ভাগবত পুরাণের আরও একটা সংবাদ এই প্রসঙ্গে আমাদের দরকার।
ভাগবত বলেছে– দেবতাদের কথা বলি যেমন মেনে নিলেন, তেমনই মেনে নিলেন অন্য দৈত্য-দানবেরাও শম্বর, অরিষ্টনেমি ইত্যাদি দৈত্য নায়কেরাও যাঁরা সকলেই ত্রিপুরাবাসী শম্বরো’ বিষ্টনেমিশ্চ যে চ ত্রিপুরবাসিনঃ। এই ত্রিপুর’ নামের এই জায়গাটাকে আমাদের খুব নিবিষ্ট হয়ে মনে রাখতে হবে। আর সেখানকার অধিবাসী দৈত্যরাজ বলির সাঙ্গোপাঙ্গ অসুর পার্ষদদেরও মনে রাখতে হবে, কারণ একটু পরেই আমরা এই ত্রিপুরের কথায় আসব।
ওদিকে সমুদ্র মন্থনের জোগাড় যন্ত্র আরম্ভ হয়ে গেল। সোজা কথা তো নয়। সমুদ্র মন্থনের মন্থন দণ্ড নিবাচিত হল মন্দর পর্বত। সে পর্বতকে সমূলে উপড়ে নিয়ে আসা হল সমুদ্রের ওপর। নাগরাজ বাসুকি নাগদের পক্ষ থেকে দেব-দানব দুই দলেরই উপকারে শামিল হলেন। তিনি হলেন মন্থন রঞ্জু। স্বয়ং বিষ্ণু কর্ম-রূপ ধারণ করে স্থির কঠিন পৃষ্ঠের অবলম্বন। দিলেন সমুদ্রের তলায়, যাতে মন্দর পর্বতের মন্থন দণ্ডটি স্থান-ভ্রষ্ট না হয়। দেবতারা বিষ্ণুকে নিয়ে, আর দানবেরা বলি রাজাকে নিয়ে সদলবলে এসে পৌঁছলেন ক্ষীর সাগরের তীরে।
০১০. সমুদ্র মন্থনের প্রস্তাব
১০.
সেই যখন ভগবান বিষ্ণু সমুদ্র মন্থনের প্রস্তাব নিয়ে দেবতাদের বললেন, দৈত্যরাজ বলির কাছে যেতে, তখন তাঁদের তিনি বলেছিলেন, দৈত্য-দানবেরা যা চায় তাই মেনে নিও যুয়ং তদনুমোদধ্বং যদিচ্ছত্যসুরাঃ সুরাঃ। সমুদ্র থেকে মহামূল্য বস্তু কিছু উঠলে, তা নিয়ে যেন ‘এটা চাই সেটা চাই’ বলে লোভ কোরো না। অথবা জিনিসটা না পেলে ক্রোধবশে কিছু করে বোস না। দেবতারা বিষ্ণুর পরামর্শ শুনেছিলেন। দেব-দানব সকলেই যখন সমুদ্র মন্থনে উদযুক্ত হলেন, তখন স্বয়ং বিষ্ণু, দেবতাদের নিজ বুদ্ধি খাটাবার কোনও সুযোগ না দিয়ে কারণ বুদ্ধি খাটালে হয়তো দেবতারা বোকামিই করতেন–অতএব সেই ভয়েই বিষ্ণু নিজে এসে প্রথমে নাগরাজ বাসুকির মুখের দিকটা ধরলেন। যদিও মহাভারত কিংবা মৎস্যপুরাণের মতে ইনি নাগরাজ বাসুকি নন, ইনি অনন্ত বা শেষ নাগ। ইনি অনন্তই হোন অথবা বাসুকি, বিষ্ণু তার মুখের দিকটা ধরতেই তাকে অনুসরণ করে দেবতারাও সবাই বিষ্ণুর পিছনে দাঁড়িয়ে গেলেন।
বিষ্ণুর বুদ্ধিটা ছিল সেই অভিজ্ঞা জননীটির মতো। জননীর দুই বালক পুত্র পিঠোপিঠি ভাই। তারা মাছের টুকরো বড় না ছোট তাই নিয়ে প্রতিদিন ঝগড়া করে। ছোট জন প্রতিদিন জেদের বশে বড় টুকরোটি চায় এবং পুরো খেতে পারে না, শেষ পর্যন্ত ফেলে দেয়। অথচ বড় জনের পাতে বড় টুকরোটি দেখলেই ক্ষোভে অভিমানে সে কেঁদেকেটে একসা করে এবং অবশ্যই ক্রন্দনের অস্ত্রে বড় টুকরোটি ছিনিয়ে নিতে সফল হয়। অভিজ্ঞা জননী শেষে ছোট মাছটাই প্রথমে দিতে আরম্ভ করলেন বড় ছেলের পাতে। ছোট জন নিজস্ব ধারণায় আগের মতোই দাদার থালা থেকে মাছ-ভাজা ছিনিয়ে নিত এবং জননী আপন অভীষ্ট সিদ্ধ হওয়ায় বড় ছেলেকে বলতেন, দে বাবা দিয়ে দে। তুই না বড়। ছোট ভাই হয় না? ওই না হয় বড় টুকরোটা খাক। ছোটজন ছোট টুকরো বড় ভেবে পরমানন্দে মাছ ভাজা খায়। তিনজনেই আপন আপন নিয়মে খুশি হয়ে থাকলেন।
