দেখুন, দ্রুপদ পাঞ্চাল চার-চক্ষু রাজা মানুষ। দ্রোণাচার্যের হাল-হকিকৎ তিনি কিছুই জানতেন না, তা নয়। তাছাড়া সেই বাল্যবন্ধুত্বের সময় হৃদয়ের প্রসারতায় যে কথা হয়েছে, এতকাল পরে তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই, কিছু নেই, অথচ হঠাৎ করে সেই বাল্যবন্ধু এসে বাল্যপ্রণয় জানিয়ে বলল– বন্ধু। তুমি আমাকে রাজ্য দেবে বলেছিলে যে, এখন দাও। আপনিই ভাবুন– বহুদিনের সম্পর্কহীন এক প্রচীন বন্ধু যদি এসে সিংহাসনে থিতু হয়ে বসা এক রাজাকে রাজ্যখণ্ড দিতে বলে, তাহলে তার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? তাছাড়া যে মানুষ তৎকালীন দিনে আপন বংশগৌরব উপেক্ষা করে নিজের অযাচিত-বৃত্তি পরিত্যাগ করে হঠাৎই একখণ্ড রাজ্য পাবার জন্য লোভী হয়ে পড়ে, যে মানুষ বন্ধু হলেও অপর বন্ধুর মনে খুব সুখকর প্রতিক্রিয়া হয় না। বাল্য বয়সেও যখন দ্রোণের সঙ্গে দ্রুপদের দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, তখনও এই লোভ যে কিছুই প্রকাশ হয়নি, তা মনে হয় না। নিজের অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্যই হোক, সামাজিক ব্রাহ্মণদের দ্বারা একঘরে হয়ে যাবার ফলেই হোক, দ্রোণ বস্তুতই কিছু লোভী ছিলেন এবং সেই লোভ এতটাই প্রকট ছিল যে দ্রুপদ অন্তত এই বয়সে আর নতুন করে কোনও আশ্বাস দিয়ে নিজের ভার বাড়াতে চাননি।
দ্রুপদ বললেন– দেখ ভাই। বন্ধুত্ব জিনিসটা অজর অমর নয় কিছু, বিদীর্ণ সময় এই বন্ধুত্ব নষ্ট করে দেয়, কখনও বা অহেতুক ক্রোধন সখ্য অজরং লোকে বিদ্যতে কস্যচিৎ চিৎ। আমি স্বীকার করছি তোমার সঙ্গে বাল্যকালে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল, কিন্তু অন্তর্বর্তী কাল সে বন্ধুত্ব গ্রাস করেছে। এমনিতেও বোধহয় বাল্যের এই সখিত্ব পবয়সের তর্কযুক্তিজর্জর মনোভূমিতে কাজ করে না কোনও। দ্রুপদ বললেন–এমনিতেও কি বড়লোকের সঙ্গে গরিবের বন্ধুত্ব হয় অথবা বিদ্বান ব্যক্তির সঙ্গে মূখের, অথবা যুদ্ধবীরের সঙ্গে নপুংসকের ন হ্যনাট্যঃ সখাঢ্যস্য নাবিদ্বান্ বিদুষঃ সখা? হয় না। একজন শ্রীহীন মর্যাদাহীন ব্যক্তির সঙ্গে একজন রাজার কীভাবে বন্ধুত্ব হতে পারে? সে যাই হোক, তুমি আমাকে প্রাচীন বন্ধুর গৌরব দান করে কী চাইতে এসেছ? আমি যে তোমাকে কখনও রাজ্যখণ্ড দেব বলে স্বীকার করেছি, সে কথা কিন্তু আমার কিছুই মনে পড়ছে না। তবে হ্যাঁ, তুমি বামুন মানুষ, তোমাকে আমি এক রাত্রির ভোজন সুখাদ্য নিশ্চয়ই দিতে পারি– একান্ত তে ব্রহ্ম কামং দাস্যামি ভোজনম্।
দ্রোণ মোটেই খুশি হলেন না। হবার কথাও নয়। নিজের দীন-হীন দশা আরম্ভ হবার সঙ্গে-সঙ্গেই তিনি দ্রুপদের কাছে আসেননি। ভেবেছিলেন–দ্রুপদ রাজা হলে নিশ্চয়ই তাকে একদিন স্মরণ করে ডেকে নিয়ে যাবেন। কিন্তু রাজা হবার প্রখর বাস্তব বাল্য-কৈশোরের কোমল স্মৃতিগুলি নষ্ট করে দিল দ্রুপদের। কিন্তু দ্রোণ যেহেতু এতকাল ধরে অর্থোপার্জনের বাস্তবতার মধ্যে যাননি, তাই শৈশবের স্মৃতিই তিনি সার্থক প্রতিজ্ঞা বলে ধরে রেখে দিলেন। পরে আস্তে আস্তে যখন তার অর্থনৈতিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠল, তখনও তিনি স্বাভিমানে কোনও পরাধীনতার বৃত্তি গ্রহণ করলেন না। অনেক আশা নিয়ে স্বাধীন একটি রাজ্যখণ্ড ভোগের ইচ্ছায় তিনি দ্রুপদের কাছে উপস্থিত হলেন এবং প্রত্যাখ্যাত হলেন।
