মহর্ষি গৌতমের শরদ্বান নামে একটি পুত্র ছিল। ব্রাহ্মণের ছেলে, ঋষির ছেলে হওয়া সত্ত্বেও বেদ-অধ্যয়ন, পঠন-পাঠন, যজন-যাজনে তাঁর মন লাগত না। কিন্তু ক্ষত্রিয়ের শরাসন তার বড় প্রিয় ছিল। বেদবিদ্যায় যতটাই তার বুদ্ধি কম, ধনুঃশর চালনায় তার বুদ্ধি ততটাই বেশি–যথাস্য বুদ্ধিরভব ধনুর্বেদে পরন্তপ। মহাভারতের কবি এমনভাবেই তার জন্মকথা লিখেছেন যাতে অনুবাদক পণ্ডিতেরা বড় সহজে লিখেছেন যে, কতগুলি শরের সঙ্গেই তার জন্ম হয়েছিল–জাতঃ সহ শরৈ বিভো–এবং সেই জন্যই তাঁর নাম শরদ্বান। আসলে কিন্তু ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও ধনুঃশরের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিই তাকে শরদ্বান নামে বিখ্যাত করেছে। মহাভারতের টীকাকারও এ কথা অবিশ্বাস করেন না সেই কারণে টীকাকার নীলকণ্ঠ লিখেছেন–ধনুঃশরগুলি তার বন্ধুর মতো প্রিয় ছিল বলেই–শরা এব বা অস্য বন্ধুবৎ প্রিয়াঃ–এমন কথা বলা হয়েছে যে, তিনি শরের সঙ্গেই জন্মেছিলেন।
শরদ্বানের সতীর্থ বন্ধুরা যখন তপশ্চর্যার সঙ্গে বেদ অধ্যয়ন করছেন, তখন শরদ্বানও তপশ্চর্যা করছেন, তবে সে তপশ্চর্যা অস্ত্রশিক্ষা। তার ধনুর্বেদের ক্ষমতা একদিন দেবরাজ ইন্দ্রকেও চিন্তিত করে তুলল। দেবরাজ তখন জানপদী নামে এক অপ্সরাকে পাঠালেন যাতে শরদ্বানের শরচর্চা বিঘ্নিত হয়।
কথাটা আমরা এত আক্ষরিক অর্থে বিশ্বাস করতে চাই না। বস্তুত ইন্দ্র এখানে একটা রূপক মাত্র। শরদ্বানের অস্ত্রচর্চায় কোনও ক্ষত্রিয় রাজাই হয়তো চিন্তিত হয়েছিলেন এবং ভূতলবাসী রাজাকে অনেক সময়েই ইন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তাছাড়া স্বর্গের বজ্রধারী দেবরাজ মানুষের অস্ত্রচর্চায় কখনও চিন্তিত হয়েছেন শুনিনি। তিনি ব্রাহ্মণ মুনি-ঋষির তপশ্চর্যাতেই বেশি চিন্তিত হন। আরও একটা কথা এই অঙ্গরার নাম জানপদী। মহাভারতের অঙ্গরাকুলের তালিকায় জানপদীকে তেমন করে কোথাও পাই না। আসলে জানপদী অবশ্যই পূর্বোক্ত ভীত রাজার জনপদের সাধারণী কোনও গণিকা। তাকেই পাঠানো হয়েছিল, যাতে শরদ্বানের অস্ত্রচর্চা বন্ধ হয়। চর্চা না থাকলেই শরাসনের লক্ষ্যভেদ ভ্রষ্ট হয়, অতএব এটা সেই চর্চা বিঘ্নিত করার উপায়।
জানপদী বেশ্যা একটিমাত্র বসন পরে–সে বসন শুধু অধমাঙ্গেরই আবরণ হবে বোধ করি–সেই একবসনে শরদ্বানের কাছে এসে হাবেভাবে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করে তুলল– ধনুর্বাণধরং বাল লোভয়ামাস গৌতমম্। শরদ্বানও তো মানুষ। একাকী একান্তে আসা একবসনা সুন্দরীকে দেখার পর তামেক বসনাং দৃষ্ট্ৰা-শরদ্বানের চক্ষু দুটি একেবারে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। অত সাধের ধনুকবাণ তার হাত থেকে অমনিই পড়ে গেল মাটিতে–করাভ্যাম অপদ ভুবি। শরদ্বান আর স্থির থাকতে