দূর থেকে এই করুণ দৃশ্য দ্রোণের চোখে পড়ল। দুঃখে, লজ্জায়, ঘৃণায় নিজেকে ধিক্কার দিতে লাগলেন তিনি। ভাবলেন– গৃহকর্তা হয়ে যে মানুষ পুত্র-পরিবার ভরণের জন্য সামান্য অর্থ উপায় করতে পারে না, ধিক্ তাকে দ্রোণং ধিগস্তু অধনিনং যো ধনং নাধিগচ্ছতি। পাড়ার ছোট্ট ছোট্ট ছেলেরা তার ছেলেকে যেভাবে অপমান করেছিল, তাতে দ্রোণের মাথাটাই খারাপ হয়ে যাবার যোগাড় হল। তিনি ভাবলেন– অর্থার্জন আমাকে করতেই হবে। তবে তাই বলে পরের সেবা করে ধনলাভ করব না। অর্থ উপার্জন করব নিজের ক্ষমতায় পরোপসেবাং পাপিষ্ঠাং ন কুৰ্যাং ধনলিপ্সয়া।
আমরা আগেই জানিয়েছি– ব্রাহ্মণের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও ক্ষত্রিয়োচিত অস্ত্রবিদ্যা শিখেছিলেন বলে সামাজিক ব্রাহ্মণরা দ্রোণকে রীতিমতো বর্জন করেছিলেন। দ্রোণ নিজেও সে কথা স্বীকার করেছেন যে, ব্রাহ্মণসমাজ তাকে সম্পূর্ণ ত্যাগ করেছিল এবং তিনি ক্ষত্রিয়ের বৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন বলে তাঁকে নিন্দাও সইতে হয়েছে যথেষ্ট অপি চাহং পুরা বিবৈর্জিত গহিতো ভূশ। পরিষ্কার বোঝা যায়– দ্রোণাচার্যের অবস্থা প্রায় না ঘরকা, না ঘাটকা। ব্রাহ্মণসমাজ তাকে বর্জন করেছে, অথচ ক্ষত্রিয়ের বিদ্যা শিখে তিনি অর্থোপার্জনও করতে পারছেন না। এখন পুত্রের এই করুণ অবস্থা দেখে দ্রোণ সিদ্ধান্ত নিলেন– অর্থোপার্জন তাকে করতেই হবে। তবে তিনি যে বেশ জুগুপ্সা দেখিয়ে মন্তব্য করলেন– আমি পরের সেবা করে ধন উপার্জন করব না–সেটা খুব কাজের কথা নয়। এটা মৌখিক আড়ম্বর মাত্র, ব্রাহ্মণ্য বীর্যের অকর্মণ্য দম্ভ মাত্র। এরপর তিনি যা সিদ্ধান্ত নিলেন অথবা এর পর তিনি যা করতে থাকবেন, তা পরের সেবা ছাড়া অন্য কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞাত হতে পারে, তা আমাদের জানা নেই।
দুঃখ এবং উদ্বেগের দিনে দ্রোণের মনে পড়ল পুরাতন বন্ধু পাঞ্চাল দ্রুপদের কথা। তিনি কথা দিয়েছিলেন যে, রাজ্যে অভিষিক্ত হলে বন্ধু দ্রোণও তাঁর রাজভোগে অংশীদার হবেন। তার ধন-সম্পত্তি এবং সুখের ভাগেও দ্রোণের অধিকার থাকবে। দ্রুপদ তাঁকে কথা দিয়েছিলেন। আজকে এই চরম দুর্ভাগ্যের দিনে দ্রোণ তাই তাঁর পত্নী কৃপীকে নিয়ে এবং পুত্র অশ্বত্থামার হাত ধরে পাঞ্চাল রাজ্যে দ্রুপদের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবলেন সদারঃ সৌমকিং গতঃ। পাঞ্চাল রাজ্যে উপস্থিত হয়ে দ্রোণ শুনলেন যে, দ্রুপদ রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন পূর্বাহ্নেই। দ্রুপদের রাজা হবার কথা শুনেই দ্রোণ ভাবলেন তার কাজ হয়ে গেছে– অভিষিক্তন্তু ত্বৈব কৃতার্থোস্মীতি চিন্তয়। অর্থাৎ দ্রুপদের কাছে গেলেই তিনি তার রাজ্য বা সম্পত্তির কিছু অংশ পাবেন।
