দ্রোণ এমন কিছু উঁচু দরের ব্রাহ্মণ ঋষি ছিলেন না যে, শমদমাদিসাধনের মাধ্যমে নিজেকে তিনি ক্রমেই ব্ৰহ্ম–জিজ্ঞাসার উপযুক্ত করে তুলছিলেন। সাধারণ অগ্নিহোত্র, সন্ধ্যাবন্দনা যে কোনও জন্ম–ব্রাহ্মণই করতেন, কিন্তু বিবাহিত স্ত্রীর সহবাসেও ইন্দ্রিয়দমনের প্রয়োজন যে তার। খুব ছিল, সে কথা আমাদের মনে হয় না। আর মনে হয় না বলেই আরও একটা কথা মনে হয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠকালে আমাদের এক সহপাঠিনীকে আমরা খুবই শ্রদ্ধা করতাম। তিনি পড়াশোনায় খুবই ভাল ছিলেন, ক্যাট্রক্যাটু করে কথা বলতেন এবং অতিশয় অসুন্দরী ছিলেন। আমার দু-একটি নিন্দাপ্রবণ বন্ধু–অবশ্য তাদেরই বা কী দোষ দেব–তাদের সামনে ওই কঠিনহৃদয়া সহপাঠিনীর নাম উচ্চারণ করলেই তাঁরা বলতেন– বলিস না, কি বলিস না ভাই, ওঁর সম্বন্ধে। চিত্তশুদ্ধির এমন যন্ত্র কোনও বৈজ্ঞানিক তৈরি করতে পারবেন না। দেখামাত্রই মনে হয় এ জীবনে ব্রহ্মচর্যই একমাত্র শ্রেয় বস্তু।
মহাভারতের কবি কিছু না বললেও দ্রোণের কথা থেকেও তার স্ত্রীর সম্বন্ধে এমনই এক ধারণা আসে। দ্রোণ বলেছিলেন আমার সেই বুদ্ধিমতী স্ত্রী আমার ইন্দ্রিয়দমনের সহায়িকা এক রমণী– দমে চ সততং রতাম। মহাভারতের কোনও ব্রহ্মবাদী ঋষিকেও নিজের স্ত্রীর সম্বন্ধে এ ধরনের কথা বলতে শুনিনি। তার মধ্যে দ্রোণ নিজেই বলেছেন– মেয়েটির মাথায় চুল বলতে কিছু ছিল না– নাতিকেশীং মহাপ্রজ্ঞাম্। যৌবন বয়সেই যে রমণী কেশহীনতার জন্য যুবক দ্রোণের মনে ছায়া ফেলেছেন, তিনি যে তার স্বামীকে রূপে না ভুলিয়ে ভালবাসাতেই ভুলিয়েছেন, সে কথা আমরা জোর দিয়েই বলতে পারি।
আমরা বউ-পরিচয় করিয়ে দিই– দ্রোণাচার্যের স্ত্রীটি হলেন প্রসিদ্ধ কৃপাচার্যের ভগিনী কৃপী। কেন যে কৃপীর সঙ্গে তার বিবাহ হল, সে প্রসঙ্গ নিয়েও একটি অনুমান আছে। আগেই জানিয়েছি কৃপ এবং কৃপীর জন্ম এক জানপদী কন্যার গর্ভে, আবার দ্রোণাচার্যের জন্মও অন্যতরা এক অপ্সরা ঘৃতাচীর গর্ভে। দুই পক্ষেরই জন্ম স্বাভাবিক বিবাহযোগে নয়। জন্ম হয়েছে দুই ব্রাহ্মণের কামোন্মত্ততায়। তাদেরই ঔরসে। মাতৃপরিচয়হীন এই দুই জাতক-জাতিকার বিবাহটাই তাই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিবাহের কিছুকালের মধ্যে দ্রোণাচার্যের পুত্র হল দ্রোণ-পুত্রের নাম হল অশ্বত্থামা। কিন্তু পুত্রলাভের সৌভাগ্য লাভ করেও দ্রোণের অবস্থার কোনও উন্নতি হল না। এত অস্ত্রশিক্ষা লাভ করেও তার কোনও সমৃদ্ধি নেই, অথচ ক্ষত্রিয়রা অনেকেই পৈতৃক রাজ্য লাভ করে যথেষ্ট সমৃদ্ধির মধ্যে আছেন। দ্রোণের কোনও রাজ্যও নেই এবং একটি রাজ্য অধিকার করতে যে পরিমাণ সৈন্য-সামন্ত এবং অর্থের প্রয়োজন হয়, তাও তার নেই। তাঁর দিনই চলে না, তো সৈন্য-সামন্ত যোগাড় করবেন কোন অর্থ দিয়ে।