বিষ্ণুর ব্যাপারটাও প্রায় এইরকম। যেই না তিনি বাসুকি নাগের মুখের দিকটা গিয়ে ধরলেন অমনি দানব রাজা বলি সপার্ষদ এসে বিষ্ণুকে বললেন, আমরা কি এতই হেয়? অত্যন্ত অমঙ্গলের চিহ্ন, সাপের এই পুচ্ছদেশ আমরা ধরব কেন, আমরা কি এতই ফেলনা? দেখুন, নিত্য বেদপাঠ কি যাগযজ্ঞ আমরা সেগুলো যথেষ্ট করি। তাছাড়া কতবড় বংশে আমাদের জন্ম। স্বাধ্যায়–শ্রুত সম্পন্নাঃ প্রখাতা জন্মকৰ্মভিঃ। আমরা কি লেজের দিকটা ধরতে পারি, না সেটা আমাদের মানায়? বিষ্ণু সঙ্গে সঙ্গে মুচকি হেসে দেবতাদের পেছনে নিয়ে বাসুকির পুচ্ছভাগ স্পর্শ করে দাঁড়ালেন স্বয়মান বিসৃজ্যাগ্রং পুচ্ছং জগ্রাহ সামরঃ।
স্থান বিভাগ অর্থাৎ কে কোনদিকে দাঁড়াবেন ঠিক ঠাক হয়ে গেল। দেবতা এবং দানব দুই পক্ষই আপন আপন নেতাদের জয়ঘোষ উচ্চারণ করে বাসুকির রঞ্জু দিয়ে মন্দর পর্বতকে ঘোরাতে লাগলেন। অসুরদের দেহে শক্তি অনেক বেশি; স্বয়ং বলিরাজ বাঁ হাতে নাগরাজের মাথাটি ধরলেন আর ডান হাতে টান দিলেন তাঁর অগ্ৰশরীরে। বিষ-ভীত দেবতারা টান দিলেন পুচ্ছ দেশে। সমুদ্র মন্থন আরম্ভ হল।
ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার হল–মহাভারত থেকে অধিকাংশ পুরাণ–সর্বত্রই দেখা যাবে যে, ভগবান বিষ্ণু সমস্ত দেবতাকে বলেছেন- তোমরা সমস্ত রকমের ওষধি আর লতা সমুদ্রের মধ্যে ফেলল, তারপর সমুদ্র মন্থন করো। দেব-দানবেরা সকলেই অতঃপর বহুতর বৃক্ষ-লতা ওষধি সমুদ্রে ফেলেছিলেন, তাছাড়া মন্দর পর্বতের গাছ গাছড়া, শিকড়ও প্রচুর পড়েছিল সমুদ্রে। সমুদ্র মন্থনের উপাখ্যান যেভাবে আরম্ভ এবং শেষ হয়েছে, তার সঙ্গে এই গাছ-গাছড়া শিকড় বাকড়ের সম্পর্ক কী, সে কথা পরে আসবে, আপাতত শুধু এই ঘটনাটির উল্লেখ করে রাখলাম।
সমুদ্র মন্থন করে কখন কী উঠল, কোনটা প্রথম পাওয়া গেল, তা নিয়ে মহাভারত পুরাণে, পরাণে পুরাণে নানা ভেদ বিকল্প আছে। মহাভারত বলেছে– নানা বৃক্ষের নির্যাস আর মথিত লতার রসের সঙ্গে কিছু সোনা মিশে যাওয়ায় যে তরল মিশ্রণ তৈরি হল, তাতে নাকি লবণ সমুদ্র ক্ষীর সমুদ্রে পরিণত হল। সেই দুগ্ধ–সাগর থেকে প্রথম পাওয়া গেল ঘৃত যা মানুষের আয়ুবর্ধক এক অতি উৎকৃষ্ট বস্তু বলে আমাদের মধ্যে পরিচিত রোত্তমৈ-বিমিশ্রঞ্চ ততঃ ক্ষীরাদভূদ ঘৃত। টীকাকার নীলকণ্ঠ টিপ্পনি কেটে বলেছেন– এতে আজগুবি ভাবার কিছু নেই। বাপু। আমাদের চিরকালের দেখা গরুগুলি কখনও এমনি জলও খায়। আবার নুন-জলও খায়। গরু সেই জলের সঙ্গে ঘাস পাতা আর অন্যান্য বর্জ্য বস্তু ভক্ষণ করেও উত্তম দুগ্ধই প্রসব করে, তাহলে বৃক্ষ লতার সমন্বয়ে লবণোদধি মন্থন করেই বা ঘি উঠবে না কেন- যথা ক্ষার অক্ষারং বা জলং গবি তৃণাদিরসং প্রাপ্য ক্ষীরং ভবতি, তদিত্যৰ্থঃ। আমাদের হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ মহাশয় কিন্তু আরও একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, একে অলীক কল্পনা বলার কিছু নেইনালীকম্ ইদং সম্ভারয়িতুং শক্যতে। আসলে সিদ্ধান্তবাগীশ তার জীবকালেই ডালডা কিংবা ভেষজ বনস্পতি ঘৃতের আগমনী শুনতে পেয়েছেন। অতএব তার বক্তব্য–কেন বাবা আজকে ভেষজ বিজ্ঞানীরাও তত তৃণ বনস্পতি থেকে ঘি বানাচ্ছেন, অতএব এটাই বা অলীক হবে কেন- বৈজ্ঞানিকাশ্চ তৃণা ঘৃতমুৎপাদয়ন্তীতি নালীকমিদং সম্ভাবয়িং শক্যতে।
