কৈশোরগন্ধী বালকেরা গুরুর কথা শুনে একে অপরের মুখ চাওয়া-চায়ি করল। গুরু দ্রোণ ঠিক কী চাইছেন, কেন চাইছেন–এসব কথা তাদের হৃদয়ে তেমন করে সাড়া জাগাল না। কিন্তু সমস্ত বালকের মধ্যে একজন, যে কারও দিকে তাকাল না, কারও সঙ্গে পরামর্শ করল না। শুধুমাত্র গুরু বলেছেন, অতএব করতে হবে–এই বিচারে সে চরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল–আপনি যা বলবেন, যা চাইবেন, তাই আপনাকে দেব–অর্জুনস্তু ততঃ সর্বং প্রতিজজ্ঞে পরন্তপঃ। এই বালক অর্জুন। বড় খুশি হলেন দ্রোণাচার্য। এমন নির্বিচারে কেউ তাকে এইভাবে বিশ্বাস করেনি। শিষ্যের মহত্ত্ব দেখে তিনি একদিকে যেমন খুশি হলেন, তেমনি একই সঙ্গে চিনে নিলেন তাঁকে–এ ছেলে অন্য সবার থেকে আলাদা। এখনও যে কোনও অস্ত্রশিক্ষাই পায়নি, কিন্তু শিক্ষালাভের পূর্বে যে প্রগাঢ় আত্মবিশ্বাস প্রয়োজন হয়, সেই আত্মবিশ্বাসেই সে ভবিষ্যৎকে এখনই জয় করে নিয়েছে। দ্রোণাচার্য বড় খুশি হলেন।
আমরা একে শুধু আত্মবিশ্বাস বলি না, আত্মসমর্পণও বলি। শিক্ষা এবং দীক্ষার আরম্ভেই গুরুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। নইলে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। এই আত্মসমর্পণ শিষ্যকে দুর্বল করে না, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, যার ফলে অর্জুনের মতো বলা যায়–আপনি যা চান, তাই পাবেন। আরও একটা কথা–আমাদের শাস্ত্রে গুরু-শিষ্যের পরিচয়ে দুজনেরই দুজনকে পরীক্ষা করে নেবার কথা বলা আছে। মনে রাখবেন–শিষ্যদের কাছে দ্রোণাচার্য আগে সেই পরীক্ষা দিয়েছেন–কৃপের মধ্য থেকে বালকদের ক্রীড়নক–গুলিকা তুলে এনে, নিজের আংটি ফেলে দিয়ে এবং তুলে এনে। এইভাবে তিনি তাঁর শিষ্যদের কাছে পরীক্ষা দিয়েছেন এবং তাদের বিশ্বাস উৎপাদন করেছেন। অনুরূপভাবে শিষ্যদেরও দায় থেকে যায় গুরুর বিশ্বাস উৎপাদন করার। দ্রোণাচার্য সবাইকে একসঙ্গে ডেকে তার অভিলাষ জানিয়েছেন। কিন্তু কেউ তার বাসনাপূরণ করতে সাহসী হয়নি। সকলে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল–তচ্যুত্ব কৌরবেয়াস্তে তৃষ্ণীমাসন্ বিশাম্পতে। কিন্তু একা অর্জুন সমস্ত নিস্তব্ধতা ভেঙে নির্বিচারে গুরুকে জানিয়েছেন–আমি পারব, আপনি যা চাইবেন, তাই আমি দেব।
দ্রোণাচার্য বড় খুশি হয়েছেন। খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরেছেন অর্জুনকে, বারবার তার মস্তক আঘ্রাণ করেছেন সস্নেহে, আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন পূরণের আশায় আনন্দাশ্রু মোচন করেছেন–প্রীতিপূর্বং পরিজ্য প্ররুরোদ মুদা তদা। প্রথমেই এই যথার্থ শিষ্যের সঙ্গে আত্মবন্ধন বাড়ানোর জন্য দ্রোণাচার্য তাঁর ছেলে অশ্বত্থামাকে ডেকে এনে অর্জুনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন–এই অর্জুনকে তুমি তোমার সখা বলে জানবে, বৎস। এই সুযোগে তোমাকে একটা ভাল বন্ধু দিলাম, মনে রেখো–সখায়ং বিদ্ধি তে পার্থং ময়া দত্তঃ প্রগৃহ্যতাম।
