নাগদের মধ্যে অত সভ্যভব্য রুচিশীলতার ধ্বজা নেই, আর আর্যদের দেবকল্প সন্তান হলেও ভীমও এই ধ্বজাধারিত্ব পছন্দ করেন না। কাজেই নাগ-জনজাতির মানুষেরা ঠিক লোক চিনেছে। বাসুকি আর কী করেন, আপন লোকদের আগ্রহাতিশয্যে ভীমকে ছেড়ে দিলেন তাঁদের সঙ্গে। রস যে নাগ-জনগোষ্ঠীর আপন হাতে তৈরি এক উৎকৃষ্ট সুরা, তাতে আর সন্দেহ কী। কিন্তু এই নাগভবনে রসপানের একটু নিয়ম-কানুন আছে। সুরা যেহেতু এক অন্যতর আবেশ নিয়ে আসে শরীরে, অতএব সুরার প্রতি তাদের এক ধরনের সম্মানবোধও জড়িত আছে। যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে তারা মদ্যপান করে না। ভীমকেও এসব নিয়ম মানতে হল। নাগরা মহা সমারোহে ভীমকে সুরাগৃহে বা রসায়নগৃহে নিয়ে গেল। নাগদের নিয়ম মেনে ভীমকে সেখানে বেশ হাত-পা ধুয়ে শুদ্ধ হয়ে বসতে হল–কৃতস্বস্ত্যয়নঃ শুচিঃ। এমনকি যেভাবে যে দিকে মুখ করে সন্ধ্যাবন্দনাদি মঙ্গলাচরণ করতে হয়, ভীম সেইভাবে পূর্বদিকে মুখ করে নাগদের রস পান আরম্ভ করলেন–প্রান্মুখশ্চোপবিষ্ট রসং পিবতি পাণ্ডবঃ।
কুণ্ডের রসায়ন শেষ হতে বেশি সময় লাগল না। পোক্ত মানুষ, ভবিষ্যতে মহাবীর হবেন, অতএব একেক নিঃশ্বাসে তার একেকটি কুণ্ড খালি হতে লাগল। এইভাবে আটটি রসকুণ্ড শেষ হবার পর ভীমের কিঞ্চিৎ ঝিমুনি এল। আর দেরি না করে নাগদের দেওয়া উৎকৃষ্ট শয্যায় শুয়ে পড়লেন ভীম।
এদিকে ভীম যখন রসপান করছেন, ততক্ষণে পাঁচ পাণ্ডবের চারজন বাড়ি ফিরে এসেছেন, কিন্তু ভীম আসেননি। ধর্মপ্রাণ সরলমতি যুধিষ্ঠির তো দুর্যোধনের প্যাঁচ-পোঁচ কিছুই বোঝেননি। তিনি বাড়িতে এসে কুন্তীর কাছে বললেন–মা, ভীম আসেনি এখানে? তার তো আগেই চলে আসার কথা। কিন্তু এখানেও তো তাকে দেখছি না, মা। সে গেল কোথায়–ক গতো ভবিতা মাতঃ নেহ পশ্যামি তং শুভে। আমরা তো আসার আগে প্রমাণকোটির বাগান, বন, গঙ্গাতীর সব খুঁজে এলাম। কিন্তু কোথাও তাকে দেখিনি, মা! কোথাও তাকে না পেয়ে ভাবলাম–ভীম আগেই বাড়ি চলে এসেছে–মন্যমানাস্ততঃ সর্বে যাতো নঃ পূর্বমেব সঃ। যুধিষ্ঠির খুব চিন্তান্বিত হয়ে বললেন–আমরা তাকে পেলাম না বলে খুব ব্যাকুল হয়েই এখানে এসেছি। ভাবলাম–এখানে তাকে ঠিক পাব। সে এখানে এসে আবার কোথাও যায়নি তো মা! তুমি তাকে কোথাও পাঠাওনি তো–ইহাগম্য ক নু গতত্ত্বয়া বা প্রেষিতঃ ক নু?
