দুর্যোধন পাণ্ডবদের দেখতে পারেন না জ্ঞাতিশত্রুতার কারণে আর কর্ণ অর্জুনকে দেখতে পারেন না অস্ত্রবিদ্যায় তিনি কর্ণের সমান পারদর্শী বলে। কিন্তু দুজনের বিরোধিতার গতি-প্রকৃতি আলাদা হলেও দুর্যোধন-কর্ণের বন্ধুত্ব হল বিরোধের একাত্মতায়। দুর্যোধনের সুবিধা হল–তাকে এখন আর নিজে পাণ্ডবদের অপমান করতে হয় না, তার কটুকথা বলার সাধটি তিনি পুরিয়ে নেন কর্ণকে দিয়ে। কর্ণই পাণ্ডবদের অপমান করেন এবং দুর্যোধন সেটা উপভোগ করেন–দুর্যোধনং সমাশ্ৰিত্য সোবমন্যত পাণ্ডবান্। যাঁরা ভাবেন সেই অস্ত্র পরীক্ষার রঙ্গমঞ্চে অর্জুনের প্রতিস্পর্ধী হিসেবে কর্ণের অপমান হল আর দুর্যোধন তাঁকে অঙ্গরাজ্যের রাজমুকুট পরিয়ে দিয়ে তার অকৃত্রিম বন্ধু হলেন, তারা জানবেন–দুর্যোধন কর্ণের বন্ধুত্ব শুরু হয় দ্রোণাচার্যের আখড়া থেকেই।
যদি বলেন–এই তো অন্যায় আরম্ভ হল। দ্রোণ আচার্য বলে কথা। তিনি অর্জুনের প্রতি অযথা পক্ষপাতিত্ব করবেন কেন? তিনি গুরু, সমদর্শিতাই তার প্রধান গুণ হওয়া উচিত। মানি, একথা খুব মানি। দীর্ঘকাল ছাত্র-ছাত্রীদের পড়িয়ে এবং তার চেয়েও বেশি সময় আমার পরম পূজ্য শিক্ষকদের দেখে আমার এই অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, সমদর্শিতা যে কোনও শিক্ষক বা গুরুর পক্ষে নিতান্তই বড় গুণ এবং নীতিগতভাবে আমরা শিক্ষকরা সকলেই তা মেনে নিই। কিন্তু একই বিদ্যালয়ে বা একই শিক্ষাস্থলে সকলের মধ্যে যদি অতি-মেধাবী ছাত্র একটি থাকে তবে সেই ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের পক্ষপাতিত্ব তৈরি হতে বাধ্য। আর যদি তা না হয়, তবে বুঝতে হবে যে, তিনি শঙ্করাচার্যের ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যার তত্ত্বে সম্পূর্ণ সমাধি লাভ করেছেন। ঠিক এই কারণেই, বিশেষত এই পক্ষপাতের কথা একবার মাত্র উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে মহাভারতের কবিকে তাই পরিষ্কার করে বলতে হয়েছে–শিক্ষা, বাহুবল, উদ্যোগ, পরিশ্রম এবং অস্ত্রবিদ্যার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগ থাকায় অর্জুনই কিন্তু দ্রোণাচার্যের পাঠশালায় সবার মধ্যে সবচেয়ে ভাল ছেলে হয়ে উঠলেন–অস্ত্রবিদ্যানুরাগাচ্চ বিশিষ্টোভবদৰ্জুনঃ।
পক্ষপাতটা কীভাবে তৈরি হল? মহাভারতের কবিকে বাড়তি শ্লোক লিখতে হচ্ছে। সকলেই একই অস্ত্রের অনুশীলন করছে, দ্রোণাচার্যও তাঁদের সবাইকে একই অস্ত্র শিক্ষা দিচ্ছেন–তুল্যেম্বস্ত্র-প্রয়োগেযু। কিন্তু তারই মধ্যে হাতের ক্ষিপ্রতা, হাতের কৌশল–এগুলিই চরম অভ্যাসবশে, এমনভাবেই অর্জুনের মাথায় আসতে লাগল, যে সকলের মধ্যে অর্জুন আপনিই প্রধান হয়ে পড়লেন–সর্বেষামেব শিষ্যাণাং বভূবাভ্যধিকোজুনঃ। দ্রোণ বুঝলেন– এ ছেলে সাধারণ নয়, এ সবার থেকে আলাদা। একই বিদ্যা সকলকে একইভাবে দেওয়া সত্ত্বেও যে চরম অভ্যাসে অর্জুন সেটাকে করতলগত করেছেন–সেটা দেখেই দ্রোণাচার্যের পক্ষপাত তৈরি হল। তিনি বুঝলেন–এ সবার থেকে আলাদা–ঐন্দ্রিম্ অপ্রতিমং দ্রোণ উপদেশমন্যত।
১০০. অর্জুনের অস্ত্রশিক্ষার ক্ষমতা এবং কৌশল
১০০.