দ্রুপদের অপমান দ্রোণ সইতে পারলেন না। তার সমস্ত কল্পনা ভেঙে গেল। এক বেলা খাওয়া তো দূরের কথা, সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্ত্রী-পুত্র সঙ্গে নিয়ে রাজসভা থেকে বেরিয়ে পড়লেন–এবমুক্ত ত্বহং তেন সদারঃ প্রস্থিতস্তদা। দ্রুপদের সামনেই তিনি প্রতিজ্ঞা করে গেলেন যে, ওই অপমানের তিনি উপযুক্ত প্রতিশোধ নেবেন। রাগে-দুঃখে জ্বলতে জ্বলতে দ্রোণ পাঞ্চাল নগর ছেড়ে হস্তিনাপুরের পথে রওনা দিলেন। একেবারে পাশের রাজ্য বলেই ভরতবংশীয়দের সঙ্গে পাঞ্চালের সুসম্পর্ক মোটেই ছিল না এবং একথা আমরা আগেই জানিয়েছি। পাঞ্চাল এবং ভরতবংশীয়রা পূর্ববর্তী একই বংশ থেকে জন্ম নিয়েছেন, কিন্তু কালে কালে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ চলেছে। কখনও তারা জিতেছেন, কখনও এঁরা, কিন্তু বিরোধটা ছিলই। এই মুহূর্তে যেটা লক্ষণীয়, সেটা হল– কৃপাচার্যকে অন্য জায়গা থেকে তুলে এনে হস্তিনাপুরে ঠাই দিয়েছিলেন শান্তনু। তিনি পাঞ্চালবিরোধী হিসেবেই চিহ্নিত। আবার দ্রোণাচার্যও পাঞ্চালদের চরম বিরুদ্ধতার প্রতিজ্ঞা নিয়েই হস্তিনাপুরে এলেন এবং হয়তো এই পাঞ্চালবিরোধী মনোভাবই হস্তিনাপুরে তার অবস্থিতি সুস্থির করবে।
.
৯৯.
পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কাছে দ্রোণ বেশ অপমানিত হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু নিজের সম্বন্ধে তিনি যতই সহনীয়তা দেখান, প্রাথমিকভাবে অর্থলোভই যে তাকে খুব তাড়িত করেছিল, সেটার ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। আরও একটা ঘটনা তাই প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল। মহর্ষি ভরদ্বাজ তখন স্বর্গত হয়েছেন। দ্রোণের বিবাহও তখন হয়ে গেছে, তার পুত্রও জন্মলাভ করেছেন। দ্রোণ তখন পিতার আশ্রমে থেকেই ধনুর্বেদ অভ্যাস করে যাচ্ছেন। এমনই একদিন তার কাছে খবর এসে পৌঁছল যে মহাত্মা পরশুরাম ব্রাহ্মণ-সজ্জনদের প্রচুর অর্থ দান করছেন।
পরশুরাম তখনকার দিনে ক্ষত্রিয়হন্তা মহাবীর হিসেবে পরিচিত। পৃথিবীকে বারংবার নিঃক্ষত্রিয় করার জন্য ঐতিহাসিকরা পরশুরামকে ক্ষত্রিয়বিদ্বেষী এক ব্রাহ্মণবীর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পণ্ডিতেরা বলেন–ভারতীয় ইতিহাসের পরম্পরায় একটা সময় এসেছিল, যখন ক্ষত্রিয় রাজারা ব্রাহ্মণদের অধিকার এবং সামাজিক প্রতিপত্তি মেনে নিতে অস্বীকার করেন। মহাবীর পরশুরাম তখন ব্রাহ্মণদের স্বার্থরক্ষায় এগিয়ে আসেন এবং বিরুদ্ধবাদী ক্ষত্রিয়দের শাস্তিদাতা হিসেবে চিহ্নিত হন। আমাদের ধারণা– পরশুরাম একটা ইনস্টিটিউশনের মতো। নইলে রামচন্দ্রের সময়ের পরশুরামের সঙ্গে মহাভারতের পরশুরামকে মেলানো যায় না। বংশ বংশ ধরে পরশুরামরা ক্ষত্রিয়বীরদের শিক্ষাদাতা ব্রাহ্মণবীর হিসেবে পরিচিত হন। এমনই এক পরশুরাম নিজের ব্রাহ্মণ্য এবং বৃদ্ধ বয়সের নিষ্কামতায় নিজের সম্পত্তি সমস্তই বিলিয়ে দিচ্ছিলেন ব্রাহ্মণদের। দ্রোণাচার্যের কাছেও এই খবর পৌঁছল।
