দ্রোণ বুঝলেন, সব বুঝলেন। কর্ণের এই মন-ভেজানো কথায় তিনি একটুও বিচলিত হলেন না। অর্জুনের প্রতি তার পক্ষপাত একদিনে তৈরি হয়নি বা এমনি-এমনিই হয়নি। দিনের পর দিন তিনি যাকে সদানত হয়ে কঠোর পরিশ্রম করতে দেখেছেন, সেই অর্জুনের তুলনায় কর্ণও অতি বিচক্ষণ যোদ্ধা বটে। কিন্তু সে বড়ো তাড়াতাড়ি এবং পরিশ্রম ছাড়াই স্বার্থসাধনের উপযুক্ত অস্ত্রকৌশল শিখে নিতে চায়। তাছাড়া এ কী? অল্প বয়সেই সে তার এক সহপাঠীকেই ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্রের আধার হিসেবে বেছে নিয়েছে। দ্রোণের ভাল লাগল না। অর্জুনের প্রতি তার পক্ষপাত আছে, এ তিনি নিজেও মনে মনে স্বীকার করেন–সাপেক্ষঃ ফাল্গুনং প্রতি। কিন্তু কর্ণ যে রীতিমতো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই ব্রহ্মাস্ত্রের মতো সাংঘাতিক অস্ত্রের প্রয়োগ শিখতে চাইছেন, সে কথা দ্রোণ বেশ বুঝতে পারলেন। বুঝলেন যে, কর্ণের কু-মতলব আছে–দৌরাত্মঞ্চৈব কর্ণস্য বিদিত্বা তমুবাচ হ।
কর্ণ যেহেতু বেশ ইনিয়ে-বিনিয়ে দ্রোণের কাছে ব্রহ্মাস্ত্রের কৌশল শিখতে চাইছেন, তাই দ্রোণও কর্ণকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন একটু তির্যকভাবে। তার কথার মধ্যে যুক্তি এবং রাগ, দুটোই প্রকাশিত হল তির্যকভাবেই। দ্রোণ বললেন–দেখ বাপু! ব্রহ্মাস্ত্র যার তার জন্য নয়। ব্রহ্মাস্ত্রের প্রয়োগ জানবেন ব্রাহ্মণ, জানবেন নীতি-নিয়মনিষ্ঠ ক্ষত্রিয়–ব্রহ্মাস্ত্রং ব্রাহ্মণো বিদ্যা যথাবচ্চরিতব্রতঃ। ব্রহ্মাস্ত্র জানবেন সত্তম তপস্বী, আর কেউ ব্রহ্মাস্ত্র জানবার অধিকারীই নয়–নানো বিদ্যাৎ কথঞ্চন।
দ্রোণের কথাটার ভালরকম তাৎপর্য আছে। সে কালের দিনে অনেক ব্রাহ্মণই অস্ত্রবিদ্যার গূঢ় কৌশল জানতেন, জানতেন অনেক মুনি-ঋষি তপস্বীরাও। ব্রহ্মাস্ত্র হল এমন এক মারণাস্ত্র যা শত্রুর সমূহ এবং সার্বিক ক্ষতি করে। একে সেকালের দিনের বহুতর অস্ত্র-সম্ভারের নিরিখে ঠিক পরমাণু-অস্ত্র বলা যাবে কিনা সে সম্বন্ধে পণ্ডিত-জনের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে। তবে মহাভারতে এবং রামায়ণে ব্রহ্মাস্ত্রের প্রয়োগকালীন যে অবস্থা বর্ণিত হয়েছে, তাতে অনেক পণ্ডিতই ব্রহ্মাস্ত্রকে পরমাণু-কল্প কোনও অস্ত্র বলেই ভাবেন।
মহাভারতে ভারত-যুদ্ধের অন্তকালে দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামার ব্রহ্মশিরা নামক মারণাস্ত্র প্রতিরোধ করার জন্য অর্জুন ব্রহ্মাস্ত্র-মোক্ষণ করেছিলেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে–ব্রহ্মাস্ত্র মোক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে যুগান্তকারী আগুন জ্বলে উঠেছিল–প্রজজ্বাল মহার্চিস্মদ যুগান্তানলসন্নিভ। চারদিকে মনে হল কে যেন ভীষণ আঘাতে সব কিছু ভেঙে ফেলছে, যেন উল্কাবৃষ্টি হচ্ছে সমস্ত দেশ জুড়ে–নির্ঘাতাঃ বহবশ্যাসন পেতুরুল্কা সহস্রশঃ। ব্রহ্মাস্ত্র-মোক্ষণের সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হল–ভয়ানক শব্দ এবং আগুন। এমনই কর্ণভেদী সেই শব্দ যাতে আকাশ ফেটে যাবার অনুভূতি হয়, এমনই সেই আগুন যাতে মনে হয় সর্বত্র আগুন ব্যাপ্ত হয়ে গেছে– সশব্দমভব ব্যোম জ্বালা–মালাকুলং ভৃশম্। সমস্ত পৃথিবী কাঁপতে লাগল থর-থর করে, পর্বত-বন একাকার প্রায়। পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ভয়েই স্রিয়মাণ হয়ে উঠল আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায়–মহ ভয়ঞ্চ ভূতানাং সর্বের্ষাং সমজায়ত।
