মুগলের ছেলে মৌলের নাতি হলেন বর্ধশ্ব। বর্ধশ্ব কোনও সময়ে স্বর্গসুন্দরী মেনকার মোহে পড়ে দুটি যমজ পুত্র-কন্যার জন্ম দেন, পুত্রটির নাম দিবোদাস, যাঁর কথা আগে বলেছি। আর কন্যাটির নাম অহল্যা। অহল্যার সঙ্গে যাঁর বিবাহ হয়, তার নাম শরদ্বত, অন্তত হরিবংশে তাই আছে। আমরা কৃপাচার্যের পিতার নাম বলেছি শরদ্বান। তবে হরিবংশের বক্তব্য শুনে মনে হয় শরদ্বান হয়তো তাঁর কুলনাম বা বংশ নামমাত্র। কারণ হরিবংশে দেখেছি– যে রমণীর গর্ভে কৃপ-কৃপীর জন্ম হল, সেই রমণীর গর্ভাধান করেছিলেন সত্যধৃতি নামে এক পুরুষ, যিনি শরদ্বানের নাতি। আমাদের ধারণা কুল-নাম যোজনা করে নিলে কৃপাচার্যের পিতার নাম হওয়া উচিত সত্যধৃতি শরদ্বান। হরিবংশে সত্যধৃতিকেও ধনুর্বেদ ব্যসনী এক ক্ষত্রোপেত ব্রাহ্মণ হিসেবেই দেখতে পাচ্ছি। কুলনাম অনুসারে মহাভারত তাকে শুধুই শরদ্বান বলেছে, কিন্তু আসলে তিনি সত্যধূতি শরদ্বান, যিনি সেই জানপদী কন্যার গর্ভে কৃপ-কৃপীর জন্ম দিয়েছিলেন। সত্যধৃতির সময়ে যিনি পাঞ্চালের রাজা ছিলেন, তারই কোনও কূট-কৌশলে জানপদীকে সত্যধৃতি-শরদ্বানের কাছে পাঠানো হয়েছিল কিনা জানি না, কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে কৃপাচার্যের জন্ম কিন্তু পাঞ্চাল–বংশের ধারায়। মহারাজ শান্তনু কৃপাচার্যকে শিশু অবস্থায় নিয়ে এসে মানুষ করেছিলেন বটে কিন্তু এর মধ্যেও তার বংশগত পাঞ্চাল-বিদ্বেষ কাজ করছিল কিনা সেটা তৎকালীন রাজনৈতিক স্থিতিতেই বুঝে নেওয়া ভাল। অর্থাৎ কৃপাচায়ের রক্তে কোনও পাঞ্চাল-বিদ্বেষ ছিল বলেই হস্তিনাপুরের রাজনীতিতে তাঁর প্রবেশ ঘটেছিল কিনা, সে বিষয়টা আমাদের অভীষ্ট একটি অনুমানের মধ্যে রয়ে গেল। এবারে দ্রোণাচার্যের কথায় আসি।
দ্রোণাচার্যের জন্মও খুব স্বাভাবিকভাবে হয়নি। অর্থাৎ এখানেও এক অপ্সরার কাহিনী আছে। মহাভারতের বক্তব্য অনুযায়ী দ্রোণাচার্যের জন্মদাতা পিতা হলেন মহর্ষি ভরদ্বাজ। তিনি ভরদ্বাজ গোত্রীয় অন্য কোনও মুনিও হতে পারেন, যাঁকে শুধুই ভরদ্বাজ বলে ডাকা হয়েছে। তিনি একদিন হোম করার জন্য আশ্রম থেকে বেরিয়েছেন। তার ইচ্ছে– গঙ্গাস্নান সেরে তিনি হোম সমাপন করবেন। কিন্তু গঙ্গায় স্নান করতে যাবার পথেই তার জীবনে এক বিড়ম্বনা নেমে এল। হঠাৎই তিনি দেখতে পেলেন–স্বর্গসুন্দরী ঘৃতাচী গঙ্গায় স্নান করার পর ভিজে কাপড় ছেড়ে শুকনো কাপড় পরছেন। পুরাতন এবং নবীন বস্ত্রের পর্যাবর্তনের মাধ্যমিক সময়টুকুতে ঘৃতাচীর গায়ে কোনও আবরণ ছিল না। ভরদ্বাজের চিত্তবৃত্তি চঞ্চল হল রমণী-শরীরের বাসনায়। তিনি ঘৃতাচীকে কামনা করলেন–ব্যপকৃষ্টাম্বরাং দৃষ্ট্ৰা তাং ঋষিশ্চকমে ততঃ। ভরদ্বাজ মিলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন না। তাঁর তেজ স্খলিত হয় এবং তিনি সেই ক্ষরিত তেজোবিন্দু হাতে ধরা কলসের মধ্যে ধারণ করেন। কলসের পর্যায় শব্দ হল দ্রোণ। এই কলস থেকে যিনি জন্মেছেন, তার নামও তাই দ্রোণ।