দ্রোণাচার্য ভীষ্মের কাছে নিজের দুঃখ–কাহিনী বিবৃত করছিলেন। যে ঘটনাটা তার অর্থনৈতিক জীবনে সবচেয়ে বেশি আঘাত করল সেটি তার পুত্রকে নিয়েই। দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামা বড় হচ্ছিলেন বটে, তবে একটি শিশুর প্রাপ্য যে গোদুগ্ধটুকু, তারও আস্বাদ তিনি জানতেন না। একদিন পাড়ার মধ্যেই এক সম্পন্ন গৃহস্থবাড়িতে তার ছোট ছোট ছেলেরা দুধ খাচ্ছিল। অশ্বত্থামা সেটা দেখে খুবই লুব্ধ হলেন এবং পিতা দ্রোণের কাছে এসে দুধ খাওয়ার বায়না করলেন। দ্রোণাচার্যের মনে সেদিন চরম আঘাত লেগেছিল। ছেলেকে একটু দুধ পর্যন্ত খাওয়াতে পারেন না–এই দৈন্যদশা তাকে অত্যন্ত দুঃখিত করে তুলল।–অশ্বত্থামারুদ বালস্তন্মে সম্মোহয়দ্দিশঃ। অথচ ব্রাহ্মণের ছেলে হওয়ার দরুন দ্রোণাচার্যের কিছু গুমোরও আছে। কোনও লোকের কাছে কিছু না চাওয়াটাই ব্রাহ্মণের গৌরব। এ গৌরব তখনও পর্যন্ত তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
আর কিছু নয়, পুত্রের দুগ্ধপানের জন্য তিনি একটি গোরু চেয়েছিলেন। দ্রোণাচার্য ব্রাহ্মণের কর্মগুলি করেন না। যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা কিছুই করেন না। এগুলি চালিয়ে গেলে অন্তত একটি গোরু যোগাড় করতে তাঁর অসুবিধে হত না। কিন্তু এগুলোও তিনি করবেন না, আবার ব্রাহ্মণের জাতি-গৌরব মেনে কারও কাছে যাচনা-প্রতিগ্রহও করবেন না; ফল যা হবার তাই হল। দেশ-দেশান্তর ঘুরে দ্রোণ একটি দুগ্ধবতী গোর যোগাড় করতে পারলেন না। দ্রোণ নিজেই বলেছেন, দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত ঘুরেও ছেলেকে দুধ খাওয়ানোর মতো একটা গোরু আমি যোগাড় করতে পারলাম না– অন্তদন্তং পরিভ্রম্য নাধ্যগচ্ছং পয়স্বিনীম।
এর পরে যে ঘটনা ঘটল, দ্রোণের পক্ষে তা আরও মর্মবিদারক। অশ্বত্থামা প্রতিদিনই দুধের লোভে লোভে পাড়ায় সেই বড়লোকের বাড়িতে যান। একদিন বালকেরা দুষ্টুমি করে পিটুলিগোলা জল একটি পানপাত্রে রেখে অশ্বত্থামাকে খেতে দিল। অশ্বত্থামা নিজেকে পরম অনুগ্রহান্বিত মনে করে পরম আনন্দে সেই পিটুলিগোলা জলকে দুধ মনে করে পান করলেন এবং পিতার কাছে এসে সেই জলের বর্ণনা দিয়ে সোচ্ছ্বাসে বললেন–দুধ খেয়েছি, দুধ খেয়েছি–পীত্বা পিষ্টরসং বালঃ পীতং ক্ষীরং ময়াপি চ। অশ্বত্থামা পিতাকে তার আনন্দের খবর দিয়েই আবার নাচতে নাচতে সেই ছেলেদের দলে গিয়ে পড়লেন। অশ্বত্থামা নাচতে লাগলেন দুধ খাওয়ার আনন্দে আর ধনীর পুত্রেরা তাকে ঘিরে নাচতে লাগল উপহাসের আনন্দে–হাস্যতামুপসপ্রাপ্তং বালৈঃ পরিবৃতং সুতম্।
