কিন্তু অর্জুন খেয়াল করলেন। অস্ত্র-শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ এবং সময় নষ্ট না করার সামগ্রিক ইচ্ছেটাই হয়তো অৰ্জুনকে এই খেয়াল করাল। অর্জুন বুঝলেন–কমণ্ডলু এবং কলসীর খেলায় তিনি অশ্বত্থামার চেয়ে পিছিয়ে পড়েছেন। এবার অর্জুন তাঁর নিজের কৌশল খাটালেন পূর্বশিক্ষিত বিদ্যার মাধ্যমেই। তিনি অশ্বত্থামাকে তাড়াতাড়ি আসতে দেখে নিজে আর নদীতে যাবার সময়টুকুও নিলেন না। বরুণ অস্ত্রের মাধ্যমে কমণ্ডলু ভর্তি করে তিনি চলে আসতেন গুরুর কাছে। ফলে অশ্বত্থামার প্রাপ্য অতিরিক্ত গূঢ় পাঠটুকু অর্জুনও পেতে আরম্ভ করলেন সঙ্গে সঙ্গে। ফলে অশ্বত্থামার আর অর্জুনের চেয়ে বড় হওয়া হল না। অর্জুন অশ্বত্থামা থেকে কোনও অংশে কম গেলেন না–-ন ব্যহীয়ত মেধাবী পার্থোস্ত্রবিদুষাং বরঃ।
এবারে বলুন এমন ছাত্রের প্রতি গুরুর পক্ষপাত হবে কিনা? ছাত্রের বিদ্যাশিক্ষার যে তীক্ষ্ণতা এবং অনুসন্ধিৎসার জন্য গুরু তার আপন পুত্রকে পর্যন্ত আলাদা করে রাখতে পারলেন না, এই ব্যাপ্তি থাকলে যে কোনও মেধাবী শিষ্য অর্জুনের মতোই গুরুর পক্ষপাত লাভ করবেন। মহাভারতের কবি মন্তব্য করেছেন–অর্জুন আরও বেশি করে গুরুসেবা করতে লাগলেন, আরও বেশি করে অস্ত্রশিক্ষা করতে লাগলেন এবং এই দুয়ের ফলে তিনি দ্রোণাচার্যের আরও বেশি প্রিয় হয়ে উঠলেন–অস্ত্রে চ পরমং যোগং প্রিয়ো দ্রোণস্য চাভবৎ।
অর্জুন যখন বেশ ভাল যোদ্ধা হয়ে উঠেছেন এবং দ্রোণাচার্যের সর্বাত্মক দৃষ্টি যখন একমাত্র অর্জুনের দিকে, ঠিক এই সময়েই একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল। ঘটনাটা একেবারেই ছোট্ট কিনা, তা সুধীদের বিচার্য, তবে ঘটনাটা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। দ্রোণের পাঠশালায় অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে কর্ণই একমাত্র অর্জুনের প্রতিস্পর্ধী ছিলেন। তিনি সর্বদা অর্জুনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করতেন এবং যে কোনও উপায়ে অর্জুনকে কীভাবে পর্যদস্ত করা যায়, সেই চেষ্টা করে যেতেন নিরন্তর। হয়তো এই বিরোধিতার মধ্যে মহারাজ দুর্যোধনের প্রত্যক্ষ মদত ছিল এবং তা আমরা আগে কথঞ্চিৎ উল্লেখও করেছি। মহাভারতের পরবর্তী পর্ব থেকেও জানা যায় যে, সেই অস্ত্রপরীক্ষার সময় নয়, দুর্যোধনের সঙ্গে কর্ণের বন্ধুত্ব হয়েছিল একেবারে বাল্যকালেই–স সখ্যমকরো বাল্যে রাজ্ঞা দুর্যোধনেন বৈ। হয়তো দুর্যোধনের সঙ্গে কর্ণের এই বন্ধুত্বের দুর্দৈব এবং কর্ণের স্বভাব–দৈবাচ্চাপি স্বভাবতঃ–এই দুয়ের ফলে অর্জুনের অস্ত্রশিক্ষার ক্ষমতা আরও বেশি করে বিধল কর্ণের বুকে।
কর্ণ দেখলেন যে, অস্ত্রশিক্ষার সমস্ত বিষয়ে, বিশেষত ধনুর্বিদ্যার ক্ষেত্রে অর্জুন সবার চেয়ে বেশি এগিয়ে গেছেন–সর্বাধিকমথালক্ষ্য ধনুর্বেদে ধনঞ্জয়। ঈর্ষা এবং অসূয়ায় কর্ণের মন বিষিয়ে উঠল। কীভাবে, কোন সহজ উপায়ে অর্জুনকে অতিক্রম করা যাবে তার কোনও উপায় খুঁজে পেলেন না কর্ণ। ওদিকে মেধা এবং পরিশ্রম একত্র হওয়ায় গুরু দ্রোণাচার্যের পক্ষপাতও দিনকে দিন বেড়েই চলেছে অর্জুনের ওপর। কর্ণ আর সহ্য করতে না পেরে, সকালবেলায় সবাই যখন কমণ্ডলু ভরে নদীতে জল আনতে গেছে, একান্তে উপস্থিত হলেন দ্রোণাচার্যের কাছে। কর্ণ বললেন গুরুদেব! একটা কথা আছে।
–কী কথা, বৎস!
