কথাটা একটু সহজ করে বলি। গোষ্ঠী-নামের কথা ব্যক্ত দিন। আসলে সৃঞ্জয়, সোমক–এঁরা হলেন পাঞ্চাল-দেশের একেক জন বিখ্যাত রাজাদের একেক জনের নামেই একেকটি বংশধারা বিখ্যাত হয়ে গেছে। আমরা এর আগে সৃঞ্জয় এবং সোমকের কথা সবিস্তারে বলেছি। বলেছি সোমকের সেই বিখ্যাত ছেলেটির কথা, যাঁর নাম ছিল জন্তু। পাঠকের মনে পড়বে সোমকের এই একমাত্র ছেলেকে একটি পিঁপড়ে কামড়েছিল বলে তার স্ত্রীদের মধ্যে কী অসম্ভব ব্যাকুলতার সৃষ্টি হয়েছিল। আমরা তখনই জানিয়েছিলাম যে, এক পুত্রের নানা সমস্যা নিয়ে বিব্রত হয়েছিলেন বলে সোমক শেষ পর্যন্ত জন্তুকে যজ্ঞে আহুতি দিয়ে শত পুত্র লাভ করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে কনিষ্ঠটি ছিলেন পৃষত। ভাইদের মধ্যে পৃষতই সবচেয়ে যোগ্য ছিলেন বলে তিনি পাঞ্চালের রাজসিংহাসনে বসেছিলেন। ভবিষ্যতে তিনিই পাঞ্চাল-রাজ দ্রুপদের পিতা হবেন–তেষাং যবীয়ান্ পৃষতো দ্রুপদস্য পিতা প্রভু।
আরও একটা খবর আপনাদের পূর্বে জনিয়েছিলাম, যেটা এই মুহূর্তে স্মরণ করতে হবে। আমরা বলেছিলাম– কুরুরাজ্যের সঙ্গে পাঞ্চাল দেশের সম্পর্ক মোটেই ভাল ছিল না। কুরুবংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজা সম্বরণের কথা বলবার সময় আমরা জানিয়েছিলাম যে, পাঞ্চালরা কুরুরাজ্য আক্রমণ করে সম্বরণ এবং তার স্ত্রী তপতাঁকে দেশছাড়া করে ছেড়েছিলেন। সম্বরণকে পুত্র-পরিবার নিয়ে সিন্ধু নদীর তীরভূমিতে গিরি গুহা আশ্রয় করে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে বহু সময়। সম্বরণ মহর্ষি বশিষ্ঠের সাহচর্যে কুরুরাজ্য পুনরায় দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন বটে, তবে সে আরেক কথা। আমরা আবারও সহজ করে বলি।
পাঞ্চাল সোমক এবং তারও পূর্বপুরুষ সৃঞ্জয়ের নাম এতটাই বিখ্যাত ছিল যে একেবারে মহাভারতের কুরুক্ষেত্রের সময় পর্যন্ত পাঞ্চালদের কখনও সৃঞ্জয়া কখনও বা সোমকা বলে ডাকা হয়েছে। ঋগবেদ এবং বায়ু পুরাণের তথ্য মিলিয়ে দেখা যাবে–সৃঞ্জয়ের বংশেই রাজা দিবোদাসের জন্ম হয় এবং সেই বংশেই চ্যবন বলে এক রাজা জন্মান। এই চ্যবন নামটা নিয়ে পুরাণে-পুরাণে বিবাদ আছে। কেউ বলেন, নামটা চ্যবন নয়, পঞ্চজন, আবার কেউ বলেন পঞ্চজনও নয়। নামটা পিজবন। আমরা নানা তথ্য বিচার করে দেখেছি– এই নামটি চিনতে হবে তথাকথিত চ্যবন বা পঞ্চজনের ছেলের নাম দিয়ে। এঁর ছেলের নাম ছিল সুদাস অথবা সুদা। ঋগবেদেও সুদাসের নাম বহুবার পাওয়া যাবে। এই সুদাসের পিতার নাম যে চ্যবনও নয়, পঞ্চজনও নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে মনুসংহিতায়। সেখানে সুদাস বা সুদার সঙ্গে তার পিতার নামও উল্লেখ করা হয়েছে– সুদা পৈজবনশ্চৈব অর্থাৎ পিজবনের ছেলে সুদাস।
