ব্রহ্মাস্ত্রধর ব্যক্তির কাছে সবচেয়ে যেটা কাম্য সেটা হচ্ছে–ওই নিয়ন্ত্রণ। কাম-ক্রোধ লোভ–মোহ ইত্যাদিকে যিনি ব্যক্তিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছেন তিনি ব্রহ্মাস্ত্র-ধারণের অধিকারী। যার জন্য দ্রোণাচার্য কর্ণকে বলেছেন–ব্রহ্মাস্ত্র ধারণ করতে পারেন শম-দমের গুণসম্পন্ন ব্রাহ্মণ, অথবা তপঃস্বাধ্যায়সম্পন্ন তপস্বী অথবা ন্যায়-নীতিনিষ্ঠ ক্ষত্রিয়। দ্রোণাচার্য কর্ণকে যা বলেছেন তার গভীর অর্থ আরও স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হয়েছে ব্যাস-নারদের দ্বৈত-ভাষণে। তারা বলেছেন–ব্রহ্মাস্ত্র হল ব্রহ্মতেজোময়। যিনি ব্রহ্মচারীর ব্রতে স্থিত নন, যিনি ইন্দ্রিয় জয় করতে পারেননি, এমন অকৃতাত্মা পুরুষ এই অস্ত্র ধারণ, মোক্ষণ এবং সম্বরণের যোগ্য হতে পারেন না।
ঋষিদ্বয় যে ব্রহ্মচর্যের কথা বলেছেন তার তাৎপর্য নিহিত আছে ব্রহ্মাস্ত্রধারী যোদ্ধার সংযমে, আত্মনিয়ন্ত্রণে। এই সংযম এবং নিয়ন্ত্রণের দিকে ইঙ্গিত করেই অস্ত্রধারণের ব্যাপারে দ্রোণাচার্য একান্বয়ে ব্রাহ্মণ, তপস্বী বেং ন্যায়নীতিনিষ্ঠ ক্ষত্রিয়ের অধিকার নির্ণয় করেছেন। তিনি কর্ণকে বোঝাতে চেয়েছেন–যে মানুষ এই অস্ত্রশিক্ষার কালেই তার সহপাঠীকে হত্যা করার ভাবনায় অথবা শুধুমাত্র একজনকে অতিক্রম করার ভাবনায় এমন একান্তে এসে ব্ৰহ্মাস্ত্র চাইতে পারে, সে অন্তত ব্রহ্মাস্ত্র ধারণের যোগ্য নয়। যে মানুষ একজনের ওপর ব্যক্তিগত ক্রোধই এড়াতে পারছে না, সে তো নিজের সামান্য বিপদমাত্রেই অথবা নিজের অহংকারবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্যই যে কোনও সময় এই অস্ত্রমোক্ষণ করবে। অতএব আর যাই হোক, তাকে ব্রহ্মাস্ত্রের প্রয়োগ শেখানো যায় না। দ্রোণ কর্ণকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তিনিও দ্রোণের আশ্রম ছেড়ে চলে গেছেন ভার্গব পরশুরামের কাছে এবং তাও কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্রের প্রয়োগ শেখার জন্যই।
যাই হোক, কর্ণ দ্রোণের আশ্রম ছেড়ে চলে গেলেন এবং তার জন্য দ্রোণের অস্ত্র-পাঠশালার কোনও ক্ষতি-বৃদ্ধি হল না। শিক্ষার আসর চলতে লাগল আগের মতোই। দ্রোণের আশ্রমস্থ সেই মেধাবী শিষ্যটি আগের মতোই অনুসন্ধিৎসা, আগের মতোই বিনয় এবং সংযমের মাধ্যমে অস্ত্রশিক্ষা করে যেতে লাগলেন। শিক্ষার ব্যাপারে তাঁর বহু ইচ্ছে কাজ করে। কারও কাছে যদি তিনি শোনেন যে, অমুক দেশের রাজা অসাধারণ একটি অস্ত্রবিদ্যা জানেন, তাহলেই তিনি সেই বিদ্যাটি শিখতে চাইবেন। যদি শোনেন–প্রাচীন কালে অমুক বংশের অমুক পুরুষ একটি বিশেষ অস্ত্রকৌশল জানতেন, অমনই অর্জুন চেষ্টা করে যাবেন সেই কৌশলটি শেখার জন্য এবং সেই চেষ্টাটা করবেন নিজেই, গুরু যদি তা না শেখান তো নিজেই।