পারলেন না তিনি তাঁর অন্তরস্থায়ী সংযমের চেষ্টায় নিজের চিত্তবৃত্তি নিরুদ্ধ করার চেষ্টা করলেন বটে, কিন্তু তার শরীর-প্রকৃতি মানল না। সবিকারী শরীর আপন শক্তিক্ষয় ঘটিয়ে মুগ্ধতার মূল্য দিল। তার তেজঃবিন্দু পতিত হল একটি শর-তৃণের ওপর। তৃণের কুশাগ্রভাগে বিন্দুটি দ্বিখণ্ডিত হওয়ায় দুটি পুত্র-কন্যা জন্মাল। শরদ্বান সে কথা জানতেও পারলেন না। তিনি ধনুক-বাণ এবং পরনের কৃঞ্চাজিন ফেলে তথাকথিত জনপদী অপ্সরার পিছনে দৌড়লেন, হাবভাব-লীলায়িত রমণীকে ধরবেন বলে–ধনুশ্চ সশরং তত্ত্বা তথা কৃষ্ণাজিনানি চ।
পুত্র-কন্যা দুটি নল-খাগড়ার বনে শরতৃণের শয্যায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রইল। আমাদের বুদ্ধিতে যা বলে–তাতে এই তেজঃবিন্দুক্ষরণ এবং শরস্তম্বে সেই বীর্যবিন্দুর দ্বিবাভি হওয়ার ঘটনায় না বিশ্বাস করলেও চলে। সোজা কথায় শদ্বান সেই একস রমণীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন এবং তার গর্ভাধানও করেছিলেন। কিন্তু জনপদ বেশ্যার চরিত্র যেমন হয়, পুত্র-কন্যা হবার পর সেগুলিকে অস্থানে ত্যাগ করে আসাটাই তার সাধারণ স্বভাব। অতএব ওই নলখাগড়ার বনে শরদ্বানের ঔরসজাত যমজ পুত্র-কন্যাকে ফেলে দিয়ে জানপদী ভারমুক্ত হল। হয়তো এ ঘটনা ঘটেছে শরদ্বানের অজ্ঞাতসারে অথবা তিনি জানতেনই না যে ও দুটি তারই পুত্রকন্যা। কারণ যে ব্যক্তি এক জনপদী রমণীর জন্য তাঁর পরম প্রিয় ধনুকবাণ ত্যাগ করে পিতার আশ্রম ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেতে পারেন–স বিহায়াশ্রমং তঞ্চ তাগৈরসং মুনিঃ–তার কি ওই পুত্রকন্যার দিকে নজর থাকবে? বস্তুত পুরাকালে বিশ্বামিত্র এবং মেনকার মিলনে যেমন শকুন্তলার জন্ম হয়েছিল এবং মেনকা যেভাবে শকুন্তলাকে ফেলে রেখে পালিয়েছিলেন, এখানেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে।
যাই হোক ওদিকে ভরতবংশের গৌরব মহারাজ শান্তনু সৈন্য সামন্ত নিয়ে ওই সময়েই মৃগয়ায় এসেছেন। মৃগয়াব্যসনী রাজার আদেশে তার সৈন্যরা বন্য পশুর গতিবিধি লক্ষ্য করে ইতস্তত বিচরণ করছিল। হঠাৎই রাজার এক সৈন্য সেই শরবনের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় পরিত্যক্ত শিশু দুটিকে দেখতে পেল এবং সঙ্গে সঙ্গে খবর দিল মহারাজ শান্তনুকে। শান্তনু এসে দেখলেন–দুটি সদ্যোজাত শিশু শরবনের একান্তে পড়ে আছে। শিশুদুটির সম্ভাব্য বৃত্তান্ত কী হতে পারে, এটা ভাবতে ভাবতেই শান্তনু দেখলেন একটি ধনুকবাণ এবং একখানি কৃষ্ণাজিন পড়ে আছে শিশু দুটির কাছাকাছি এক জায়গায়। শান্তনু তাঁর রাজোচিত ভাবনায় ধারণা করলেন যে, ওই যমজ পুত্রকন্যা এমন এক ব্রাহ্মণের ঔরসজাত, যিনি বেদবিদ্যার পরিবর্তে ধনুকবাণের নৈপুণ্য অর্জন করেছেন–জ্ঞাত্বা দ্বিজস্য চাপত্যে ধনুর্বের্দান্তগস্য চ।
