রাঁধুনে বামুন ভাবল–প্রদীপিত আলোয় অর্জুনের অনুগ্রহণ করার সঙ্গে দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষার একটা গভীর সম্পর্ক আছে এবং অন্ধকারে খেলে বুঝি সে অস্ত্রজ্ঞান একেবারেই লুপ্ত হয়। এ কথা অর্জুনকে বলা-না-বলার সঙ্গেও অস্ত্রশিক্ষার যোগ থাকতে পারে। এত সব ভেবে সে বুঝি মনে মনে ঠিকই করে ফেলল যে, এখন থেকে সারা রাতই আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখবে অর্জুনের ঘরে। কোথা থেকে কী হবে আর তার রাঁধুনের চাকরিটি যাবে।
দ্রোণাচার্য যে নির্দেশ দিয়ে গেলেন, তার তাৎপর্য যে কত গভীর সে তো রাঁধুনে বামুন বুঝবে না। সে যা বোঝেন, দ্রোণাচার্যই বোঝেন। কিন্তু দুর্দৈব এমনই যে, দ্রোণাচার্য যা ভেবেছিলেন, অসংহতা প্রকৃতির চক্রান্তে তা বিপর্যস্ত হয়ে গেল। সে দিন কুমারেরা বাড়ি ফিরে এলেন সান্ধ্য-স্নান এবং আহ্নিক সেরে। সারা দিন আবহাওয়ায় কিছু উষ্ণতার প্রকোপ ছিল। এখন সন্ধ্যাবেলায় ভালরকম হাওয়া উঠল। পাঁচক ঠাকুর মোটা সলতে উসকে উসকে প্রদীপটি অনির্বাণ রেখে দিল এবং প্রদীপের সলতে ভাল করে উসকে দিয়ে আবাসিক পাণ্ডবদের সঙ্গে অর্জুনকেও খেতে দিল। কিন্তু সেদিনের আকুল প্রাকৃতিক পরিবেশে হাওয়ার এমনই দাপাদাপি শুরু হল যে তৈলপূর প্রদীপটি হঠাৎই নিভে গেল–তেন তত্র প্রদীপঃ স দীপ্যমাননা নিবাপিতঃ। প্রদীপ নিভিয়া গেল।
.
১০১.
সেদিন রাত্রে দ্রোণাচার্যের বেশ ভাল ঘুম এসে গেছে। সারাদিন বালকদের অস্ত্র-প্রশিক্ষণ দেওয়া, নিজের ব্রাহ্মণোচিত সন্ধ্যা-আহ্নিক, অগ্নিষ্টোম ইত্যাদির ফলে পরিশ্রমও তার কম যায় না। অতএব নিদ্রাদেবী যেন মহৎ-সেবার মাধুর্যে প্রৌঢ়প্রায় মানুষটিকে আপন আলিঙ্গনে বদ্ধ করেছেন। কিন্তু ঘুম যত গভীরই হোক একজন যোদ্ধা পুরুষের ঘুমানোর নিয়ম প্রায় কুকুরের মতো। সংস্কৃতে একে বলে শনিদ্র। চেষ্টা করতে হবে কাকের মতো, ঘুমাতে হবে কুকুরের মতো। কাজেই ঘুম যত গভীরই হোক মাঝে মাঝেই দ্রোণাচার্যের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙার কারণও আছে।
হস্তিনাপুরের প্রত্যন্ত-প্রদেশে তমাল-বকুল আর নানা বৃক্ষের ছায়ায় দ্রোণাচার্যের কুটির নির্মিত হয়েছে। এখান থেকে বনাঞ্চল বেশি দূরে নয় বলে রাতের আঁধারে নানা পশুপক্ষীর বিচিত্র আওয়াজ কানে ভেসে আসে। বিশেষত যামঘোষ শৃগালগুলি যামঘোষণার সময় এমনই সঙ্গত এবং কর্কশ স্বরে ডাকতে আরম্ভ করে যে, নিদ্রায় অচেতন মানুষেরও ঘুম ভাঙবে। সেখানে দ্রোণাচার্যের মতো সদাজাগ্রত যুদ্ধবীর তো আপন যুদ্ধস্বার্থে নিজের ঘুম-ভাঙাটাকে অভ্যাসে পরিণত করেছেন।
