অশেষ বুদ্ধিমত্তায় যুধিষ্ঠির দুর্যোধনের তৎকালীন ক্রোধ বেড়ে ওঠার সুযোগ দিলেন না, বরঞ্চ অনুতাপের সুযোগ দিলেন। বাস্তবেও যা ঘটল, দুর্যোধন পুনরাগত ভীমকে দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন বারবার এবং সব সময় চিন্তাকুল হয়ে মনে মনে শুধু বিদ্বেষের উত্তাপ ভোগ করতে লাগলেন প্রতি পলে–নিশ্বসংশ্চিন্তয়ংশ্চৈবম্ অহনহনি তপতে। অন্যদিকে পাণ্ডবরা পরিষ্কার বুঝলেন–তারা রাজবাড়ির বিরুদ্ধ কক্ষে বাস করছেন। তারা পিতার রাজ্যে আশ্রয় পেয়েছেন বটে, তবে সে আশ্রয় মাত্র। কার্যনির্বাহী রাজা ধৃতরাষ্ট্রের প্রশ্রয়পুষ্ট দুর্যোধন এক পা বাড়িয়ে রয়েছেন রাজসিংহাসনের দিকে। আর পাণ্ডবরা নিজগৃহে পরবাসী হয়ে রইলেন ভাগ্যের বিড়ম্বনায়।
.
৯৬.
কৌরব-পাণ্ডবদের যেভাবে দিন কাটছিল, সেকালের দিনের অধিকাংশ রাজবাড়িতে এভাবে তাদের দিন কাটত না। একেক জনের সতেরো-আঠারো বছর করে বয়স হয়েছে, অথচ রাজকুমারদের অস্ত্র শিক্ষার নাম নেই। ক্ষত্রিয় বাড়িতে এমনটি চলে নাকি? হ্যাঁ, বালকদের উপনয়ন-সংস্কার ইত্যাদি হয়ে যাওয়ায় কালোচিত ব্রহ্মচর্য বা বেদপাঠ–এসব তাদের পালন করতে হয়েছে বটে, কিন্তু একজন ক্ষত্রিয়, ছোটবেলা থেকেই যার কাজ হল রাষ্ট্রকে ক্ষতমুক্ত করা, সেই ক্ষত্রিয়ের অস্ত্রবিদ্যা তাদের কিছুই হয়নি। হস্তিনাপুরের রাজা ধৃতরাষ্ট্র রাজকুমারদের আচার–ব্যবহার এবং কাণ্ডজ্ঞান দেখে বড়ই বিব্রত হচ্ছেন। দিন-রাত রাজকুমারেরা খেলে বেড়াচ্ছেন, এতখানি বয়সেও তাদের ক্রীড়া-কৌতুক শান্ত হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই। বালকদের এই ধরনের চপলতা দেখে–কুমারা ক্রীড়মানাংস্তান্ দৃষ্ট্ৰা রাজাতিদুর্দান্ ধৃতরাষ্ট্র একদিন কৌরব-পাণ্ডব নির্বিশেষে সমস্ত ভাইদের একত্রিত করে নিয়ে গেলেন গৌতম– গুরু কৃপাচার্যের কাছে। কৃপাচার্য গৌতম-গোত্রীয় ব্রাহ্মণ, তবে ব্রাহ্মণবাচিত যজন-যাজন, অধ্যয়ন-অধ্যাপনা ত্যাগ করে ক্ষত্রিয়ের অস্ত্রবিদ্যায় তিনি মন দিয়েছিলেন বেশি। ধৃতরাষ্ট্রর চেয়ে তিনি বয়সে অনেক বড়। ধৃতরাষ্ট্র বালকদের নিয়ে গিয়ে কৃপাচার্যের অস্ত্র-পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন–গুরুং শিক্ষার্থমন্বিষ্য গৌতমং তান্ ন্যবেদয়ৎ।
আমাদের কথা থেকে এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, কৃপাচার্য হস্তিনাপুরের একান্তে একটি অস্ত্রশিক্ষার পাঠশালা খুলে বসেছিলেন। তিনি হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতেই থাকতেন। যদিও তিনি রাজবাড়ির আশ্রিত, তবু তার সম্মান বা মর্যাদা কিছু কম ছিল না। বস্তুত সেকালের দিনে এমনই হত। আজ থেকে পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেও