দ্রোণাচার্য দুদিক থেকে তার সুযোগের কথা চিন্তা করলেন। এক, বিজিত ক্ষত্রিয় রাজাদের কাছ থেকে পাওয়া পরশুরামের অগাধ সম্পত্তির কিছু অংশ তো পাওয়া যেতেই পারে। দুই, পরশুরামের মতো মহাবীর সেকালের দিনে দ্বিতীয় ছিল না। তার কাছে গেলে অসাধারণ কিছু অস্ত্রের সন্ধান জানা যেতে পারে। কাজেই ধনলোভ অথবা মহার্ঘ অস্ত্রের লোভ তাকে তাড়িত করল পরশুরামের কাছে যেতে–স রামস্য ধনুর্বেদং… দিসন্তং বসু সর্বশঃ। মহেন্দ্র পর্বতে পরশুরামের আবাস। দ্রোণাচার্য সেখানে গিয়ে দেখা করলেন পরশুরামের সঙ্গে। মহর্ষি ভরদ্বাজের বংশে জন্মের গৌরব থেকে আরম্ভ করে নিজের কুল–শীল সব তিনি জানালেন পরশুরামকে।
পরশুরাম তখন জগৎ-সংসারে অনেকটাই নির্বিঘ্ন, ব্রাহ্মণদের দান-ধ্যান করে তিনি তখন বনে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন–ততস্তং সর্বমুৎসৃজ্য বনং জিগমিং তদা। অর্থাৎ দ্রোণাচার্যের কাছে পরশুরামের ধনবিতরণের খবর পৌঁছেছে দেরিতে। কিন্তু দেরিতে হলেও দ্রোণাচার্য পরশুরামের কাছে এসে তার মনের ভাব লুকোননি। বলেছেন–মহাশয়! আমি মহর্ষি আঙ্গিরস ভরদ্বাজের পুত্র। আমি ধনলাভের আশায় আপনার কাছে এসেছি–আগতং বিত্তকামং মাং বিদ্ধি দ্রোণং দ্বিজোত্তম। পরশুরাম একটু লজ্জায়ই পড়লেন। তার ধন-বিতরণ প্রায় শেষ। দ্রোণ ভাবলেন, তবু যদি কিছু পাওয়া যায়। শেষ মানে কী একেবারেই শেষ, এত বড়ো একজন মানুষ বলে কথা। তাই সামান্য একটু কথা ঘুরিয়ে তিনি বললেন–আপনি সকলকে ধন-রত্ন বিতরণ করছেন। আমি সেইজন্যই এসেছি। আমার টাকা-পয়সা দরকার, অনেক টাকা পয়সা চাই আমি–অহং ধন অনন্তং প্রার্থয়ে বিপুল-ব্রত।
পরশুরাম এমন অকপটোক্তি শুনে ভীষণ বিব্রত হলেন। বললেন–সোনা-রুপোর তৈরি জিনিস বা আদত সোনা-রুপো আমার কাছে যা ছিল, তা সবই তো আমি ব্রাহ্মণদের কাছে বিলিয়ে দিয়েছি–হিরণ্যং মম যচ্চান্যবসু কিঞ্চিদিহ স্থিত। এই গ্রাম, নগর ভূমির মতো স্থাবর সম্পত্তি যা ছিল তার সবটাই দিয়ে দিয়েছি মহর্ষি কশ্যপকে। আর তো বাকি কিছু নেই। থাকবার মধ্যে আছে এই শরীরটা আর কিছু মহামূল্য অস্ত্র। তা এর মধ্যে যেটা তুমি চাও, বলল। আমি দেব–অস্ত্রাণি বা শরীরং বা ব্রহ্মন্ শস্ত্রাণি বা পুনঃ।
দ্রোণ দেখলেন–পরশুরামের শুষ্ক-শরীর দিয়ে আর কী হবে! বরঞ্চ তার চেয়ে দুষ্প্রাপ্য মহার্ঘ অস্ত্রশস্ত্রগুলির মূল্য অনেক বেশি। দ্রোণ বললেন–তাহলে ওই অস্ত্রগুলি সবটাই আমাকে দিন–অস্ত্রাণি যে সমগ্রাণি সসংহারাণি ভার্গব। অবশ্য ওই সব অস্ত্রের ক্ষেপণোপায় এবং অস্ত্র–সম্বরণের উপায়ও আমাকে শিখিয়ে দিতে হবে। রাম জামদগ্ন্য রাজি হলেন। নিজের ক্ষত্রিয়ঘাতী অস্ত্রগুলি দ্রোণের হাতে তুলে দিয়ে সেগুলির ক্ষেপণ-সম্বরণের উপায়ও তিনি সযত্নে শিখিয়ে দিলেন দ্রোণকে।
