মহারাজ শান্তনু একটি দেশের রাজা! অরক্ষিত মানুষের জন্য তার মায়া থাকাই স্বাভাবিক। তিনি অন্তরের সমস্ত স্নেহ উজাড় করে দিয়ে পরিত্যক্ত শিশু দুটিকে কোলে তুলে নিলেন এবং বললেন–এরাই আমার ছেলে-মেয়ে–মম পুত্ৰাবিতি ব্রুবন্। অনাথ ছেলে-মেয়ে দুটিকে নিয়ে শান্তনু সোজা হস্তিনাপুরে ফিরলেন। পরমাদরে তাদের জাতকর্মাদি ক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের নামকরণও করলেন শান্তনুই। ছেলেটির নাম হল কৃপ, মেয়ের নাম কৃপী। মহাভারতের কবি লিখেছেন–এক সময়ে শরদ্বানও ধ্যানযোগে জানতে পারলেন যে, তার ঔরসজাত পুত্র-কন্যা দুটি শান্তনুর রাজবাড়িতে মানুষ হচ্ছে। আমরা মনে ক–এই ধ্যানযোগের মধ্যেই আসল সত্যটি লুকিয়ে আছে। শরদ্বান জানপদী স্ববেশ্যার মোহে এতটাই তখন মুগ্ধ ছিলেন যে, তার আপন পুত্র-কন্যাকে জানপদী যেভাবে পরিত্যাগ করেছিল তা তার অজ্ঞাতই ছিল। পরবর্তী সময়ে নানা জিজ্ঞাসাবাদ করে শরদ্বান বুঝতে পারেন যে, তার যমজ পুত্র-কন্যা পরিত্যক্ত হয়েছে এবং হয়তো এটাও তিনি খোঁজ পেয়ে যান যে, মহারাজ শান্তনুর গৃহে তারা মানুষও হাছ
আমরা মনে করি এই সম্পূর্ণ অন্বেষণ প্রক্রিয়াই শরদ্বানের ধ্যানযোগ। পুত্র-কন্যা দুটির জন্য তিনি দায়িত্ববোধ এড়িয়ে গেলেন না। সমস্ত ঘটনা জানবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হস্তিনাপুরে পৌঁছলেন মহারাজ শান্তনুর কাছে। এখানে তার প্রয়োজন ছিল একটাই। এই শিশু পুত্র-কন্যা দুটি যে নাম-গোত্রহীন কোনও জারজ সন্তান নয়–সেটা বলার জন্যই তিনি শান্তনুর কাছে উপস্থিত হলেন–আগত তস্মৈ গোত্রাদি সবখ্যাতবাংঔদা। পিতার মতো কৃপও বেদবিদ্যার নিগূঢ় তত্ত্বান্বেষণ বাদ দিয়ে ধনুর্বিদ্যায় আসক্ত হলেন। পিতা শরদ্বানও পুত্রের মতিগতি দেখে তার নিজের জানা সমস্ত অস্ত্র–রহস্য কৃপকে শিখিয়ে দিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই কৃপাচার্য ধনুর্বেদ-শিক্ষার অন্যতম আচার্য হয়ে উঠলেন। হস্তিনাপুরের রাজবাড়ি ছেড়ে তিনি আর কোথাও যাননি। মহারাজ শান্তনু নিজের হাতে তাঁকে রাজবাড়িতে তুলে নিয়ে এসে মানুষ করেছিলেন বলে পরবর্তী বংশজরা–সে তিনি ভীষ্মই হোন অথবা বিচিত্রবীর্য, তিনি ধৃতরাষ্ট্রই হোন অথবা পাণ্ডু–কেউ তার মর্যাদা অতিক্রম করেননি।
কুরুবাড়িতেই কৃপাচার্যের অস্ত্রশিক্ষার পাঠশালা ছিল। সেখানে ধৃতরাষ্ট্রের ইচ্ছায় পাণ্ডব-কৌরবরা যেমন অস্ত্রশিক্ষা করতেন, তেমনই অন্যান্য জায়গা থেকেও কৃপাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করতে আসতেন রাজপুত্রেরা–নৃপাশ্চান্যে নানাদেশ-সমাগতাঃ। কৃপাচার্যের কাছে কৌরব-পাণ্ডবদের অস্ত্রশিক্ষার হাতেখড়ি হওয়ার সঙ্গে অস্ত্রশিক্ষায় তাদের একটা উৎসাহ এল। ধৃতরাষ্ট্রও এইটাই হয়তো চেয়েছিলেন। কিন্তু কৃপাচার্যের প্রশিক্ষণ যে কাউকে ভারতবিখ্যাত ধানুল্কে পরিণত করবে না, এটা সবচেয়ে ভাল বুঝতেন মহামতি ভীষ্ম। তিনি তার এবং তার পরবর্তী সময়েরও অদ্বিতীয় যুদ্ধবীর বলেই এই তত্ত্বটা বুঝতেন যে, ভাল বীর তৈরি করতে হলে উত্তম গুরুর কাছে তার প্রশিক্ষণ দরকার। কেননা ভীষ্মের মতে–যিনি নিজে মহাবুদ্ধিমান নন, যিনি উপারস্বভাব নন এবং নানা যুদ্ধের অস্ত্রকৌশলে যিনি অভিজ্ঞ নন, তিনি কখনও কুরুবালকদের শিক্ষা দেবার উপযুক্ত হতে পারেন না–নাদেবসত্ত্বো বিনয়েৎ কুরুণস্ত্রে মহাবলান।
