দ্রোণাচার্যের মুখ থেকে তাঁর ইচ্ছা শোনা মাত্রই মহামতি ভীষ্ম তাকে কুরুরাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ প্রশ্রয় দিয়ে বলেছেন–আপনি আপাতত নিশ্চিন্ত আশ্রয় লাভ করতে পারেন এই কুরুরাষ্ট্রে। আপনার ধনুকের গুণখানি খুলে রাখুন আপাতত। কুরুবালকদের উপযুক্ত অস্ত্রশিক্ষার ভার গ্রহণ করুন আপনি–অপজং ক্রিয়তাং চাপং সাধ্বস্ত্রং প্রতিপাদয়। এখানে আপনার সম্মানের কোনও অভাব হবে না এবং কুরুরাষ্ট্রর যা বিত্ত আছে, ধন আছে, যে ভূমি আছে, সব এখন থেকে আপনার–কুরূণামস্তি যবিত্তং রাজ্যঞ্চেদং সরাষ্ট্রক। বলতে গেলে আজ থেকে আপনিই এ দেশের রাজা হলেন, কুরু-কুমাররাও সব আপনার ত্বমেব পরমমা রাজা সর্বে চ কুরবস্তব।
ভীষ্মের মুখে দানের যে আড়ম্বর শোনা গেল, তাতে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, ভীষ্ম যেন সমগ্র কুরু–রাজ্যটাই দিয়ে দিলেন দ্রোণাচার্যকে এবং তিনিই যেন রাজা হলেন কুরুরাষ্ট্রের। আসলে এই কথাগুলির একটা ব্যবহারিক তাৎপর্য আছে। মহাভারতের মধ্যে বহু জায়গায় দেখা যাবে–সম্মানিত ব্রাহ্মণ মহর্ষিরা রাজগৃহে আগমন করলেই রাজা তাঁর রাজ্যটি তার পায়ে নিবেদন করছেন–রাজ্যং চাস্মৈ নবেদয়ৎ। একবার নয়, দুবার নয়, এটা একটা ফেনোমেনন। সর্বত্র রাজারা বিনীতভাবে আত্মনিবেদন করার সঙ্গে সঙ্গেই নিজের রাজ্য নিবেদন করছেন ব্রাহ্মণদের কাছে। আসলে সেকালের সামাজিক স্থিতিতে ব্রাহ্মণ-মহর্ষিদের সম্পূর্ণ অধিকার মেনে নেবার মধ্যেই এই রীতির তাৎপর্য। এর মানে এই নয় যে, সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্রাহ্মণ মহর্ষি রাজা হয়ে বসতেন আত্মনিবেদিত রাজার রাজ্যে। এটা রীতিমাত্র–রাজা সবটাই দিতেন, ব্রাহ্মণ নিতেন না। ঠাকুর সোজাসুজি ভক্তের দেওয়া অন্নপান খেয়ে ফেলেন না বলেই হয়তো এত দেওয়ার ধুম। তবে এই দানাদানের মধ্যে একটাই ইঙ্গিত আছে, তা হল–এ রাজ্যে আপনি যখন পদধূলি দিয়েছেন, তো আপনার উপযুক্ত ভোগ-সুখের কোনও অসুবিধে হবে না। খাওয়া-দাওয়া, পরিধান থেকে আরম্ভ করে যা প্রয়োজন সব পাওয়া যাবে। ভীষ্মের বক্তব্য–এ রাজ্য আপনার, আপনিই রাজা–মানে এ রাজ্যের সমস্ত ভোগসুখ আপনার ইচ্ছামাত্রেই পাবেন। টীকাকার নীলকণ্ঠের ভাষায়–ত্বদূভোগ্যং মম রাজ্যমিতি সঙ্কেতম্।
একশো ভাই কৌরব আর পাঁচ ভাই পাণ্ডব নাতিদের এক জায়গায় জড় করে ভীষ্ম একটু বাদেই এলেন দ্রোণাচার্যের কাছে। থলিতে করে স্বর্ণমুদ্রা আর বিবিধ রত্ন এনে নজরানা দিলেন দ্রোণাচার্যের পায়ে–পৌত্রানাদায় তা সর্বান বস্তুনি বিবিধানি চ। ভীষ্ম এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে এত তাড়াতাড়ি তাকে গুরুবরণ করবেন–এ কথা দ্রোণাচার্য নিজেও ভাবেননি। যে কৃপাচার্য এতদিন ধরে এঁদের অস্ত্র-শিক্ষা দিচ্ছেন, সেই কৃপাচার্য তার শ্যালক। তারই