দ্রোণ তথা কলসের অলৌকিক বৃত্তান্ত নিয়ে বেশি আলোচনা না করে আপনারা যদি গর্ভ বস্তুটাকেই কলসের রূপকে মেনে নেন, তাহলে কোনও অনামা রমণীর গর্ভেই দ্রোণের জন্ম হয়েছিল বলে আমরা বুঝে নিতে পারি। অপ্সরা-সুন্দরী ঘৃতাচীর নাম এখানে বাহুল্যমাত্র। যাইহোক, দ্রোণাচার্য একটু বড়ো হালে মহর্ষি ভরদ্বাজ তাকে অগ্নিবেশ্য মুনির কাছে অস্ত্র শিক্ষার জন্য রেখে দেন। ভরদ্বাজ ব্রাহ্মণেরা মুনি-ঋষি হলেও এঁরা অস্ত্রশিক্ষা খুব ভালভাবেই করেছিলেন। বাল্মীকি রামায়ণে দেখবেন–রামচন্দ্র বনবাসকালে কোনও এক ভরদ্বাজ ব্রাহ্মণের কাছ থেকে অস্ত্রলাভ করেছিলেন।
ভরদ্বাজ কোনও সময় অগ্নিবেশ্য মুনিকে একটি আগ্নেয় অস্ত্র দান করেছিলেন। কিন্তু দ্রোণাচার্যের অস্ত্রশিক্ষায় খুশী হয়ে সেই আগ্নেয় অস্ত্র দ্রোণকেই দান করেন অগ্নিবেশ্য। মহাভারতের কবি কাব্য করে অগ্নিবেশ্য মুনিকে অগ্নির পুত্র বলে বর্ণনা করেছেন–অগ্নেস্ত জাতঃ স মুনিঃ–কিন্তু আমাদের ধারণা এই বিশেষ ব্রাহ্মণ-গোষ্ঠী, অগ্নিবেশ্য যাঁদের অন্যতম, এঁরা আগ্নেয় অস্ত্র–চালনায় সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। আগ্নেয় অস্ত্র–চালনা সেকালের দিনে অত সহজ ছিল না। একটি বাণ ছাড়ার সময়েই তাতে অগ্নি-সন্নিবেশ করে শত্রুপক্ষের মধ্যে সেই বাণের নিপতন পর্যন্ত অগ্নি অক্ষুণ্ণ রাখা অত সোজা ব্যাপার ছিল না। মুনিবর অগ্নিবেশ্য সেই বিদ্যা জানতেন এবং দ্ৰোণকে তিনি তা শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
দ্রোণকে ছোটবেলায় বেদ–বেদাঙ্গ সবই শিখিয়েছিলেন ভরদ্বাজ। কিন্তু বয়সকালে দেখা গেল ব্রাহ্মণের বেদ–বিদ্যার চেয়ে অস্ত্রবিদ্যাই তার আসে ভাল। অতএব ভরদ্বাজ তাকে অগ্নিবেশের হাতেই সঁপে দেন অস্ত্রশিক্ষার জন্য। মনে রাখতে হবে, এই সমস্ত ঘটনার পটভূমি কিন্তু পাঞ্চাল রাজ্য এবং তখন পাঞ্চাল শাসন করছেন মহারাজ পৃষত, যিনি পরবর্তী পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের পিতা। রাজা পৃযত দ্রোণ-পিতা ভরদ্বাজের বন্ধু-মানুষ-ভরদ্বাজসখা চাসীৎ পৃষতো নাম পার্থিবঃ দ্রোণাচার্য যখন ঘোট, তখন পৃষতের প্রিয়তম পুত্র দ্রুপদ ভরদ্বাজের আশ্রমে খেলা করতে আসতেন। দ্রোণ একটু বড় হতে যখন অগ্নিবেশ্য মুনির কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে গেলেন, তখন হয়তো বা ভরদ্বাজের পরামর্শেই–রাজা পৃষত পুত্র দ্রুপদকে পাঠিয়ে দিলেন অগ্নিবেশ্যর কাছে। দুজনেরই অস্ত্রশিক্ষা চলতে লাগল একসঙ্গে।
