কুন্তী বিদুরের কাছে নিজের অসহায়তার কথা জানিয়ে আবারও ভীমের অনুসন্ধান চালিয়ে যেতে বললেন। বললেন–সকলে এক সঙ্গে মিলে বাগান-বাড়ি ছেড়ে এখানে এসেছে। কিন্তু ভীম তাদের সঙ্গেও আসেনি, আলাদা করে একাও আসেনি। তুমি এই অবশিষ্ট পাণ্ডবদের সঙ্গে নিয়ে একবার সেই বাগান বা খেলার জায়গাটায় যাবে? বিদুর পাণ্ডবদের সঙ্গে নিয়ে গেলেন সেই প্রমাণকোটিতে। অনেকবার তারা ভীমের নাম ধরে ডাকলেন, অনেক বনে তাঁরা ভীমকে খুঁজে খুঁজে বেড়ালেন। কিন্তু পেলেন না কোথাও–বিচিন্তো বনং সর্বং ন তেপশ্যন্ত তং জনাঃ।
কুন্তী এবার ভীমকে না দেখে পরিষ্কার সন্দেহ প্রকাশ করলেন দুর্যোধন সম্পর্কে। বললেন–ভীমকে দেখে দুর্যোধন কখনও খুশি হয় না। দুর্যোধন খল-স্বভাব এবং দুষ্টবুদ্ধি। লজ্জা বলে তার কিছু নেই, উপরন্তু রাজ্যের লোভ তার এতই বেশি যে, সে হয়তো কোনও কারণে ক্রুদ্ধ হয়ে ভীমকে মেরেই ফেলেছে। আমার মন তাই বলছে–নিহন্যাদপি তং বীরং জাতমনুঃ সুযোধনঃ। দুষ্টের প্রশ্রয়দাতা রাজার রাজত্বে বাড়িতে খুন হয়ে গেলেও যেমন সে খুনের কথা সোচ্চারে বলা যায় না, তাতে যেমন সেই বাড়িতেই আরও খুনের আশঙ্কা বেড়ে যায়, তেমনই আশঙ্কা করে বিদুর বললেন–এসব কথা এত জোরে উচ্চারণ করবেন না, কল্যাণী! আপনার শেষ পুত্রগুলিকে তো বাঁচাতে হবে। আপনি এইভাবে বললে লোক জানাজানি হবে তাতে ওই দুরাত্মা পরে আপনার আরও ক্ষতি করতে পারে–প্রত্যাদিষ্টো হি দুষ্টাত্মা শোনেপি প্রহরেত্তব। বিদূর সান্ত্বনা দিয়ে বললেন–আপনি এত ভাববেন না। আপনার পুত্রেরা সব দীর্ঘায়ু। ভীম ঠিক ফিরে আসবে।
বিদুর সদুপদেশ দিয়ে নিজের ঘরে গেলেন। কুন্তী আর চার ভাই পাণ্ডব উদ্বিগ্নচিত্তে ঘরে বসে রইলেন–কুন্তী চিন্তাপরা ভূত্ব সহাসীনা সুতে-গৃহে। দুদিন-তিন দিন চলে গেল। ভীম তবু ফেরেন না বাড়িতে। মহাভারতের কবি লিখেছেন–ভীম যে বাসুকির গৃহে রস পান করে ঘুমিয়েছিলেন, তার ঘুমই ভাল আট দিন পর। বস্তুত এই আটদিনের সংখ্যাটা সত্য নাও হতে পারে। তবে সময় কিছু বেশিই লেগেছে। সে সময় এতটাই যে নাগমুখ্য বাসুকি পর্যন্ত চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের ধারণা–বাসুকির নাগবসতিতে অত্যুম ভোজ্যপানীয় লাভ করে ভীম বহাল তবিয়তে ছিলেন। বাড়ি ফেরার তাড়া বা তাল-তবা কোনওটাই তার ছিল না। আসলে এইটাই তার ঘুম। এতই ভাল তার দিন কাটছিল যে, বাড়ি ফেরার কোনও কথাই তিনি বলছিলেন না।
