ঠিক এই সময়েই ক্রীড়াভূমির একান্তে সেই ব্রাহ্মণের ওপর বালকদের নজর পড়ল–সেই শ্যামবর্ণ, ছিপছিপে চেহারার পাকাচুলো ব্রাহ্মণ। তিনি দৈনন্দিন অগ্নিহোত্রের অগ্নি আধান করে হোম করতে বসেছেন। ব্রাহ্মণের সামনেই বালকদের বহুক্ষণের আয়াস চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় তারা। খানিকটা অপ্রতিভ হয়েই ছিল। ইংরেজিতে যাকে ক্রেস্ট ফলন বলে সেইরকম আর কি। ব্রাহ্মণও এতক্ষণ বালকদের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন এবং মজাও পাচ্ছিলেন প্রচুর। ফলত ব্রাহ্মণের দিকে তাকানো মাত্রই বালকরা নিজেদের লজ্জা লঘু করে দেখানোর জন্য ব্রাহ্মণের চারদিকে ঘিরে দাঁড়াল–ব্রাহ্মণং পৰ্য্যবারয়।
বালকদের খেলার আগ্রহ তখনও ফুরিয়ে যায়নি। ব্রাহ্মণ সেটা বুঝলেনও। তারপর একটু লজ্জা দিয়েই বললেন–ধিক্ তোমাদের ক্ষত্রিয়ের শক্তিতে, অস্ত্রশিক্ষাও তোমাদের তেমনই হয়েছে। প্রসিদ্ধ ভরতবংশে জন্মে একটা কুয়ো থেকে যারা বল তুলতে পারে না, তারা আবার ক্ষত্রিয়? ভরতস্যান্বয়ে জাতা যে বীটাং নাধিগচ্ছত। তোমরা দেখ–আমার হাতের আঙুলে এই ক্ষুদ্র আংটিটা দেখছো তো? আমি এটাকেও এই কুয়োর মধ্যে ফেলে দিচ্ছি, আর তোমাদের বলটি তো রয়েইছে। আমি নল-খাগড়া দিয়ে শর বানিয়ে সেই শরের সাহায্যে তোমাদের বল এবং আমার আংটি দুটোই তুলে আনব। কিন্তু তার বদলে একটাই শর্ত আছে বাছারা। আজকের সন্ধ্যার খাবারটা কিন্তু তোমাদের ব্যবস্থা করতে হবে–উদ্ধরেয়মীযিকাভি ভোজনং মে প্রদীয়তা। কথাটা বলেই ব্রাহ্মণ কুয়োর মধ্যে নিজের আংটিটি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন–কূপে নিরুদকে তস্মিয়পাতয় অরিন্দমঃ।
ভ্রাতৃজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠির জানতেন যে এই ব্রাহ্মণ কৃপাচার্যের বাড়িতে এসে উঠেছেন। কিন্তু এতদিন তাকে কেউ দেখেননি। আজকে ব্রাহ্মণভোজনের শর্ত শুনেই তিনি বললেন–কৃপাচার্য একবার বললে এক বেলা কেন, আপনি চিরকালের অন্ন পাবেন রাজবাড়িতে। ব্রাহ্মণ হাসলেন। হেসে নল-খাগড়ার শরগুলি দেখিয়ে বালকদের বললেন–আমি একটি শর দিয়ে তোমাদের বলটিকে বিদ্ধ করব। তারপর সেই শরের পিছনে আরেকটি শর, তারপর আরেকটি, তারপর আরও একটি। এমনি করে শারের পরম্পরা আমার নাগাল পর্যন্ত এলেই তোমাদের খেলার বস্তুটি ওপরে উঠে আসবে–তামন্যয়া সমাযোগে বীটায়া গ্রহণং মম।
সেকালের দিনে যারা গ্রাম বাংলায় থাকতেন, তাদের খাগের কলমে লেখা অভ্যাস ছিল। সত্যকথা বলতে কী–খাগের দণ্ড দিয়ে ব্রাহ্মণের লেখনী এবং ক্ষত্রিয়ের বাণচালনা–দুটোই প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন হত। এই ব্রাহ্মণ একাধারে ব্রাহ্মণও বটে ক্ষত্রিয়ও বটে। তিনি যেমন যেমন বলেছিলেন ঠিক সেই সেই ভাবেই নল-খাগড়ার বাণের পর বাণ যোজনা করে বলটি ওপরে তুলে আনলেন। বালকদের চোখ একেবারে ছানাবড়া হয়ে গেল। তারা ভাবল–বলটা তোলা গেছে বটে কিন্তু ক্ষুদ্র আংটিটি তোলা অত সহজ হবে না। তারা বললেন–এবার আংটিটি তুলে আনুন দেখি–মুদ্রিকামপি বিপ্রর্ষে শীঘ্রমেং সমুদ্ধর।
ব্রাহ্মণ তো সেই ক্ষমতা দেখানোর জন্য আগেই আংটি ফেলে দিয়েছিলেন। এবারে বিস্মিত বালকদের আরও বিস্ময়াপন্ন করে দিয়ে আংটিটিও বাণের মুখে বিধিয়ে তুলে আনলেন ওপরে। বালকরা ব্রাহ্মণের অসাধারণ ক্ষমতা দেখে অবাক হয়ে বললেন, আমাদের সকলের অভিবাদন গ্রহণ করুন–অভিবন্দামহে ব্রহ্ম। আপনি যা করে দেখালেন, পৃথিবীতে কারও এই ক্ষমতা হবে না। এখন আপনি বলুন–আপনি কে? কোত্থেকে এসেছেন এবং আমরাই বা আপনার কী করতে পারি–কোসি ক্যাসি জানীমো বয়ং কিং করবামহে?