বাড়িতে পুত্র–পরিবার নিয়ে তিনি এসে উঠেছেন। এখন তার মাথার ওপর বসে তার চাকরিটি খেয়ে নেবেন–দ্রোণাচার্যের একটু সঙ্কোচ হল। ভীষ্মকে তিনি বললেন–কৃপাচার্য আগেই আপনার নাতিদের অস্ত্রগুরু হিসাবে বৃত হয়েছেন। তিনি শাস্ত্রজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তার অজ্ঞাতসারে কুমারদের যদি আমার হাতে তুলে দেন তবে কৃপাচার্য অসন্তুষ্ট হবেন বলেই মনে হয়–ময়ি তিষ্ঠতি চেদ বিপজা বৈমনস্যং গমিষ্যতি। কাজেই আমি যা বলছিলাম–কিছু টাকা-পয়সা আমার দরকার ছিল, সেগুলো নিয়ে আমি আবার শান্তিতে আশ্রয়ে ফিরে যাই।
ভীষ্ম এতদিনের অভিজ্ঞ ব্যক্তি। সেকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হিসেবে তিনি এও জানেন যে, কার হাতে ছেলেদের দিলে সবচেয়ে ভাল শিক্ষা পাবে। ভীষ্ম তাই সহাস্যে বললেন–আরে কৃপাচার্য তো আমাদের আছেনই। তাকে আমরা যে সম্মান এতকাল দিয়ে আসছি তাই দেব। তাকে যেমন পিতার আমল থেকে ভরণ করে আসছি, তেমনই ভরণ–পোষণ করব–কৃপস্তিষ্ঠতু পূজ্যশ্চ ভর্তব্যশ্চ ময়া সদা–তিনি তো আছেনই। কিন্তু আপনিও থাকুন এবং আপনাকেই এই কুমারদের অস্ত্রশিক্ষার ভার নিতে হবে। কেন না আমার মতে আপনিই এত ছেলেদের উপযুক্ত শিক্ষক হতে পারেন–ত্বং গুরু র্ভব পৌত্রাণা আচার্যত্ত্ব মতো মম।
ভীষ্মের উপরোধ দ্রোণাচার্য আর এড়াতে পারলেন না এবং এড়ানোর কোনও ইচ্ছাও তার। ছিল না। এতটা বয়স পর্যন্ত পুত্র-পরিবার নিয়ে অনেক লড়াই করেছেন দারিদ্রের সঙ্গে। আজ যখন হস্তিনাপুরের রাজ-সম্মান হাতের মুঠোয় এসে পৌঁছেছে, তখন সেটাকে ছেড়ে দেবার বিলাসিতা তিনি দেখাতে পারেন না। দ্রোণ পাণ্ডব-কৌরবদের অস্ত্রগুরু হবার দায়িত্ব স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকগুলি শিষ্যের সঙ্গে প্রথম অর্থোপার্জনও সম্পন্ন হল। দ্রোণকে কুরু-রাজপ্রাসাদের একান্তে একটি সুন্দর বাড়ি দেওয়া হল। সে বাড়িতে রইল গোলা ভরা ধান আর দৈনন্দিন খরচ চালানোর মতো অর্থসম্পদ–গৃহঞ্চ সুপরিচ্ছন্নং ধনধান্য–সমাকুলম্। দ্রোণ পুত্র-পরিবার নিয়ে নতুন বাড়িতে আস্তানা গাড়লেন। পরদিনই কৌরব-পাণ্ডবরা সব ভাই একত্রে মিলে দ্রোণাচার্যের কাছে উপস্থিত হলেন অস্ত্রশিক্ষার জন্য।
দ্রোণাচার্য সানন্দে শিষ্যদের গ্রহণ করলেন এবং তাদের সকলকে বললেন–তোমাদের সঙ্গে একটা গোপন কথা আছে আমার। সমস্ত কৌরব-পাণ্ডব ভাইদের একটা নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে দ্রোণাচার্য বললেন–ছেলেরা সব! আমার একটা কথা তোমাদের রাখতে হবে। আমি তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা দেব নিশ্চয়। কিন্তু আমার মনে একটা অভিলাষ আছে–কাৰ্য্যং মে কাঙ্ক্ষিতং কিঞ্চি হৃদি সম্পরিবর্ততে। তোমাদের অস্ত্রশিক্ষা সম্পূর্ণ হয়ে যাবার পর আমার সেই অভীষ্ট কাজটুকু তোমাদের করে দিতে হবে।
