সেকালের দিনে গুরুগৃহে বাস এবং শিক্ষালাভ অত আরামের কিছু ছিল না। ব্রহ্মচারী হয়ে সংযতচিত্তে গুরুশুশ্রূষা করতে হত দিনের পর দিন। অনেক বছর এইভাবে থাকতে থাকতে দ্রোণের চুলে জটা ধরে গিয়েছিল–ব্রহ্মচারী বিনীতাত্মা জটিলো বহুলাঃ সমাঃ। গুরুগৃহে অস্ত্রচর্চার এই সময়গুলিতে দ্রোণের সঙ্গে পাঞ্চলরাজ পৃষতের পুত্র দ্রুপদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গাঢ়তর হয়। গুরুশুশ্রষা এবং অস্ত্রশিক্ষার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা বলতে বলতেই এই দ্রোণ এবং দ্রুপদের বন্ধুত্ব এক চরম সীমায় পৌঁছায়।
.
৯৮.
দ্রুপদ এবং দ্ৰোণ একই ব্রহ্মচর্যের নিয়ম মেনে একই গুরুর কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতেন বটে, তবে তাদের মানুষ হওয়ার পূর্ব পরিবেশ এবং জাতি মর্যাদা যেহেতু অন্যরকম ছিল, তাই সতীর্থতার প্রগাঢ় সাহচর্যের মধ্যেও দুজনেরই স্বভাব ফুটে বেরত। দ্রুপদ রাজার ছেলে ক্ষত্রিয় এবং দ্রোণাচার্য ব্রাহ্মণের ছেলে, কিন্তু বামুন হওয়া সত্ত্বেও তিনি যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা ত্যাগ করে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে এসেছেন। আসলে ওই দিকেই তাঁর রুচি ছিল। একালের দিনে ব্রাহ্মণের স্বকর্ম বা স্বধর্মত্যাগের মধ্যে কোনও লাঞ্ছনা নেই, কারণ সময় পালটেছে। আমরা এখন জাতের বিচারে এবং আচারে মনুষ্যত্বকে লঙ্ঘন করতে চাই না বলেই জন্মের মর্যাদায় মানুষের বিচার করি না। কিন্তু সেকালে কোনও ব্রাহ্মণ যখন নিজের যজন-যাজন-অধ্যয়ন ছেড়ে ক্ষত্রিয়ের অস্ত্রশিক্ষায় মন দিতেন, তখন তার মানে হত একটাই। শম-দম-তপস্যা তার কাম্য নয়, তার কাম্য অর্থ, প্রতিপত্তি, ক্ষমতা ইত্যাদি।
দ্রুপদ এবং দ্ৰোণ যখন একত্রে অস্ত্রশিক্ষা করেছেন, তখন যে কোনওভাবেই হোক দ্রোণের ওই প্রতিপত্তিকামিতা দ্রুপদের কাছে প্রকট হয়ে পড়েছিল। একসঙ্গে কষ্ট করছেন একই গুরুর কাছে। অতএব সেই সময়ে দ্রুপদের কাছেও দ্রোণের ওই আকাক্ষার কোনও কদৰ্থ ছিল না। অর্থাৎ দ্রুপদও দ্রোণকে খারাপভাবে নেননি। বন্ধুত্বের মর্যাদাতেই তিনি দ্রোণকে বলতেন–ভাই। আমি আমার পিতার প্রিয়তম পুত্র। পিতা আমাকেই তার রাজ্যে অভিষিক্ত করবেন এবং পিতার অবর্তমানেও পাঞ্চাল রাজ্যের সিংহাসন আমারই হাতে থাকবে। সেই সুদিনে তোমাকে আমি ভুলব না ভাই। আমি যদি রাজ্য পাই, তবে সে রাজ্য তোমারও ভোগে আসবে, এ আমার প্রতিজ্ঞা–তদূভোগ্যং ভবিতা রাজ্যং সখে সত্যেন তে শপে। তুমি এও জেনো–আমার ধন-সম্পত্তি, আমার সুখ–সে সব তোমারও।