রামায়ণে রাবণের ওপর যে ব্রহ্মাস্ত্র ক্ষেপণ করেছিলেন রামচন্দ্র, তারও বর্ণনা অনুরূপ ভয়ঙ্কর। সেই গগনভেদী শব্দ, সেই অগ্নিব্যাপ্ত দিমণ্ডল, সেই ভূমি–ভূধর প্রপতন। রামায়ণে ব্রহ্মাস্ত্রের বর্ণনা দেখে অনেক পণ্ডিতই এটাকে পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে কল্পনা করেছেন। আমরা শ্রুত আছি–জাপানে যখন অ্যাটম–বোমা ফেলা হয়, তখন সেই অগ্নিজ্বালাব্যাপ্ত দিঙুমণ্ডলের উদ্ভাস বর্ণনা করেছিলেন কুখ্যাত এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী ওপেনহাইমার। শোনা যায়–অ্যাটম–বোমা ক্ষেপণের মুহূর্তে তিনি একটি মহাভারতীয় শ্লোকই উচ্চারণ করে বলেছিলেন–যদি আকাশে একই সঙ্গে সহস্র সূর্যের উদয় হয়, তবে যে তেজ নির্গত হবে, এই বিরাট মহান পুরুষের তেজও তেমনই–
দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেৎ যুগপদুখিতাঃ।
যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাৎ ভাসস্তস্য মহাত্মনঃ।
ওপেনহাইমার ভালই সংস্কৃত জানতেন শুনি। তার এই বর্ণনা যদি তার চক্ষু-কর্ণ এবং মনের অস্ত্রক্ষেপণের মৌর্তিক ভাব প্রকাশ করে থাকে, তবে রামায়ণ-মহাভারতে ব্রহ্মাস্ত্রের বর্ণনা পারমাণবিক সাম্যে কল্পনা করতে অসুবিধা হয় না। আমরা জানি–আমাদের আধুনিক বৈজ্ঞানিক সংস্কার তথা তৎকালীন সমাজের ধাতু-পদার্থের বিচার আমাদের এতটাই বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন করে তুলবে, যাতে সেই কালে পারমাণবিক অস্ত্র-ব্যবহারের কথা আমরা সত্য বলে মেনে নিতে পারব না। কিন্তু মূলত পারমাণবিক না হলেও, সেকালের খ্যাতকীর্তি যোদ্ধার হাতে যে সর্বনাশা অস্ত্রটি ছিল, সেটার নাম অবশ্যই ব্রহ্মাস্ত্র। ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের অধিকারী–বিচারের মধ্যেও একালের ছায়া আছে কিন্তু।
পারমাণবিক অস্ত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে আজও একটা অধিকারী বিচার চলে। রাজনৈতিক শক্তিধর দেশগুলির মধ্যে যারা ধনে-মানে বৃহত্তম তারাই পরমাণু-শক্তিধরও বটে। তারা কিন্তু কখনও চায় না–ক্ষুদ্র এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভঙ্গুর দেশগুলির হাতে কোনও পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক অথবা ক্ষুদ্র কারণে সেই অস্ত্র ব্যবহৃত হোক। আমরা মনে করি–পরমাণু অস্ত্র কোনও শক্তির হাতেই থাকা উচিত নয়, কিন্তু রাজনৈতিক কারণ এমনই কুটিল এবং বিচিত্র যে, শত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও এই অস্ত্রের মোহ থেকে বড়ো-ছোট কোনও দেশই মুক্ত নয়। মহাভারতেও দেখা যাবে–দুটি বৃহৎশক্তির হাতে ব্রহ্মাস্ত্র গেছে। তার মধ্যে এক পক্ষের অস্ত্রের ওপর মানসিক নিয়ন্ত্রণ নেই, আরেক পক্ষের আছে।