যুধিষ্ঠির এতক্ষণে বোধহয় একটু জটিলভাবে ভাবছেন। তিনি জানেন যে, অন্যদের সঙ্গে ভীমকে খুব মেলানো যায় না। ভীমের অভ্যাস আছে কাউকে না বলে এখানে-ওখানে চলে যাবার, যা ইচ্ছে খাবার, এমনকি যেখানে ইচ্ছে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস আছে ভীমের। যুধিষ্ঠির সেসব জানেন, কিন্তু এতক্ষণ দুর্যোধনের মতো মানুষের সঙ্গে থাকতে হয়েছে বলেই, অপিচ দুর্যোধন পাণ্ডবদের সবার সঙ্গে অত্যন্ত সুব্যবহার করেছেন বলেই যুধিষ্ঠিরের এখন নানা সন্দেহ হচ্ছে। তিনি বলেছেন–ভীমের ব্যাপারে আমার মন মোটেই ভাল কথা বলছে না–ন হি মে শুধ্যতে ভাবস্তং বীরং প্রতি শোভনে–সে যে কোথাও ঘুমিয়ে আছে একথা আমার মোটেই বিশ্বাস হচ্ছে না। এখন আমার কেবলই সন্দেহ হচ্ছে–তাকে কেউ মেরে ফেলেনি তো?
যুধিষ্ঠিরের এই দুশ্চিন্তা এবং এই ঘোরতর সন্দেহ দেখে জননী কুন্তী একেবারে হাহাকার করে উঠলেন। কিছুদিন আগেই প্রিয়তম স্বামী মারা গেছেন, এখন এই বলজ্যেষ্ঠ পুত্রটিকেও কি হারাতে হবে! কুন্তী কেঁদে বললেন–শীগগির যা বাবা, ছোট ভাইদের সঙ্গে নিয়ে আরও একবার দেখে আয় চারদিক–শীঘ্ৰস্তন্বেষণে যত্নং কুরু তস্যানুজৈঃ সহ–সে তো একবারও আমার কাছে আসেনি। অজানা ভয়ে ত্রস্তচকিত হয়ে কুন্তী মহামতি বিদুরকে ডেকে পাঠালেন। বিদুর ভূয়োদশী মানুষ, ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভায় তিনি মন্ত্রীও বটে। সবচেয়ে বড় কথা, হস্তিনার রাজবাড়িতে বিধবা অবস্থায় কুন্তী যখন তাঁর পঞ্চ পুত্র নিয়ে এসেছিলেন, তখন থেকে বিদুরই এই পরিবারটিকে সমস্ত সমব্যথা নিয়ে দেখে আসছিলেন।
আসলে পাণ্ডু মারা যাবার পরে ধৃতরাষ্ট্র যতই ক্রন্দন করুন, যতই রাজকীয়ভাবে তার শ্রাদ্ধ করুন, পাণ্ডুর পুত্র-পরিবারের প্রতি তার সমদৃষ্টি ছিল না। রাজবাড়ি থেকে ভরণ-পোষণ নিশ্চয়ই পেতেন পাণ্ডবরা। কিন্তু যে ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনতা দিয়ে দুর্যোধনরা একদল ভাই মানুষ হচ্ছিলেন, সেই স্বাধীনতা বা ব্যক্তিত্ব প্রকাশের সুযোগ পাণ্ডবদের ছিল না। লক্ষ্য করে দেখুন, প্রমাণকোটিতে জলক্রীড়া করার জন্য যে অস্থায়ী মহার্ঘ আবাসগুলি বানানো হয়েছিল, যে পরিমাণ ভোজ্য-পেয়র ব্যবস্থা করা হয়েছিল, এরজন্য সতেরো-আঠারো বছরের দুর্যোধনের কোনও অনুমতি লাগেনি। তার নিজের ইচ্ছে পূরণের জন্য রাজযন্ত্র ব্যবহার করাটাও কোনও অসম্ভব ব্যাপার হয়নি তার পক্ষে। ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ প্রশ্রয় না থাকলে দুর্যোধনের পক্ষে এই ধরনের বিলাস পরিকল্পনা করাটা যথেষ্ট কঠিন ছিল। অপরদিকে পাণ্ডবদের কারও পক্ষে এই স্বাধীন ব্যবহার করাটা মোটেই সহজ ছিল না। এমনকি তাদের দুঃখ-কষ্টের অভিযোগ দুর্যোধনের পিতা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে জানানোও এত সহজ ছিল না। ঠিক সেই কারণেই কুন্তী হস্তিনাপুরের রাজা ধৃতরাষ্ট্র এবং তার নিকটতম আত্মীয় ভাশুর ধৃতরাষ্ট্রের কাছে না গিয়ে তিনি বিদুরকে স্বগৃহে ডেকে আনলেন।