আসলে কৃপাচার্য কতটা শিক্ষা দিতে পারেন, গাঙ্গেয় ভীষ্ম সেটা বুঝতেন। বহুদিনের পরিচয় থাকার ফলেই সেটা আরও তার কাছে প্রকট হয়ে গিয়েছিল। তাছাড়া তাঁর পরমপ্রিয় নাতিগুলির মধ্যে দু একজন যে অস্ত্রবিদ্যায় পরম কুশলী হয়ে উঠতে পারেন, বহুদিনের অভিজ্ঞতায় সেটাও ভীষ্ম বুঝতেন। আর বুঝতেন বলেই একজন উপযুক্ত অস্ত্রগুরুর অন্বেষণে আগ্রহান্বিত ছিলেন ভীষ্ম। যোগাযোগটা ঘটে গেল অদ্ভুতভাবেই।
কৃপাচার্যের বাড়িতে এক ব্রাহ্মণ এসে বাস করছেন। বেশ কয়েকদিন হয়ে গেল। তিনি বাইরে বেশি বেরন না, কেউ তাকে চেনেও না ভাল করে। ব্রাহ্মণের গায়ের রঙ কালো, মাথায় পাকা চুল। শরীরটি চাবুকের মতো ছিপছিপে–শ্যাম আপন্নপলিতং কৃশ। এই ব্রাহ্মণের একটি ছেলে আছে, ছেলেটির সঙ্গে পাণ্ডব-ভাইদের বেশ ভাব হয়েছে। কৃপাচার্যের কাছে পাণ্ডব-কৌরবদের একত্র শিক্ষা শেষ হয়ে গেলে কৌরবভাইরা বাড়ি চলে যান। কিন্তু কুন্তীর ছেলেরা রাজনৈতিক এবং পারিবারিকভাবে খানিকটা কোণঠাসা অবস্থায় আছেন বলেই তাদের অস্ত্রশিক্ষার আকাক্ষা প্রবল। তারা সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে যান না। তারা লক্ষ্য করেন–আগন্তুক ব্রাহ্মণের ছেলেটি বেশ। বয়সে তাদের চেয়ে সামান্য বড় হবেন হয়তো। কিন্তু এরই মধ্যে অস্ত্রবিদ্যার বেশ কিছু বিশেষ পাঠ তিনি রপ্ত করে ফেলেছেন। কৃপাচার্যের কাছে অস্ত্রশিক্ষার পর এই ব্রাহ্মণ পুত্রটি কুন্তীপুত্রদের কাছে নিজের অস্ত্রবিদ্যার কেরামতি দেখান, কিছু কিছু অস্ত্রপাঠ তিনি কুন্তীপুত্রদের শিখিয়েও দেন– অস্ত্রাণি শিক্ষয়ামাস কৃপস্যানন্তরং প্রভু। পাণ্ডুপুত্ররা তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন–তিনি কৃপাচার্যের ভাগনে। তিনি পিতা-মাতার সঙ্গে কৃপাচার্যের বাড়িতে এসেছেন কিছুকাল।
কিন্তু এই পিতাটিকে বাইরে আসতে দেখা যায় না কখনও–এবং স তত্র গঢ়াত্মা কঞ্চিৎ কালমুবাস হ। কিন্তু সেদিন হঠাৎই একটা ঘটনা ঘটে গেল। কুরুবাড়ির সমস্ত বালকেরা কাপড়-চোপড় গুটলি করে একটি খেলার বল বানিয়েছেন। সেই বলটি নিয়ে খেলার ধুম পড়ে গেল সকলের মধ্যে, নগরীর একান্তে গিয়ে ভোলা মাঠে তাদের বল খেলা শুরু হল। কিন্তু কোনও এক সময় বলটি গড়াতে গড়াতে একটি মজা কুয়োর মধ্যে গিয়ে পড়ল। ক্রীড়ামত্ত বালকরা বলটা ভোলার জন্য অনেক চেষ্টা করলেন–ততন্তে যত্নমাতিষ্ঠ বীটামুদ্ধর্তুমাদৃতাঃ কিন্তু কুয়োটা মজে গেলেও যথেষ্ট গভীর। বালকরা তাদের ক্রীড়াগুটিকা উদ্ধার করতে পারল না। এ ওর মুখের দিকে তাকায়, সে তার মুখের দিকে। খেলার উন্মত্ততা এবং ঘোর তখনও মোটেই কাটেনি, কাজেই বলটি তোলার জন্য তাদের আগ্রহের কোনও খামতি হল না–ততোন্যোন্যমবৈশান্ত ভূশঞ্চোকণ্ঠিতাভবন।