প্রাচীন সামাজিক আচারে গুরু যদি নিজের পুত্রটিকে শিষ্যের সখা বলেও চিহ্নিত করেন, তবু তার সামাজিক মূল্য ছিল অন্যরকম। গুরুপুত্রেরা সকলেই গুরুবৎ মান্য ছিলেন। বয়সে ছোট হলেও তাদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে হত। আত্মসমর্পণের এও এক ধারা। অর্জুন সেই প্রথম বয়সেই এতটা পরিণত যে, দ্রোণাচার্যের উচ্চারিত সখা শব্দটির সম্মান রেখেও নিজের আচারটুকুও ঠিক ঠিক পালন করলেন। অর্জুন প্রথমে সম-বয়সের চেতনায় আলিঙ্গন করলেন গুরুপুত্র অশ্বত্থামাকে। তারপরেই বললেন–আজ থেকে আমি তোমার অধীন হলাম, ভাই। কেন না শাস্ত্রের নিয়মই তাই–পরবানস্মি ধর্মতঃ। আজ থেকে আমি শুধু দ্রোণাচার্যেরই শিষ্য নই তোমারও শিষ্য। কথাটা বলেই অর্জুন সেকালের সামাজিক সংস্কার অনুযায়ী ব্রাহ্মণ গুরুপুত্রের চরণ-বন্দনা করলেন পায়ে হাত দিয়ে–ইত্মা তু তদা পার্থঃ পাদৌ জগ্রাহ পাণ্ডবঃ।
দ্রোণাচার্যের অস্ত্র-পাঠশালা আরম্ভ হয়ে গেল পুরো দমে। এখন আর তার কোনও অভাব নেই। অর্থাভাব, খাদ্যাভাব, এমনকি প্রতিপত্তিরও অভাব নেই কোনও। কুরুবাড়ির রাজকুমারেরা তাঁর শিষ্য। তিনি রাজগুরু। অর্থাভাব নেই বলেই তার পূর্ববর্তী লোভও এখন অনেক প্রশমিত। কিন্তু এখনও তিনি শুধু পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের সেই অপমানটুকু মনে রেখে দিয়েছেন মর্যাদার শেষ সোপান হিসেবে।
উপযুক্ত দিন দেখে দ্রোণাচার্য সমস্ত কুমারদের হাতে অস্ত্র তুলে দিলেন। শিক্ষা আরম্ভ হল। অস্ত্রগুরু হিসেবে দ্রোণাচায়ের হাত এতটাই ভাল ছিল যে, তাঁর বিদ্যাবত্তা এবং শিক্ষাদানের শৈলী চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। খবর পেয়ে যাদব-রাজ্য শূরসেন–মথুরা থেকে বৃষ্ণি-অন্ধককুলের বালকেরা এবং আরও অন্যান্য জায়গা থেকেও শিক্ষাকাম বালকেরা দ্রোণাচার্যের শিক্ষাশ্রমে এসে শিক্ষা আরম্ভ করল। দ্রোণাচার্যের কাছে শিক্ষা নিতে আরম্ভ করলেন অধিরথি কর্ণ। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের সখা-সুহৃৎ অধিরথের বাড়িতেই মানুষ হচ্ছিলেন এবং কুরুবাড়িতে দ্রোণাচার্যের পাঠশালা খুলেছে দেখে তারও সেখানে যোগ দিতে দেরি হল না। অর্জুন যেহেতু প্রথম থেকেই দ্রোণাচার্যের সামান্য পক্ষপাত লাভ করেছিলেন, অতএব কর্ণ সেটা সহ্য করতে পারলেন না। অর্জুনের সঙ্গে তাঁর প্রতিযোগিতার আরম্ভ এইখান থেকেই–স্পর্ধমানস্তু পার্থেন–এবং এই সূত্রেই কুমার দুর্যোধনের সঙ্গে তার প্রথম বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