দ্রোণের সঙ্গে দ্রুপদের এই শেষ কথা। অস্ত্রশিক্ষা শেষ করে দ্রুপদ যেদিন পাঞ্চাল-রাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন, সেদিন এই সব কথা হল দুই বন্ধুর মধ্যে। দ্রুপদ পাঞ্চালে ফিরে যাবার পর দ্রোণও ফিরে এসেছেন পিতার আশ্রয়ে। পিতা ভরদ্বাজ ব্রাহ্মণ-গুরু। তিনি যজন-যাজননিয়েই থাকেন। তার অবস্থা এমন নয় যে, দ্রোণকে তিনি ঐশ্বর্যের আস্বাদ দিতে পারেন। ব্রাহ্মণের যজন-যাজনশিক্ষা করলেও না হয় যাগ–যজ্ঞের অনুষ্ঠান করার জন্য ডাক পেতেন কোথাও। ক্ষত্রিয়ের অস্ত্রবিদ্যা শিখে ব্রাহ্মণ পিতার বাড়িতে দীনহীন অবস্থায় থেকে দ্রোণের মতো যুদ্ধবীরের ভাল লাগবার কথা নয়। কিন্তু তার পিতাই বা কী করবেন? তাঁকে যাজন করতেও পাঠাতে পারছেন না, আবার স্বধর্মত্যাগী পুত্রকে অর্থের জন্য ক্ষত্রিয় রাজার বাড়িতে যাচনা করতে পাঠাতেও তার মর্যাদায় লাগে। অতএব তিনি কী আর করেন।
কিছুই না পেলে তখনকার দিনে বিয়ে করাটাই ছিল সবচেয়ে কাজের কাজ। পিতা ভরদ্বাজ দ্রোণকে বললেন–বিবাহ করো। পরবর্তী সময়ে দ্রোণ তার বিবাহের ঘটনা খুব সহজ করেই বলেছেন। যেন এই বাবা বললেন বিয়ে করো; আর তারপর একটি বুদ্ধিমতী মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হল। কিন্তু দ্রোণাচার্যের বক্তব্যের তির্যক ভঙ্গি থেকেই বোঝা যায় যে, তাঁর বিবাহের মধ্যেও কিছু কথা আছে। মহাভারতের কবি যেহেতু সে সব কথা স্বকণ্ঠে বলেননি, তাই আমরাও সে কথা উচ্চারণ করার সাহস পাই না। তবে কিনা দ্রোণের বক্তব্য শোনার পর যদি এমন মনে হয় যে, সত্যিই এর মধ্যে কিছু কথা আছে, তবে তা উচ্চারণ করলে দোষ নেবেন না মহাভারতের কবি।
দ্রোণ নিজের জীবন-কাহিনী বলবার সময় ভীষ্মকে বলেছিলেন–পিতার আদেশ অনুসারে এবং পুত্রলাভের আকাঙ্ক্ষায় আমি তারপর একটি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী কন্যার পাণিগ্রহণ করলাম–মহাপ্রজ্ঞামুপযেমে মহাব্রতা। একটাই ব্যাপার, মেয়েটির মাথায় খুব একটা চুল ছিল না–নাতিকেশী। তবে তিনি যথেষ্ট ব্রতপরায়ণা ছিলেন, এবং আমার অগ্নিহোত্র বা যজ্ঞকার্যেই শুধু নয়, আমার ইন্দ্রিয়দমনের ক্ষেত্রেও তিনি বিশেষ সহায়তা করতেন অগ্নিহোত্রে চ সত্রে চ দমে চ সততং রতাম্।
দেখুন, সেকালের ব্রাহ্মণ যদি তার স্বধর্ম এবং স্বকর্ম ত্যাগও করতেন, তবু অগ্নিহোত্র বা যাগ-যজ্ঞাদি তার নিত্য-কর্মপদ্ধতির অন্তর্গত ছিল। দ্রোণ যাঁকে বিবাহ করে আনলেন, তার গুণ ছিল যথেষ্টই। তিনি বুদ্ধিমতী এটা তো খুব বড় কথা বটেই। তিনি ঘর-কন্না সামলেও দ্রোণের অগ্নিহোত্রের যোগাড় করে দিতেন, নিজের ইচ্ছেতে যজ্ঞাদি করতে চাইলে তারও সহায়তা করতেন। কিন্তু এটা ভারী আশ্চর্য কথা যে নববিবাহিতা বধূর সম্বন্ধে অনেককাল পরে স্মরণ করতে গিয়ে দ্রোণ বলছেন–তিনি আমার ইন্দ্রিয়দমনেরও সহায় ছিলেন।
