিয় শিষ্যকে এইভাবে অস্ত্রাভ্যাস করতে দেখে তিনি তার সমস্ত পক্ষপাত উজাড় করে দিলেন শিষ্যের প্রতি। এমন শিষ্যের ওপরেও মনুষ্যধর্মী গুরুর পক্ষপাত হবে না?
আমার এক বন্ধু বাজারে আনাজ বিক্রি করে। আরেক বন্ধু ইঞ্জিনিয়ার। তিনি বাজারে আমার পূর্ব বন্ধুর কাছ থেকে আনাজ কেনেন। আনাজ–বিক্রেতা এবং ইঞ্জিনিয়ার–দুজনেই এক সময় একই স্কুলে পড়তেন ছোটবেলায়। সৌভাগ্যক্রমে আমিও। এই সূত্রেই একদিন আনাজ–বিক্রেতা ইঞ্জিনিয়ারকে বলল–সুখে আছিস ভাই, তোরা। চাকরি–বাকরি করছিস। মাঠের মধ্যে বসে আনাজ বিক্রির কষ্ট তো আর বুঝলি না? তুই যখন সন্ধ্যাবেলা বউ–ছেলে নিয়ে ঘুরতে বেরুবি, তখন আমি পরের দিন আনাজের ঝাঁকাটা তোলার চিন্তা করছি।
ইঞ্জিনিয়ার প্রথমে ভাবল, কিছু বলবে না। তারপর আনাজ ব্যাগে পুরতে পুরতে বলল–একটা কথা বলি ভাই, রাগ করিস না। তুই এখনকার সময় ছেড়ে দিয়ে আমাদের সেই ছোটবেলা আর প্রথম যৌবনের সময়টায় চলে যা। তুই যখন পাড়ায় পাড়ায় পকেট-ভর্তি গুলি নিয়ে খাটান আর জেত্তালের খেলা করছিস, তখন কিন্তু আমি বাড়িতে বসে ইতিহাস মুখস্থ করছি। সে কষ্ট কি তুই-ই বুঝেছিস? তুই যখন বিশ্বকর্মা পুজোর তিন মাস আগে থেকে ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দিয়ে এক তাল ঘুড়ি নিয়ে আমারই বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে একশোবার ভোকাট্টা বলে নৃত্য-চিৎকার করছিস, তখন ওই একটা ঘুড়ি কাটার সঙ্গে সঙ্গে আমারও কিন্তু মন কেটে যেত। কিন্তু আমি জোর করে সেই বিদীর্ণ মনকে পড়ার টেবিলে এনে ফেলেছি। কৈশোর-যৌবনের প্রথম সন্ধিতে তুই যখন, ভাই-আই মিলন কি বেলা অথবা কাশ্মীর কি কলির পিছনে উদ্দাম উত্তেজনায় লাইন লাগাচ্ছিস, আমি কিন্তু তখন বাড়িতে বসে ভোদার মতো অঙ্ক করে যাচ্ছি। তুই কি সেই কষ্ট কখনও বুঝেছিলি? মানুষকে এক সময় কষ্ট করতেই হয়। হয় ছোটবেলায় নয় বড়বেলায়। তুই এখন কষ্ট করছিস, আর আমি আমার শৈশব-কৈশোর জলাঞ্জলি দিয়ে তখন কষ্ট করেছি।
আমরা দ্রোণাচার্যের পক্ষপাতের প্রসঙ্গে অন্য কথায় চলে এসেছিলাম। এসেছিলাম এই কারণে যে, অন্য বালকেরা যখন নিজেদের খেলাধুলা, নিজেদের শৈশব-কৈশোরের উপভোগটুকু বাদ দিচ্ছেন না, তখনও অর্জুন কিন্তু নিজের পরিশ্রম এবং অভ্যাস চালিয়ে যাচ্ছেন। ভোগসুখহীন এই তীব্র পরিশ্রম দেখার পরেও এমন কোনও আচার্য বা গুরু থাকতে পারেন না, যিনি তাঁর শিষ্যের প্রতি পক্ষপাত আচরণ করবেন না। দ্রোণাচার্যও এই পক্ষপাত স্বীকার করেছেন এবং অর্জুনকে বলেছেন–আমি তোমার জন্য এমন চেষ্টা করব যাতে পৃথিবীতে কেউ তোমার সমান ধনুর্ধর না হতে পারে–ত্বৎসমো ভবিতা লোকে..যথা নানন্যা ধনুর্ধরঃ। দ্রোণাচার্য নিজের ছেলের কথা এবার ভুলে গেছেন। তিনি তাঁর সমস্ত ঐকান্তিকতা দিয়ে অর্জুনকে চরম অস্ত্রশিক্ষা দিতে লাগলেন। রথ, অশ্ব, হস্তী ইত্যাদি বাহনের ওপর থেকে যুদ্ধ করতে গেলে ধনুক-বাণ ধরার স্টান্স থেকে আরম্ভ করে বাহনশূন্য অবস্থায় মাটিতে দাঁড়িয়ে থেকেও কীভাবে আবার আত্মলাভ করা যায়, সেইসব সূক্ষ্ম-গভীর কথাগুলি অর্জুনকে শিখিয়ে দিলেন দ্রোণাচার্য–রথেষু ভূমাবপি চ রণশিক্ষামশিক্ষয়ৎ।
দ্রোণাচার্যের কাছে অন্যান্য কুরু-কুমারেরা যে অবহেলিত হচ্ছিলেন তা মোটেই নয়। তারাও যথাসাধ্য যথামতি গুরুর কাছে বিদ্যা শিখছিলেন বটে, কিন্তু অর্জুনের প্রতি দ্রোণাচার্যের যে পক্ষপাত তৈরি হয়ে গেছে, তা আর লুপ্ত হবার ছিল না। দ্রোণাচার্যের এই পক্ষপাত কত তীব্র তার জন্য একটি অদ্ভুত ঘটনার উল্লেখ করেছেন মহাভারতের কবি। এ ঘটনা শুনে নানা জনের নানা মন্তব্য থাকবে এবং তার মধ্যে আমাদের বক্তব্যও আমরা পরিষ্কার করার চেষ্টা করব।
