ভাগবত পুরাণে দেখা যাচ্ছে–অমৃত মন্থনের প্রস্তাব করেই প্রভু নারায়ণ দেবতাদের। পরামর্শ দিলেন–যাও তোমরা আপাতত শুক্রাচার্যের শিষ্য অসুরদের সঙ্গে সমস্ত ঝগড়া। মিটমাট করে নাও। মিটমাট করে ততদিন সামলে থাক, যতদিন না অমৃত ওঠে-যাও-দানব দৈতেয়ৈঃ তাবৎ সন্ধি বিধীয়তাম। যারা মেরে-কেটে পালিয়ে গেল, তাদের সঙ্গে সন্ধি? দেবতাদের মনে লজ্জা দ্বিধা দুই-ই হল। প্রভু নারায়ণ দেবতাদের অন্তর বুঝে বললেন বাপু হে! দরকার পড়লে শত্রুর সঙ্গেও মিটমাট করে কাজ গুছিয়ে নিতে হয়–অরয়োপি সন্ধেয়াঃ সতি কার্যার্থে গৌরবে। তারপর? তারপর সাপ আর ইঁদুরের গল্প। একই আধারে এক বস্তার মধ্যে সাপ আর ইঁদুর আটকা পড়েছে। এবার সেই আবদ্ধ স্থান থেকে পথ বার করবার জন্য সাপ প্রথমে ইঁদুরের সঙ্গে সন্ধি করে। তারপর যখন পথ তৈরি হয়ে যায়, তখন খাদ্য-খাদক সম্পর্ক। সময়ে মূষিক সাপের পেটে যায়– অহি মূষিকবদদেবা হ্যর্থস্য পদবীং গতৈঃ। অর্থাৎ অমৃত ওঠা পর্যন্ত ভাব করবে অসুরদের সঙ্গে। তারপর দেখা যাবে।
বিষ্ণু পুরাণের মতো প্রাচীন পুরাণ এসব কথা না বললেও সমুদ্র মন্থনে অসুরদের প্রয়োজনটা বুঝিয়ে দিয়েছে। প্রভু নারায়ণ বুঝতে পেরেছিলেন–সমুদ্র মন্থন করতে যে। অসম্ভব শক্তি লাগবে সেই অসম্ভব শক্তির জোগান দেওয়া একা দেবতাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নারায়ণ তাই বলেছিলেন-তোমরা সাহায্যের জন্য অসুরদের কাছে যাও, কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলবে মিষ্টি করে। বলবে– সমুদ্র মন্থন করে অমৃত উঠলে আমরা-তোমরা দু’পক্ষই সমান ভাগ পাব। অমৃত পান করে তোমরাও যেমন বলশালী হবে, তেমনই আমরাও বল লাভ করব– তৎপনাৎ বলিনো যুয়মমরা ভবিষ্যথ। নারায়ণ এবার পরিষ্কার করেই বলে দিলেন যে, দেব-দানবের দ্বৈত সাধনায় শেষ পর্যন্ত অমৃত যখন উঠবে, তখন তিনি এমন ব্যবস্থা করবেন–তথা চাহং করিষ্যামি–যাতে দেবদ্বেষী অসুরেরা অমৃতের ভাগ একটুও না পায় এবং দেবতারাই পান সবটা। ভাগবত পুরাণ নারায়ণের জবানীতে বলেছে–শুধু কষ্ট করবে দৈত্যরা, কিন্তু ফল পাবে তোমরাক্লেশভাজো ভবিষ্যন্তি দৈত্য যুয়ং ফলগ্রহাঃ।
এইরকম মারাত্মক এক পরিকল্পনার পর স্বাভাবিকভাবেই দৈত্য-দানবদের সঙ্গে দেবতাদের সাময়িক সন্ধি হল। কিন্তু সন্ধির প্রস্তাবটা কোন দৈত্যরাজ মেনে নিলেন, সে প্রসঙ্গে মহাভারত যেমন নীরব, অধিকাংশ পুরাণও তেমনই নীরব। শুধু মৎস্য পুরাণ, ভাগবত পুরাণের মতো দু-একটি পুরাণ এব্যাপারে ঐতিহাসিকের কর্তব্য সেরে বলছে যে–দেবতারা পুরুষোত্তম বিষ্ণুর সঙ্গে পরামর্শ সেরেই চলে গেলেন দৈত্যরাজ বলির কাছে উপেয়ুবলিং সুরাঃ। মৎস্য পুরাণে এতটাই বলা হয়েছে যে, দেবতারা যেন অন্তত কিছুকাল