বালকদের প্রশ্ন শুনে ব্রাহ্মণ বললেন–তোমাদের এত কিছু জানতে হবে না বাছা। তোমরা শুধু আমার চেহারাটা এবং আমি যা করে দেখালাম, সেই ক্ষমতার কথাটা মহামতি ভীষ্মের কাছে গিয়ে বলো। তারপর কী করতে হবে তিনিই বুঝবেন–স এব সুমহাতেজা সাম্প্রং প্রতিপৎস্যতে। আমরা আগে জানিয়েছি–ভীষ্ম কুমারদের জন্য উপযুক্ত অস্ত্র ওরুর অন্বেষণ করছিলেন। তিনি এই ব্রাহ্মণকে চিনতেন। কৃপাচার্যের বোন কৃপীর স্বামী তিনি। অতএব তাকে চেনাটাই ভীষ্মের পক্ষে স্বাভাবিক। এবং হয়তো তাকেই তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। কিন্তু যে বসতিতে এই ব্রাহ্মণ থাকতেন, এখন তিনি সেখানে থাকেন না। হঠাৎ যে তিনি হস্তিনানগরীতে কৃপাচার্যের বাড়িতে এসেই উঠেছেন, তাও তিনি জানতেন না। এই ব্রাহ্মণ কৃপাচার্যের মুখেই ভীষ্মের অন্বেষণের বৃত্তান্ত শুনে থাকবেন। পারস্পরিক যোগাযোগের এই ছিল উপযুক্ত দিন। বহিরাগত ব্রাহ্মণ বড় নাটকীয়ভাবে হস্তিনাপুরের রাজনীতির মঞ্চে প্রবেশ করলেন। বালকরা যখন গিয়ে ভীষ্মের কাছে ব্রাহ্মণের আকৃতি প্রকৃতি এবং অস্ত্রবিদ্যার মাহাত্ম্য বর্ণনা করলেন, ভীষ্মের তখন এক মুহূর্তও লাগল না ব্রাহ্মণকে চিনতে। তিনি বুঝলেন–মহামতি দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরে এসেছেন।
.
৯৭.
পাণ্ডব-কৌরবরা ভীষ্মের কাছে দ্রোণাচার্যের প্রশংসা এবং আকৃতি-প্রকৃতি বর্ণনা করার সঙ্গে-সঙ্গেই তিনি বুঝে গেলেন যে, দ্রোণাচার্য হস্তিনাপুরে উপস্থিত হয়েছেন। ভীষ্ম জানতেন যে, বালকদের অস্ত্র শিক্ষার ব্যাপারে দ্রোণাচার্যের চেয়ে ভাল অস্ত্রগুরু আর কেউ হতে পারে না। অতএব সঙ্গে সঙ্গে তিনি লোক পাঠিয়ে দ্রোণাচার্যকে ডেকে আনলেন নিজের কাছে। অনেক আদর এবং সম্মান করে তিনি দ্রোণাচার্যকে হস্তিনাপুরে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। দ্রোণাচার্য যা উত্তর দিলেন তার বিস্তারে আমরা এখনই যেতে চাই না। শুধু সংক্ষেপে জানাই–দ্রোণাচার্য পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও পাঞ্চাল ছেড়ে তিনি হস্তিনাপুরে এসেছেন এবং তা অবশ্যই দ্রুপদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে। ভীষ্মকে তিনি সে সব কথা জানাতে কুণ্ঠিত হননি। কিন্তু হস্তিনাপুরের পাশের রাজ্য পাঞ্চাল থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে চলে আসা সত্ত্বেও মহামতি ভীষ্ম তাকে যে হস্তিনাপুরে থাকার জন্য অনেক যত্ন–আত্তি করলেন, তার পিছনে অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে বলে আমরা মনে করি।