পণ্ডিতেরা অনেকে মনে করেন সুদাসের সঙ্গেই সম্বরণের যুদ্ধ হয়েছিল এবং তারই আক্রমণে তাঁকে পালিয়ে যেতে হয়েছিল সিন্ধু নদীর পার্বত্য অঞ্চলে। পুরাণ বলেছেরাজ্য পুনরুদ্ধার করার জন্য সম্বরণ মহামুনি বশিষ্ঠকে মন্ত্রিত্বে বরণ করেন। বশিষ্ঠের মন্ত্রিত্ব বা মন্ত্রণা কতটা সফল হয়েছিল জানি না, কিন্তু লক্ষণীয় ব্যাপার হল, সম্বরণ একাই যে বশিষ্ঠের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, তা নয়। পুরাণের তথ্য অনুযায়ী– ভরতবংশের সমস্ত ধারা–উপধারা সকলেই বশিষ্ঠের শরণাপন্ন হয়েছিলেন দুর্গত সম্বরণের সাহায্য-কল্পে-অর্ঘ্যমভ্যাহরৎ তস্মৈ তে সর্বেভারতাস্তদা।
রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির একটি বিশেষ সংখ্যায় এক গবেষক বিচার করে দেখিয়েছেন যে, এই ভারতাঃ বলতে শুধু ভরত-বংশের অধস্তনদের কথা ভাবলে ভুল হবে। পাঞ্চাল সুদা বা সুদাসের আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য তখনকার উত্তর-পশ্চিম ভারতের সমস্ত রাজারাই সম্বরণের সঙ্গে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। মথুরার যাদবরা, উশীনর শিবিরা, গান্ধারবাসী হুরা, মৎস্যদেশের রাজা এবং আধুনিক রেওয়া অঞ্চলে বসবাসকারী তুর্বসুরা। শেষোক্ত তুর্বসুরা পূর্বে পাঞ্চালের কিছু অংশে রাজত্ব করতেন বোধহয়। এঁরা সবাই পাঞ্চাল সুদাসের বিরুদ্ধ-ভূমিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং এঁদের একত্র করার ব্যাপারে বশিষ্ঠ-বংশীয় ব্রাহ্মণরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন মনে হয়।
হস্তিনাপুর সম্বরণের হাতে এসেছিল এবং তার বিখ্যাত পুত্র কুরুর আমলে রাজ্যের বাড়বৃদ্ধি চূড়ান্ত হয়েছিল। তাঁর আমলে কুরু-রাজ্যের সীমানা সরস্বতীর তীরভূমিতে স্থিত কাম্যক বন থেকে আরম্ভ করে যমুনার কাছাকাছি খাণ্ডবপ্রস্থ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। অর্থাৎ এখনকার থানেশ্বর, মিরাট এবং দিল্লির লাগোয়া অংশ অপচ গঙ্গা নদীর ওপর বিস্তীর্ণ দোয়াব অঞ্চল তখন মহারাজ কুরুর অধীনে এসে গিয়েছিল। কুরুরাজ্যের এই প্রতিপত্তিতে পাঞ্চালদের ক্ষমতা অনেকটাই সীমিত হয়ে আসে এবং পাঞ্চাল সোমকের আমলে তার বংশ যখন প্রায় লুপ্ত হবার যোগাড় হল, সেই সময়ে যাঁকে আমরা রাজ্যের হাল ধরতে দেখেছি, তিনি সোমকের কনিষ্ঠ পুত্র পৃষত।
আমরা এইরকম একটা জায়গা থেকেই পাণ্ডব-কৌরবদের অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের কথা শুরু করতে চাই। কারণ তার সঙ্গে পাঞ্চাল এবং কুরুদেশের রাজনীতি জড়িয়ে আছে। কিন্তু তারও আগে জানাই– পাণ্ডব-কৌরবদের প্রথম অস্ত্রগুরু কৃপাচার্য, যাঁকে মহারাজ শান্তনু শিশু অবস্থায় তুলে এনে হস্তিনাপুরে স্থান দিয়েছিলেন, তার জন্ম কিন্তু পাঞ্চালদের বংশধারায়। আমরা পুরাণের প্রমাণে যে পাঁচজন সমর্থ রাজাকে পাঞ্চালের অধিকারী রাজা হিসেবে দেখিয়েছি তাদের প্রথম পুত্রের নাম মুগল। এই মুৰ্গলের ছেলেরা কিন্তু সকলেই ব্রাহ্মণ হয়ে যান, যাঁরা মৌগল্য বা মৌদগল্যায়ন ব্রাহ্মণ নামে পরিচিত হন–সর্ব এতে মহাত্মানঃ ক্ষত্রোপেতা দ্বিজাতয়ঃ। এঁরা জাতে ক্ষত্রিয় কিন্তু পেশায় বামুন বলে পৌরাণিকেরা এঁদের ক্ষত্রোপেত দ্বিজ বলেছেন, পারজিটার সাহেব এঁদের ইংরেজি নাম দিয়েছেন– ক্ষত্রিয়া ব্রাহ্মিস্।