অর্জুনের অস্ত্রশিক্ষার ক্ষমতা এবং কৌশল প্রায় প্রাবাদিক পর্যায়ে পৌঁছল। দ্রোণাচার্যের অস্ত্র-পাঠশালায় এমন কোনও ছাত্র ছিল না, যে অর্জুনের ধারে-কাছে যেতে পারে। অর্জুন এই বিদ্যা শিখছিলেন প্রচণ্ড পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। সমস্ত শিষ্যদের প্রতি দ্রোণাচার্যের একই ব্যবহার থাকলেও তার নিজের ছেলে অশ্বত্থামার প্রতি পিতা হিসেবে তার বেশি দুর্বলতা থাকার কথা। দ্রোণাচার্যের তা ছিলও। অশ্বত্থামা অন্যান্য কুরু-পাণ্ডব বালকদের সঙ্গেই দ্রোণের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিখতেন। কিন্তু নিজের ছেলেটিকে সবার মধ্যে ভাল দেখতে কার না ইচ্ছে করে। তাই দ্রোণ যখন দেখলেন যে, অর্জুন নিশ্চিতভাবে সবার থেকে এগিয়ে রয়েছেন, তখন তারও ইচ্ছে হল যে, তার ছেলেটি অন্তত কিছু বেশি কৌশল শিখুক। কিন্তু সবার মধ্যে তো আর সে সুযোগ পাওয়া যায় না, আর সারাদিনের অস্ত্রশিক্ষার পরে দ্রোণশিষ্যেরা কেউ বাড়িতেও ফিরে আসতেন না যে, সকলের আড়ালে দ্রোণ তার ছেলেকে কিছু গূঢ় কৌশল শিখিয়ে দেবেন।
সেকালের দিনে যে কোনও শিক্ষা মানেই গুরু-গৃহে বাস করা। কাজেই গুরুগৃহের অন্তেবাসী অন্যান্য শিষ্যদের সামনে অশ্বত্থামাকে আলাদা শিক্ষা দেওয়া ছিল অসম্ভব ব্যাপার। কাজেই পুত্রস্নেহের টানে দ্রোণ একটা সামান্য কৌশল করলেন। সকালবেলায় উঠে সন্ধ্যা-আহ্নিকের জন্য প্রত্যেক শিষ্যকেই নদী থেকে কমণ্ডলু ভরে জল আনতে হত। কমণ্ডলুর স্বল্প পরিসর মুখ দিয়ে জল ভরে আনতে বেশি সময় লাগে বলে–কমণ্ডলুঞ্চ সর্বেষাং প্রাচ্ছচ্চিরকারণা—দ্রোণাচার্য অশ্বত্থামাকে একটি বড়ো মুখের কলসী দিয়েছিলেন জল ভরে আনার জন্য। অশ্বত্থামা নদীতে গিয়ে স্নান করেই কলসী ঢলিয়ে জল ভরে খুব তাড়াতাড়ি চলে আসতেন পিতার কাছে। অন্য বালকেরা তখন স্নান করছে, একটু একটু খেলা করছে, গ্লব-গ্লব করে কমণ্ডলু ভরছে অর্থাৎ কিছু সময় নষ্ট করছে। আর সময় নষ্ট করার ওইটুকুই যা সময় বালকদের। কিন্তু ওইটুকু সময়ের মধ্যেই যে অশ্বত্থামার যে কিছু অতিরিক্ত শিক্ষা হয়ে যাচ্ছে, সেটা অন্য বালকেরা খেয়ালই করল না। কিন্তু অর্জুন সেটা খেয়াল করলেন–দ্রোণ আচষ্ট পুত্রায় তৎ কর্ম জিষ্ণুরৌহত।