হয়তো আটদিনের দিন ভীমের মনে হয়েছে–না, এবার ফেরা দরকার। অর্থাৎ তার চেতনা হল, ঘুম ভাঙল–ততোষ্টমে দিবসে প্রত্যবুধ্যত পাণ্ডবঃ। সাতদিন নাগবসতিতে থেকে ভীমের শরীরটাও যেমন সেরেছে, তেমনই প্রভূত নাগজাতীয় সুরাপানে তার গায়ে জোরও এসেছে যথেষ্ট। নাগেরা বলেও ফেলল–তুমি যে রসপান করেছ, তাতে তোমার গায়ে শত হাতীর বল আসবে। যুদ্ধে তোমাকে কেউ হারাতে পারবে না–রণেধৃষ্যো ভবিষ্যসি। ওদিকে বাসুকি তো বেশ ব্যস্ত হয়েই উঠলেন। তিনি সব ঘটনা শুনেছেন বলেই বুঝতে পারছেন যে, বাড়িতে ভীমকে নিয়ে কত চিন্তা হচ্ছে। অথচ ভোলাভালা ভীমের সেদিকে খেয়ালই নেই। বাসুকি তাই বলেই ফেললেন–এবার তো বাড়ি যেতে হয়, বাছা-গচ্ছাদ্য স্বগৃহং স্নাতঃ। তুমি বাড়িতে নেই, তোমার জন্য তোমার ভাইরা কত-শত চিন্তা করছে, ভাব-ভ্রাতরস্তেনুতপ্যন্তে ত্বং বিনা কুরুপুঙ্গব।
ভীম যে নাগ-মাতামহের কথা শুনে খুব বিচলিত হলেন, তা নয়। তবে এটা বুঝলেন যে, যাওয়াটা দরকার। বাসুকির কথা শুনে ভীম খুব ভাল করে স্নান করে একটি শুভ্র নাগ-বসন পরিধান করলেন। নাগেরা খুশি হয়ে তার গলায় নাগকেশরের মালা পরিয়ে দিল, গায়ে ছড়িয়ে দিল সুগন্ধ-ওষধীভি-বিষণ্ণীভি সুরভীভিৰ্বিশেষতঃ। স্নান-সুগন্ধ সবই হল, খাওয়াটাই বা বাদ যায় কেন। ভীম খুব ভাল করে খেয়ে-দেয়ে, গায়ে নাগদত্ত অলঙ্কার পরিধান করে, নাগদের কাছ থেকে খুব ঘটা করে বিদায় নিলেন। যে জায়গা থেকে ভীমকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল, নাগ জনজাতির মানুষেরা সেইখানে পৌঁছে দিল ভীমকে–সেই প্রমাণকোটিতে, সেই গঙ্গার ধারে–তস্মিন্নেব বনোদ্দেশে স্থাপিতঃ কুরুনন্দনঃ।
ভীমের এখন খুব চেতনা হয়েছে। এখন তার মার কথা মনে পড়েছে, ভাইদের কথা মনে পড়েছে। ভীম এখন ঊধ্বশ্বাসে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চললেন। কুন্তী এবং চার ভাই পাণ্ডব ধৈর্য ধরেই বসেছিলেন। ক্ষত্রিয়ের ধৈর্য। ভীম বাড়িতে এসেই মা এবং যুধিষ্ঠিরকে প্রণাম করলেন, জড়িয়ে ধরলেন ছোট ভাইদের। সবার মুখে ওই একই কথা বারবার উচ্চারিত হল–ভাগ্যে ছিল, তাই আবার দেখা হল–অন্যোন্য-গত-সৌহাদ্দা দিষ্টা দিষ্ট্যেতি চাবন্।
ভীমের আর ধৈর্য থাকল না। তিনি চিৎকার করে দুর্যোধনের অপকীর্তি সব একে একে বলতে লাগলেন। সবাই শুনতে লাগলেন বটে, কিন্তু যুধিষ্ঠির ভীমের কথার মাঝখানেই হঠাৎ একটু রাগত স্বরে বলে উঠলেন–চুপ করো, ভীম! চুপ করো। এসব কথা আর কখনও বলো না–তুষ্ণীং ভব ন তে জল্প্যমিদং কাৰ্য্যং কথঞ্চন। আজ থেকে তোমরা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করবে। এই কথা বলার সময় যুধিষ্ঠির অবশ্যই তার পিতৃব্য বিদুরের কথা স্মরণ করেছিলেন। যুধিষ্ঠির বুঝেছিলেন–ভীমের চিৎকার কৌরবভাইদের মধ্যে আগুন ছড়াবে। বিশেষত দুর্যোধনের পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেল বলে তিনি নিজের মান রাখার জন্যই পুনরায় ভীমের নিধনে অন্যতর প্রয়াস নেবেন, হয়তো সে প্রয়াস আরও কুটিল হবে। আর চুপ করে থাকলে দুর্যোধনকে বোঝানো যাবে–তুমি যা করেছ, আমরা জানি। কিন্তু তুমি আমাদের কিছুই করতে পারনি। আমরা সে শক্তি রাখি।