এমনই হত। আমাদেরই হয়েছে। সেকালের দিনের গ্রামে-গঞ্জে এমন মানুষ অনেক ছিলেন। তারা যে সব একেকজন বিদ্যা-দিগগজ তা নয়। তবে প্রাথমিক লেখাপড়া শেখানোর কাজটা তারা এমন নিপুণভাবেই করতেন যে, তাদের শ্রদ্ধা না করে পারা যেত না। গ্রামের একেকটি বাড়িতে এইরকম বিদ্যাব্যসনী ব্যক্তির দেখা মিলত, যার কাছে গ্রামের অনেক পিতাঠাকুরই তাদের ছেলে, ভাইপো ইত্যাদির গুষ্টি নিয়ে একদিন হাজির হতেন এবং বলতেন–কত্তা, এই ছেলেগুলিকে আপনার হাতে তুলে দিলাম। আপনি দেখবেন। গুরুমশাই যে সেই সব ছাত্রদের নানা পরীক্ষার জালে আবদ্ধ করে কাঁদে ফেলবার চেষ্টা করতেন তা মোটেই নয়। বস্তুত তিনি ছেলেদের ব্যাপারে দ্বিতীয়বার কথা বলতেন না। উলটে পিতাঠাকুরদের সংসার ভূ-সম্পত্তি এবং অমুকে এখন কী করছে, তমুকেই বা কী করছে (কারণ এরাও ছোটবেলায় এই গুরুঠাকুরের কাছেই পড়েছে)–এইসব পুরাতন কৌতূহল তৃপ্ত করে উপস্থিত বালকদের বলতেন–আসিস্ ক্যাল থিকা। বালকরা পরের দিন থেকে সেই বাড়ির সদস্য হয়ে যেত। কোথা থেকে তার টাকা আসত, কোথা থেকে তার সংসার নির্বাহ হত–এসব আমরা জানতাম না। শুধু জানতাম ইনি আমাদের পড়ান, ইনি আমাদের ভালবাসেন।
কৃপাচার্যও হস্তিনার রাজবাড়িতে এইরকম একজন মানুষ। তবে তফাত এই, ইনি এই রাজবাড়িতে এসেছেন অনেক আগে এবং তিনিও এই রাজবাড়িতে সদস্য হয়ে গেছেন। এখন তার মর্যাদা এতটাই যে, ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় তার ডাক পড়ে সব সময়। গৌতম-গুরু কৃপাচার্য হস্তিনার রাজবাড়িতে কী করে এলেন, সে কথা আমাদের একটু বলতে হবে। তার কারণ আমরা যে মহাভারতের ইতিহাস বলবার জন্য ব্যগ্র হয়েছি, সেই ইতিহাসের সঙ্গে দুটি বহিরাগত ব্যক্তির ভয়ঙ্কর রকমের যোগ আছে। এঁদের একজন কৃপাচার্য, অন্যজন দ্রোণাচার্য। এঁদের দুজনের সম্পর্ক আবার শালা-জামাইবাবুর। কিন্তু এই দুটি বহিরাগত ব্যক্তিই হস্তিনাপুরের রাজনীতির ক্ষেত্রে এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে এঁদের কথা আমাদের বলতেই হবে। কৌরব-পাণ্ডবদের অস্ত্রশিক্ষার ব্যাপারটা আমাদের কাহিনীর পরম্পরায় আপনিই আসবে, কিন্তু এঁদের কথা না বলে নিলে মহাভারতের রাজনীতিটাই কিছু বোঝা যাবে না।
হস্তিনাপুরে এখন যে সময় চলছে, সে সময় থেকে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে সেই মহারাজ শান্তনুর সময়ে। আপনাদের মনে আছে কি না জানি না–শান্তনুর মৃগয়া করার অভ্যাস ছিল ভীষণ। এই মৃগয়ার দৌলতেই একদিন তিনি গঙ্গার দেখা পান এবং ওই মৃগয়ার সূত্রেই সত্যবতীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। একদিন এইরকমই তিনি মৃগয়ায় গেছেন। কিন্তু সেই মৃগয়ার আগেই আরও একটা ঘটনা ঘটে গেছে।