দৈত্যরাজ বলিকেই নিজেদের প্রভু বা স্বামী বলে মানেন-দানবেন্দ্রা বলিঃ স্বামী স্তোককালং নিবেশ্যতাম্। অসুর দৈত্যদের তখন এমনই দেব বিদ্বেষ ছিল যে, দেবতাদের দেখলেই তারা যুদ্ধোদ্যোগ শুরু করে দিতেন। অতএব হঠাৎ করে অনেকগুলি দেবতাকে একসঙ্গে আসতে দেখেই তারা অস্ত্র হাতে সজ্জিত হলেন। দেবতাদের হাতে কোনও অস্ত্র ছিল না, অতএব নিরস্ত্র অবস্থায় তাদের প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করাটা যে নিতান্ত অন্যায় হবে, সে সম্বন্ধে আর কেউ না থোক, অন্তত দৈত্যরাজ বলি অবহিত ছিলেন।
মহারাজ বলি খুব কম লোক নন। বলির জন্ম এমনই এক বিখ্যাত বংশে, যে বংশে পরপর। কয়েকজন অসুর রাজা পরম বিখ্যাত হয়েছেন এবং তা এতটাই যে পরমেশ্বর বিষ্ণুকে অন্তত দু-তিনটি অবতার গ্রহণ করতে হয় অত্যন্ত কম সময়ের মধ্যে। তাছাড়া বলি মহারাজের ঠাকুরদাদা হলেন স্বয়ং প্রহ্লাদ।
আমাদের ধারণা দৈত্যকুলে এই প্রহ্লাদের পর থেকেই অসুরদের মধ্যে অন্তত অসুর রাজাদের মধ্যে অন্য ধরনের কিছু মূল্যবোধ তৈরি হয়। ফলে অসুরেরা দেবতাদের দেখে অস্ত্র হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দৈত্যরাজ বলি তাদের নিষেধ করেন- নষেধ দৈত্যরা শ্লোক্যঃ সন্ধিবিগ্রহকালবিৎ। নিষেধ করেন, কেন না তিনি অশেষ কীর্তিমান (পুরাণের ভাষায় ‘শ্লোক্যঃ’) এবং কখন কার সঙ্গে সন্ধি করতে হবে অথবা কার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে, সেটা তিনি ভালমতই জানেন। অন্তত এখন এই অসহায় নিরস্ত্র দেবতাদের ওপর অস্ত্রক্ষেপণ যে তার মতো বড় মানুষকে মানায় না এটা তিনি বোঝেন।
মৎস্য পুরাণ যেমন বলছে, তাতে দেবতারাও দৈত্যরাজ বলির কাছে কাছে প্রার্থনা জানাবার সময় যথেষ্ট নত হয়েই কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন আমরা তোমার সঙ্গে কোনও বিরোধ চাই না, দৈত্যরাজ। আমরা তোমার কথাতেই চলব আমরা তোমার ভৃত্য–অলং বিরোধেন বয়ং ভৃত্যাস্তব বলে’ধুনা। চল, আমরা এই মহাসমুদ্র মন্থন করে অমৃত লাভ করি। বস্তুত তোমার দয়াতেই এই অমৃত লাভ সম্ভব হবে- ত্বপ্রসাদা সংশয়ঃ। হাজার হলেও প্রহ্লাদের। নাতি। বলি সঙ্গে সঙ্গে রাজিই শুধু হলেন না, দেবতাদের আপাত স্তুতি স্তাবকতায় তিনি এতই খুশি হলেন যে তাদের অভয় দিয়ে বললেন- আমি একাই এই সমুদ্র মন্থন করে তোমাদের অমৃত এনে দিতে পারতাম-শক্তো’হমেক এবাত্র মথিতুং ক্ষীরবারিধি। আরে! দূর থেকে এসে যদি শত্রুও প্রণত হয়ে আশ্রয় ভিক্ষা করে, তবে তার ব্যবস্থা না করলে পরলোকে যে আমার ঠাই হবে না কোনও।তা যাক গে, তোমরা যা বলছ, আমি তোমাদের প্রতি স্নেহবশত নিশ্চয়ই তা পালন করব –পালয়িষ্যামি তৎ সর্বান্ অধুনা স্নেহমাস্থিতঃ।