সেদিন প্রথম দু-একবার দ্রোণাচার্যের ঘুম ভাঙেনি বটে, কিন্তু তার পরেই বিভিন্ন পশুপক্ষী এবং বিশেষত শৃগালের ডাকের মধ্যে একটা অন্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলেন তিনি। অন্যদিন কী হয়, এক শৃগালের স্বর শুনে অন্য শৃগালগুলিও ডাকতেই থাকে, ডাকতেই থাকে এবং সেই সমবেত এবং প্রলম্বিত চিৎকার-ধ্বনির একটানা সুরে আবারও ঘুম এসে যায় দ্রোণাচার্যের। কিন্তু আজকে তা হচ্ছে না। পশুর চিৎকারে ঘুম ভাঙছে বটে, কিন্তু তার পরেই হাওয়ার মধ্যে অতিদ্রুত এক শন-শন আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এবং তার পরক্ষণেই পশুপক্ষীর সশব্দ পলায়ন এবং প্রপতন শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাদের আওয়াজটা কর্কশের বদলে খানিকটা আর্তও হয়ে উঠছে যেন এবং তাও দূর থেকে শোনা যাচ্ছে।
দ্রোণাচার্য প্রথমে ভাবলেন–সাধারণ চোর অথবা জনপদের শেষ সীমায় থাকা আটবিক অথবা নিষাদগণের উপদ্রব বা আনাগোনায় এমনতর পার্থক্য হতে পারে। কিন্তু ওই একই ঘটনা বারবার ঘটতে লাগল এবং তাও বেশ অল্প সময়ের ব্যবধানে। দ্রোণাচার্য আরও আশ্চর্য হলেন মুহূর্মুহূ শন-শন্ আওয়াজ শুনে। এ আওয়াজ তার খুব চেনা–তস্য জ্যাতল-নির্ঘোষং দ্রোণঃ শুশ্রাব ভারত। নিষাদ কিংবা আটবিক হলে এমন মুহূর্মুহূ তীরের আওয়াজ শোনা যেত না। নানা ভাবনা-চিন্তা করে দ্রোণাচার্য কুটিরের কোণস্থিত প্রদীপখানি উসকে দিয়ে অর্গল মুক্ত করলেন।
ঘুম তার অনেকক্ষণই ভেঙে গেছে। কিন্তু বাইরে এসে তিনি যা দেখলেন তাতে তার চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে গেল। দেখলেন–অর্জুন। রাতের গভীর নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মতোই গভীর নিচ্ছিদ্র মনোযোগে তিনি বাণাভ্যাস করে যাচ্ছেন। এমন গভীর কষ্টকর চেষ্টা দেখেও এইরকম শিষ্যের প্রতি গুরুর পক্ষপাত আসবে না কি? রাতের অন্ধকারে যখন সকলে নিদ্রায় অচেতন, তখন এই কৈশোরগন্ধী যুবক শুধু অকারণের আনন্দে অস্ত্রশিক্ষাকে এক শিল্পে পরিণত করছেন।
দ্রোণ প্রথমে একটু আশাহত হলেও পরমুহূর্তেই শিষ্য-গৌরবে আনন্দে আত্মহারা হয়ে জড়িয়ে ধরলেন শিষ্যকে। তিনি যেমনটি চেয়েছিলেন, তা হয়নি বটে কিন্তু যা হয়েছে এবং তা যেহেতু অর্জুনের হয়েছে–অতএব তিনি পরম আনন্দে অর্জুনকে জড়িয়ে ধরে বললেন–আজ থেকে আমি এমন চেষ্টা করব, যাতে তোমার মতো আর দ্বিতীয় ধনুর্ধর এই পৃথিবীতে তৈরি না হয়–প্রতিষ্যে তথা কর্তৃং যথা নানন্যা ধনুর্ধরঃ।
আজকে যে রাতের অন্ধকারে অর্জুনকে দেখতে পাবেন দ্রোণ–এ আন্দাজ তার আগেই ছিল। অস্ত্রশিক্ষার ব্যাপারে এই শিষ্যটির নব-নবান্মেষশালিনী প্রজ্ঞার কথা তিনি মনে-প্রাণে অনুভব করেন, আর অনুভব করেন বলেই অর্জুনের অনুপস্থিতিতে তার আবাসস্থলে গিয়ে দ্রোণাচার্য রান্নার পাঁচকটিকে সাবধান করে দিয়ে এসেছিলেন–যাতে সে অন্ধকারে অর্জুনকে খাবার না দেয়। কিন্তু প্রকৃতি এবং দৈবের নীতি-নিয়ম মানুষের ইচ্ছেমতো চলে না। পাঁচক বামুন না চাইলেও অর্জুনকে খাবার দেবার পরে প্রদীপ নিভে গিয়েছিল। খাবার মাঝপথে প্রদীপ নিভে যাবার পর সে প্রদীপ জ্বালানোও আর সম্ভব হয়নি। খাবার যতটুকু বাকি ছিল অন্যেরা তা ঠিকঠাক মতো খেয়েই উঠে গেল। প্রদীপ নিভে যাবার বিরক্তি ছাড়া আর কারও মনে ভাবনা কিছু হল না।
