আমরা এর আগে প্রধানত কুরুবংশের পরম্পরা বর্ণনা করেছি, বর্ণনা করেছি যদুবংশের পরম্পরাও। কিন্তু এই মুহূর্তে আরও একটি রাজ্যে আমাদের উত্তরণ করতে হবে। তা না হলে, মহাভারতের যুদ্ধভূমিতে উপস্থিত হলেই মনে হবে– এ কী হল? এই যুদ্ধ তো শুধু কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধ নয়, সেই সঙ্গে এ যে আরও অনেক কিছু। এই অনেক কিছুর আরও একটা মূল হল পাঞ্চাল না, যে দেশের রাজা এখন দ্রুপদ। আমরা পাঞ্চাল দেশের কথা একেবারেই যে কিছু বলিনি, তা নয়। তবে যা বলেছি, তা কুরুদের বংশধারার সূত্র ধরে। তবে তার মধ্যে বৈশিষ্ট্য যেটা, সেটা হল–আজকে ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুর পুত্রবর্গের মধ্যে যে জ্ঞাতি-বিরোধের সূত্রপাত ঘটেছে, তার থেকে অনেক পুরুষ আগে আরও একটা জ্ঞাতি বিরোধের সূত্র তৈরি হয়েছিল কুরু এবং পাঞ্চালদের মধ্যে। এই প্রসঙ্গে আমাদের একটু পূর্বকথা স্মরণ করতেই হবে।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে–আমরা কুরুবংশের বহু পূর্ব পুরুষ অজমীঢ়ের নাম করেছিলাম এক জায়গায়। তাঁর তিন পত্নী ছিল– নীলিনী, কেশিনী এবং ধুমিনী। অজমীঢ়ের ঔরসে নীলিনীর গর্ভে সুশান্তি নামে একটি পুত্র হয়েছিল। সুশান্তির পুত্র পুরুতি। তাঁর পুত্র বাহ্যাখ। এই বাহ্যাশ্বের পাঁচটি উপযুক্ত বীর পুত্র হয়েছিল। তাদের নাম–মুগল, সৃঞ্জয়, বৃহদিষ্ণু, যবীনর এবং কৃমিলা। এই পাঁচ ভাই প্রত্যেকেই বীর ছিলেন এবং তারা প্রত্যেকেই বোধহয় একেকটি ছোট ছোট রাজ্য করেন। এই পাঁচ ভাই পাঁচটি রাজ্য জয় করা এবং রক্ষা করায় সমর্থ (অলং) ছিলেন বলেই তাদের সম্মিলিত ভূখণ্ডের নাম পঞ্চাল-পঞ্চৈতে রক্ষণায়ালং দেশানামিতি বিশ্রুতাঃ।
পুরাণকারেরা এই পঞ্চবীরকে এক সমৃদ্ধ জনপদের অধিকারী বলে বর্ণনা করেছেন পঞ্চানাং বিদ্ধি পঞ্চালান্ স্ফীতৈ–জনপদৈবৃতান্। এই পঞ্চালদের রাজ্যই হল পাঞ্চাল। পঞ্চাল দেশের অধিবাসীদেরও বলা হয় পাঞ্চাল। দেশ হিসেবে পঞ্চাল ঋগবেদের আমল থেকেই বিখ্যাত। অবশ্য বৈদিক সময়ে পঞ্চাল দেশের নাম ছিল কৃবি। যে ঋকমন্ত্রে কৃবির উল্লেখ রয়েছে সেখানে সিন্ধু এবং অসিকী (চেনাব)–এই নদী বা জায়গারও উল্লেখ আছে। ঋকবেদের কৃবিকে পাঞ্চাল দেশের সঙ্গে একাত্মীয় বাঁধা কঠিন হলেও শতপথ ব্রাহ্মণের সময়ে এসেই কৃবি পাঞ্চালের সঙ্গে একাত্মক হয়ে গেছে। শতপথ ব্রাহ্মণ পরিষ্কার বলেছে আগে পঞ্চাল-দেশকে কৃবি নামে ডাকা হত–কৃবয় ইতি হ বৈ পুরা পাঞ্চালান আচক্ষতে। কৃবি দেশটি পূর্বে পরিচিত ছিল এখন নেই–এটা বোঝানোর জন্য শতপথ ব্রাহ্মণ তার সময়ের পাঞ্চাল রাজার বিশেষণ হিসেবে কৃবিদেশকে ব্যবহার করছেন। বলছেন– এই অতিরাত্র যজ্ঞ করেছিলেন ক্রৈব্য পাঞ্চাল– অতিরাত্রস্তেন হৈতেন ক্রৈব্য ইজে পাঞ্চালঃ।