দ্রোণাচার্য বুঝে গিয়েছিলেন–এ এক সাংঘাতিক ছেলে। এর কাছে কিছুই লুকিয়ে রাখা যায় না। নিজপুত্র অশ্বত্থামাকে একটু আলাদা শিক্ষা দিচ্ছিলেন, তাও এই ছেলেটি শিখে ফেলেছে। তিনি না শিখিয়ে পারেননি। এখন তার প্রশিক্ষণের ভাণ্ডারে আর একটিমাত্র বস্তু বাকি আছে। সেটি হল শব্দভেদী বাণ-মোক্ষণের শিক্ষা। দূরের জিনিস চোখে না দেখে শুধু শব্দমাত্রে আন্দাজ করে নিয়ে লক্ষ্য ভেদ করতে হবে। ভীষণ রকমের অভ্যাস, মনঃসংযোগ এবং শব্দ চিনে নেবার কান থাকলে এই শব্দভেদ শেখা যায়। গুরু দ্রোণাচার্য জানেন–উপরি উক্ত কোনও গুণেরই অভাব তাঁর শিষ্যের মধ্যে নেই এবং যেভাবেই হোক এই বিচিত্র অস্ত্রকৌশলের নানা কাহিনী অর্জুন লোকমুখে শুনেছেন। বিশেষত ইক্ষাকুবংশীয় দশরথ রাজার শব্দভেদন ক্ষমতা মহাভারতের সমাজে প্রচারিত ছিল। অর্জুনের ইচ্ছা আছে ওই বিদ্যা শেখার কিন্তু গুরু দ্রোণাচার্যর শেখানোর ইচ্ছে নেই। হয়তো এই একটিমাত্র কৌশল তিনি নিজপুত্রের জন্য সঞ্চিত রেখে দিতে চান।
কিন্তু বিদ্যাশিক্ষার ব্যাপারে অর্জুনকে দ্রোণাচার্যের বিশ্বাস নেই। অর্জুনকে এতদিন ধরে শিক্ষা দিতে দিতেই তিনি বুঝে গেছেন যে, সব কিছুই তাকে শিখিয়ে দিতে হয় না। শিক্ষার স্থল অনেক-বিদ্যালয়, মনুষ্য-সমাজ, বাহ্য জগৎ। কাজেই অর্জুন যে কোথা থেকে কোন ঘটনা থেকে নিজের নব-নবোন্মেষশালিনী প্রজ্ঞায় কী আবিষ্কার করে ফেলবেন, সেটা দ্রোণাচার্য আন্দাজ করতে পারতেন। সেই আন্দাজ করেই একদিন তিনি অর্জুনের অনুপস্থিতিতে তার ঘরে গেলেন।
হস্তিনাপুরের একান্তে দ্রোণাচার্যের বাসভবনের কাছাকাছি অনেকগুলি ছাত্রাবাস তৈরি হয়েছে। একেকটি আবাসে পাঁচ–ছজন করে ছাত্র থাকতে পারে। ছাত্ররা ব্রহ্মচর্য পালন করে, যথাসাধ্য লঘুপাচ্য খাবার খায় এবং কুশশয্যায় শয়ন করে। যেহেতু রাজপুত্রদের কায়িক পরিশ্রম অত্যন্ত বেশি তাই একেকটি আবাসের রন্ধন কর্ম সম্পন্ন করার জন্য একেক জন পাঁচক ছিল। দ্রোণাচার্য একদিন অর্জুনের আবাসে এসে পাচককে ডেকে পাঠালেন। গুরুর তলব পেয়ে পাঁচক তড়িঘড়ি এসে উপস্থিত হল দ্রোণাচার্যের কাছে। সে বলল–আজ্ঞে বলুন, কত্তা। কী আদেশ। দ্রোণাচার্য বললেন–এই আবাসেই তো অৰ্জুন থাকেন? পাঁচক সম্মতি জানাতেই দ্রোণ বললেন–দেখো বাছা! তোমাকে একটা কথা বলি–তুমি কখনও ওই অর্জুনকে অন্ধকারের সময় খাবার দেবে না–অন্ধকারেজুনায় অন্নং ন দেয়ং তে কদাচন।
হঠাৎ এই কথাটার কোনও মাথামুণ্ডু বুঝতে পারল না পাঁচক। তবে নিম্নতন এক কর্মচারীর মানসিকতায় সে ভাবল যে, সে-ই কিছু অপরাধ করে থাকবে। সে বলল–না কত্তা! আমি তো কোনওদিন তেনাকে অন্ধকারে খাবার দিই নি। সন্ধে থেকেই আমি ঘরের কোণে প্রদীপ জ্বালিয়ে দিই, মাঝে মাঝেই আমি সেই তৈলপূর প্রদীপের সলতে উসকে দিই। প্রদীপ জ্বলতে থাকে সেই তেনারা ঘুমিয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত। দ্রোণাচার্য বোকা সেজে বললেন–বেশ বেশ। প্রদীপ যেন জ্বলে। আরও একটা কথা। আমি যে তোমাকে এসব নির্দেশ দিয়ে গেলাম, সেটা যেন আবার অর্জুনকে বোলো না বাপুন চাখ্যেয়ম্ ইদঞ্চাপি মাক্যং বিজয়ে ত্বয়া। তাহলে তোমার বিপদ হবে।