গুরুদেব! আমি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগের উপায় শিখতে চাই? কীভাবে এই অস্ত্র মোচন করতে হয়, কীভাবেই বা প্রযুক্ত ব্রহ্মাস্ত্রকে সম্বরণ করতে হয়, সব আমি জানতে চাই–ব্ৰহ্মাস্ত্রং বেমিচ্ছামি সরহস্য-নিবর্তনম্।
–কেন, কেন, হঠাৎ তুমি ব্রহ্মাস্ত্রলাভের জন্য এত ব্যগ্র হয়ে উঠলে কেন?
আজ্ঞে গুরুদেব! অন্য কিছু নয়। আমি শুধু ওই অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই–অর্জুনেন সমং চাহং যুদ্ধেয়মিতি মে মতিঃ।
কথাটা দ্রোণাচার্যের ভাল লাগল না। শুধু অর্জুনের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য–এই ছেলেটি যুদ্ধের সবচেয়ে মারণাস্ত্রটি শিখে নিতে চায়। বেশ বোঝা যায়–এ কোনও সুস্থ প্রতিযোগিতা নয়, অর্জুনকে হত্যা করাই শুধু এর উদ্দেশ্য। ছাত্রদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হোক–এটা যে কোনও গুরুর উদ্দেশ্য থাকে। আর কর্ণ যথেষ্ট ভাল ছাত্রও বটে, কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যা হয়– মেধা যার বেশি থাকে সে কখনও বা ফাঁকি দিয়ে ফেলে। কর্ণ তাই করেন। কিন্তু মেধার সঙ্গে পরিশ্রম যুক্ত করার বাস্তব জ্ঞান যে ছাত্রের থাকে, তাকে রুখতে পারে এমন শক্তি দুনিয়ায় নেই। অর্জুনের প্রতি দ্রোণাচার্যের পক্ষপাত সেইজন্যই।
লক্ষণীয় যে গুরুর কোনও নির্দিষ্ট শিষ্যের প্রতি পক্ষপাত আছে, সেই পক্ষপাত যদি শিষ্যের মেধার কারণবর্জিত হয়, তাহলে গুরুকে তা স্মরণ করিয়ে দিলে তার লজ্জা উপস্থিত হয়। অর্জুনের প্রতি স্বাভাবিক বিদ্বেষে কর্ণ দ্রোণাচার্যের পক্ষপাত অযৌক্তিক মনে করেন বলেই তাকে লজ্জায় ফেলার জন্য বললেন–দেখুন গুরুদেব! সব শিষ্যই গুরুর কাছে সমান। আর আপনি তো পুত্রকে যেমন স্নেহ করেন তেমনই করেন শিষ্যকে–সমঃ শিষ্যেষু বঃ স্নেহঃ পুত্রে চৈব তথা ধ্রুব। তা আপনি আমার ওপর একটু খুশি হোন গুরুদেব। আমি আপনার কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখেছি। কাজেই বিচক্ষণ লোকেরা যাতে না বলতে পারে যে, আপনার কাছে বিদ্যা শিখেও আমার কিছুই হয়নি–ত্বপ্রসাদান্ন মাং ব্রযুরকৃতাস্ত্রং বিচক্ষণাঃ। আর সেইজন্যই ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করার শিক্ষাটাই আমার একান্ত দরকার।