ইতিহাসের আরেকটি তথ্য হল–শতপথ ব্রাহ্মণ–এ পরিবা বা পরিচক্রা বলে একটি জায়গার নাম করেছে পাঞ্চালঃ পরিবায়াং সহস্র-শত দক্ষিণ এবং এই পরিচক্রা বা পরিবাকে হেববার সাহেব মহাভারতের একচক্রার সঙ্গে এক করে দেখেছেন। পরে আমাদের কাহিনীতে একচক্রার প্রসঙ্গ আসবে। জতুগৃহ-দাহের পর পাঞ্চালদেশে যাবার পথে এই একচক্রা নগরে পাণ্ডবরা বেশ কয়েকদিন ছিলেন।
ঋগবেদের সময় থেকে কৃবি-পঞ্চালের ইতিহাস একটু বললাম এই জন্য যে, কুরুদেশের মতো পঞ্চালও আর্যদের অত্যন্ত এক প্রিয় স্থান ছিল। স্বয়ং মনু-মহারাজ পাঞ্চাল-দেশকে ব্রহ্মর্ষি–দেশের মধ্যে গণ্য করেছেন। আমরা মহাভারতের মধ্যে যে পাঞ্চাল-দেশকে দেখেছি আধুনিক মানচিত্রে তার চেহারা হবে–এখনকার উত্তরপ্রদেশের বেরিলি (রায়বেরিলি নয়), বুদায়ুন, ফুরুখাবাদ, রোহিলখণ্ডের খানিকটা এবং গঙ্গা-যমুনার মধ্যবর্তী দোয়াব অঞ্চলের খানিকটা। পুবদিকে পাঞ্চালের সীমানা হল গোমতী নদী, দক্ষিণে চম্বল-দক্ষিণাংশ্চাপি পাঞ্চালান যাবচ্চমতী নদী। পশ্চিমে মথুরা–শূরসেন অঞ্চল। মহাভারতে কুরুদেশের যেমন অবস্থিতি দেখেছি, তাতে কুরুদেশের চারপাশে যে সব দেশ আছে, তার মধ্যে পাঞ্চাল অন্যতম।
পণ্ডিতেরা মনে করেন, পাঞ্চাল দেশের সঙ্গে গঙ্গা এবং কুরুদেশের ব্যবধান রচনা করেছিল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত ঘন-সন্নিবিষ্ট বিশাল বনরাজি। জতুগৃহ দাহের পর পাণ্ডবরা পাঞ্চালের অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন গঙ্গা পার হয়ে, ওই বিশাল অরণ্য পথ পেরিয়ে। আমরা যে পুরাণের কল্পনা অনুযায়ী পাঁচ জন সমর্থ রাজার পাঞ্চাল-অধিকারের কথা বলেছি, সেই পাঁচ রাজার নাম সর্বত্র একরকম নয়। বিশেষত বৈদিক শতপথ বা ঐতরেয়র মতো প্রাচীন ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিকে প্রমাণ হিসেবে ধরলে এই পাঁচ রাজার নাম দাঁড়াবে কৃবি, তুর্বশস্, কেশিন (কেশী), সৃঞ্জয় এবং সোমক। পণ্ডিতেরা এগুলিকে কোনও একক রাজার নাম মনে করেন না। বৈদিক জন-জাতির প্রথম বসতি, অধিকার এবং রাজনৈতিক-সামাজিক স্থিতি বিচার করলে এগুলিকে গোষ্ঠী নাম বলাই ভাল। আমরা যেমন ক্ৰব্য পাঞ্চালের নাম পেয়েছি তেমনই আর চার জনের বৈদিক পরিচয়ও বলা যাবে।
পাঞ্চাল সোন সাত্ৰাসাহর সঙ্গে তুবশ বা তৌবশস নামক গোষ্ঠী নামের যোগ যেমন প্রামাণিত তেমনি পাঞ্চাল দাভ্যর সঙ্গে কেশী হল গোষ্ঠী–নাম। অন্যদিকে গোষ্ঠীনাম হিসেবে সৃঞ্জয় এতই বিখ্যাত যে, অন্তত চার–পাঁচজন পাঞ্চাল রাজার নামের সঙ্গে সৃঞ্জয় শব্দটা বৈদিক কালেই যুক্ত হয়ে গেছে, যেমন দৈবরাত সৃঞ্জয়, প্রস্তোক সৃঞ্জয়, সৃঞ্জয় বীতহব্য অথবা সৃঞ্জয় সহদেব। বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে সহদেব সৃঞ্জয়ের পুত্র হলেন সোমক। তিনি বোধহয় নতুন একটি গোষ্ঠী প্রবর্তন করেন এবং তাঁরই নামে সোমক সাহদেব্যর নাম পাই আমরা।