পরমেপ্সিত ধন-সম্পত্তি না পেলেও পরশুরামের তৃণীর থেকে যে অসাধারণ অস্ত্রগুলি তিনি লাভ করলেন, তারও মূল্য কিছু কম নয়। সেগুলি তাকে ধনস্ফীত না করলেও ধনুর্বেদী হিসেবে তার অভিমান অনেকটাই বাড়িয়ে দিল। হয়তো এই অভিমান নিয়েই তিনি পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কাছে গিয়েছিলেন। লক্ষণীয়, পরশুরামের কাছে যখন ধন-সম্পত্তি কিছু মিলল না, তখন সেই উদ্দেশ্য সার্থক করার জন্যই তিনি পাঞ্চালে গিয়েছিলেন। ভাবটা এই–পরশুরামের অস্ত্রসম্ভার এখন করতলগত, এবারে দরকার এক খণ্ড রাজ্য। অতএব পরশুরামের অস্ত্র নিয়েই তিনি রওনা হলেন দ্রুপদের কাছে–পূর্বপ্রতিজ্ঞাত রাজ্যের আশায়–প্রতিগৃহ্য তু তৎ সর্বং…জগাম দ্রুপদং প্রতি।
আমরা জানি দ্রুপদের কাছে কী ব্যবহার পেয়েছিলেন দ্রোণাচার্য। দ্রুপদ তার পূর্ব প্রতিজ্ঞা স্বীকার করলেন না বলেই তার প্রতিহিংসায় দ্রোণাচার্য এখন হস্তিনাপুরে উপস্থিত। টাকা-পয়সা তার চাই-ই, চাই ভূ-সম্পত্তি এবং ক্ষমতা। হস্তিনাপুরে এসে সঙ্গে সঙ্গেই তার ভূ-সম্পত্তি লাভ হল না বটে, কিন্তু পাঞ্চাল-বিরোধী রাজগোষ্ঠীতে নাম লিখিয়ে তিনি যে প্রথম সুবিধেটি পেলেন, তা হল–প্রয়োজনীয় অর্থ এবং ক্ষমতা। হয়তো পাঞ্চাল-বিরোধী বলেই ভীষ্মের সঙ্গে সার্বিক পরিচয়ের প্রথম কল্পে দ্রোণাচার্য বলেছিলেন–আমি আমার প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য উপযুক্ত শিষ্যের খোঁজে হস্তিনাপুরে এসেছি–অভ্যাগচ্ছং কুরূ ভীষ্ম শিষ্যৈরথী গুণান্বিতৈঃ। একই সঙ্গে আমি হয়তো আপনার অভিলাষও পূরণ করতে পারি। আর সত্যি এই হস্তিনাপুর জায়গাটাও আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। অতএব বলুন–কী করতে পারি আপনার জন্য–ইদং নাগপুরং রম্যং ব্রুহি কিং করবাণি তে।
অর্থাৎ দ্রোণাচার্য খুব ভালই জানেন যে, ভীষ্ম তার নাতিদের জন্য একজন উপযুক্ত অস্ত্রগুরু খুঁজে যাচ্ছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে দ্রোণের কাছে তার জীবনের সমস্ত কাহিনী এবং শেষমেশ দ্রুপদের প্রতি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কথা শুনেও যে ভীষ্ম তাকে বরণ করে নিলেন, তার কারণ একান্তই রাজনৈতিক এবং সেটা পাঞ্চাল-বিরোধের একাত্মতা। নইলে একটি পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে ভীষ্ম তার সমমানের একটি বিরাট ব্যক্তিত্বকে এইভাবে প্রশ্রয় দিতেন না। অবশ্য কৌরব-পাণ্ডবদের অস্ত্রশিক্ষার কারণটাও এখানে খুব কম নয়। ভীষ্মের সেই স্বার্থের সঙ্গে অন্য এক রাজনৈতিক স্বার্থও মিলে গেল। অন্যদিকে দ্রোণাচার্যের হাতে বিপুল অস্ত্র–সম্ভার থাকলেও এবং তিনি নিজে সেই অস্ত্রের যোজনা জানলেও তার হাতে কোনও সৈন্যবাহিনী ছিল না। কৌরব-পাণ্ডবদের সম্ভাবনাময় সমস্ত ছেলেগুলিকে তিনি যদি পান, তবে ধীরে ধীরে আপন লক্ষ্যে পৌঁছতে দ্রোণাচার্যের দেরি হবে না, সেটা তিনি আগেই বুঝেছিলেন।