দ্রোণ সপুত্র-পরিবারে দ্রুপদের ভবনে উপস্থিত হয়ে তার সঙ্গে দেখা করলেন। মনে তার কত আনন্দ– পুরানো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কত কীই না পাওয়া যাবে। দারিদ্র্যের চরম ক্লান্তি আর তিনি কুলিয়ে উঠতে পারছেন না বলেই তার পুরাতন আশাটাও বড় বেশি হয়ে উঠল। তিনি দ্রুপদকে সাগ্রহে জিজ্ঞাসা করলেন বন্ধুকে মনে আছে তো? আমি তোমার সেই শিক্ষাকালের বন্ধু ছিলাম, আমার নাম তোমার মনে আছে কি, আমার নাম দ্রোণ– সখায়ং বিদ্ধি মামিতি। পূর্বের বন্ধুত্ব-গৌরবে দ্রোণ প্রায় দ্রুপদকে আলিঙ্গন করবার জন্য হাত বাড়ালেন। কিন্তু দ্রুপদের দিক থেকে তেমন সাড়া মিলল না বলেই দ্রোণ একটু থতমত খেলেন যেন।
দ্রোণের কথা শুনে পাঞ্চাল দ্রুপদ এমন একটা ভাব করলেন যেন এক অপকৃষ্ট রোগীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। তার মুখে একটু তাচ্ছিল্যের হাসিও দেখা গেল– স তং নিরাকার মিব প্রহসন্নিদম্ অব্রবীৎ। দ্রুপদ বললেন– ব্রাহ্মণ তোমার বুদ্ধির শুদ্ধি হয়নি এখনও। তাই দেশের রীতি সামাজিক রীতি কিছুই শেখনি। তুমি যে এই জোর করে বললে আমি তোমার সখা, সেটা ঠিক করনি। কারণ, মনে রেখো মানুষ যেমন সময়কালে বুড়ো হয়, তেমনই বন্ধুত্ব জিনিসটাও বুড়িয়ে যায়, তার তীক্ষ্ণতা থাকে না। সঙ্গতানীহ জীৰ্যন্তে কালেন পরিজীৰ্যতঃ। তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল বটে, কিন্তু তার একটা কারণও ছিল। একসঙ্গে পড়তাম, একসঙ্গে অস্ত্রশিক্ষা করতাম, তোমার আমার লক্ষ্য ছিল একেবারেই এক। এইরকম একটা সমান-মনস্কতার জন্যই তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার– সৌহৃদং মে ত্বয়া হ্যাঁসীৎ পূর্বং সামর্থ্যবন্ধন। কিন্তু তুমি নিজেই ভেবে দেখ– অব্রাহ্মণ কি ব্রাহ্মণের বন্ধু হয়? কিংবা একজন যুদ্ধবীর রথী ক্ষত্রিয়ের সঙ্গে যুদ্ধজ্ঞানহীন অরথীর বন্ধুত্ব? হয় কি কখনও? বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে, অসমান বন্ধুত্ব হয়ও না, টেকেও না–সাম্যান্ধি সখ্যং ভবতি বৈষম্যানোপপদ্যতে।
পাঞ্চাল দ্রুপদের তির্যক বাভঙ্গি দেখেই আমরা বেশ বুঝতে পারছি যে, তিনি দ্রোণাচার্যের সঙ্গে পূর্ব-বন্ধুত্ব অস্বীকার করতে চলেছেন। বাস্তব জীবনে, সত্যিই যে এমনটি না হয়, তা নয়। খুব ছোটবেলায় বিদ্যালয়-শিক্ষার পরিসরে কতই না বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। সেই বন্ধুত্বের মধ্যে মায়া, পারস্পরিক অনুভব এবং পারস্পরিক প্রতিজ্ঞারও অভাব থাকে না কোনও। কিন্তু বয়স পরিপক্ক হতে থাকলে, জীবনের সহস্র হাজার প্রশ্ন তরঙ্গিত হতে থাকলে, মানুষের সামনে থেকে পূর্বকৃত মায়ার প্রতিজ্ঞাগুলি আস্তে আস্তে জীর্ণ হতে থাকে। দ্রুপদেরও হয়তো তাই হয়েছে। কিন্তু দ্রুপদ যে প্রথম থেকেই এত কঠিন ভাষায় দ্রোণকে এমন স্তব্ধ করে দিতে চাইছেন, সেটা একেবারে অস্বাভাবিক লাগলেও এর পিছনে কিছু স্বাভাবিক কারণও থাকতে পারে।
