দুর্যোধন ফিরে এলেন প্রমাণকোটির অস্থায়ী আবাসে। এসেই মিশে গেলেন ভাইদের সঙ্গে একই প্রক্রিয়ায়। তিনি এসে দেখলেন–চার পাণ্ডব-ভাই অনুমান করছেন–ভীম আগেই হস্তিনায় চলে গেছেন। কৌরবভাইরাও অনেকে বললেন–হ্যাঁ, ভীম বোধহয় আগেই চলে গেছেন। ভীমের ব্যাপারে কৌরব এবং পাণ্ডবদের একই রায় শুনে দুর্যোধন একেবারে নিশ্চিন্ত হলেন। যাঁরা প্রমাণকোটির অস্থায়ী আবাসে থাকতে চাইলেন, তারা রয়ে গেলেন, আর যাঁরা হস্তিনায় ফিরতে চাইলেন, তারা হাতী, ঘোড়া, রথযার যেমন ইচ্ছে, তেমন বাহনে চলে গেলেন। দুর্যোধন গেলেন একটু পরে। কৌরব-পাণ্ডবরা অনেকেই চলে যাবার পর। হয়তো নিশ্চিন্ত হতে চাইলেন–ভীম তার জলশয্যা থেকে আর উঠতে পারছেন না, অন্তত ওই সময়ের মধ্যে না।
সত্যিই তো ভীম উঠবেন কী করে? বিযের ঘোরে তার সর্ব শরীর অবশ হয়ে গেছে–বিযেণ চ পরীতাঙ্গো নিশ্চেষ্টঃ পাণ্ডুনন্দনঃ। তাকে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেওয়া হয়েছে গঙ্গায়। মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেই ভীম এসে পৌঁছলেন নাগ-বসতিতে। তার দেহভারে কত নাগ মারা গেল, কতক নাগে তাঁকে তীক্ষ্ণ দন্তে দংশন করল! বিয়ে বিক্ষয় হল। ভীম সংজ্ঞা ফিরে পেলেন–হতং সর্পবিযৌণব তদ্বিষং কালকূটজ। অনেক সাপ তখনও তাকে দংশন করবার চেষ্টা করছে, কিন্তু ভীমের কঠিন দেহে তারা দন্তস্ফুট করতে পারছিল না। বিষমুক্ত হয়ে চৈতন্য ফিরে পাবার সঙ্গে সঙ্গে ভীম তার দেহস্থিত লতালের বন্ধন ছিঁড়ে ফেললেন। কতগুলি নাগকে মাটিতে পিষে ফেললেন। হতাবশিষ্ট নাগেরা সভয়ে গিয়ে তাদের রাজা বাসকিকে এই অদ্ভুত সংবাদ জানাল।
আমাদের দৃষ্টিতে–এই নাগরা সাপের সমান বর্ণিত হয়েছে মাত্র। এরা আসলে নাগ জনজাতির মানুষ। আমরা আগেই দেখিয়েছি যে, নগর নাগ-সাহুয় (হস্তিনাপুর) থেকে আরম্ভ করে মথুরা এবং সমগ্র উত্তরভারতে নাগ জনজাতির মানুষেরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। বিশেষত নদ-নদী হ্রদের সঙ্গে এদের একটা অদ্ভুত যোগ আছে! আর্যায়নের সঙ্গে সঙ্গে নাগ-জনজাতির অনেকে আর্যদের বিরুদ্ধাচরণ করেন আবার অনেকে আর্যদের সভ্যতা-সংস্কৃতিতে নিজেদের সত্তা বিলীন করে। কৃষ্ণ-জীবনে যেমন নাগরাজ কালিয় এই বিলীনসত্ততার উদাহরণ, তেমনি পৌরাণিকতার বৃহৎ ক্ষেত্রে নাগরাজ বাসুকিও এই সত্তার অচিন্ত্য ভেদাভেদের উদাহরণ। আর্য সংস্কৃতি নাগরাজ বাসুকিকে এতটাই আত্মসাৎ করেছে যে তিনি পুরাণে-ইতিহাসে ভগবানের অংশাবতার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।
আমাদের ধারণা–লতাজালমণ্ডিত ভীম গঙ্গার জলে কোনও ভাবে ভাসতে ভাসতে নাগবস্তিতে এসে পৌঁছন। হঠাৎই এক বিশাল চেহারার বরাকৃতি পক্ষকে দেখে নাগ–জনজাতির মানুষেরা তাঁকে বিষদিগ্ধ অস্ত্রের আঘাতে জর্জরিত করার চেষ্টা করে। ফল উলটো হয় ভীমের শরীর বিষমুক্ত হয় তিনি সঙ্গে সঙ্গে লতার বঁধন ছিঁড়ে নাগ-জনজাতির মানুষদের আক্রমণ করেন, তাতে বেশ কিছু লোক হত হয় এবং আহতদের অবশিষ্টাংশ তাদের এই আকস্মিক বিপন্নতার কথা জানায় তাদের নেতা বাসুকিকে। ঠিক এরপরেই মহাভারতের কবির মানব-রূপক বৈচিত্র্য আর খুব প্রয়োজনীয় মনে হয় না। এমনি মানব-স্বরূপেই নাগদের আচরণ এখন বোঝা যায়।
বাসুকির লোকেরা ভীমের হাতে মার খেয়ে এসে তাদের নেতার কাছে নিবেদন করেছিল–মহারাজ! এ লোকটাকে কেউ বিষ খাইয়ে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিয়েছিল। তা না হলে, দেখুন, লোকটাকে প্রথম দেখেছি–একেবারে নিথর অজ্ঞান। কিন্তু আমাদের দংশনের ফলেই লোকটার জ্ঞান ফিরে এল। এখন দেখুন আমাদেরই কেমন মারছে, পিষে ফেলছে। আপনি একটু দেখুন মহারাজ–পোথয়ন্তং মহাবাহুং তং বৈ ত্বং জ্ঞাতুমহসি।
বাসুকি তার নাগচিহ্নধারী দল-বল নিয়ে ভীমকে দেখতে গেলেন। মহাভারতের কবি লিখেছেন–মহামতি বাসুকি ভীমকে মহারাজ আর্যক শূরের নাতি বলে চিনতে পারলেন–আৰ্য্যকেণ চ দৃষ্টঃ স পৃথায়া আৰ্য্যকেণ চ। আসলে চিনতে পারাটা হঠাৎ দেখে চিনতে পারা নয়। ভীমের সঙ্গে বাসুকির বাক্য-বিনিময় হয়েছে। ভীম তাঁর পিতৃ-মাতৃ কুলের পরিচয় দিয়েছেন। সেই পরিচয় প্রসঙ্গে দেখা গেল জননীর কুন্তীর মাতামহ আৰ্যক শূর নাগোত্তম বাসুকির নাতি হন। আশ্চর্য লাগবে শুনে। মনে হবে–তাহলে বাসুকির বয়স কত? আসলে এই সম্পর্কটা অত আক্ষরিক অর্থে ধরলে হবে না। বস্তুত অনেক কম বয়সের মানুষও পারিবারিক বৈচিত্র্যে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের দাদু-ঠাকুরদা হয়ে যান। তার ওপরে খেয়াল রাখতে হবে–নাগদের সঙ্গে তথাকথিত আর্য জাতির বৈবাহিক সম্পর্ক সেকালে যথেষ্টই চালু ছিল, কিন্তু তবু এই সম্পর্ক একেবারে এতটাই জল-ভাত নয়, যা তৎকালীন ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের মধ্যে দেখা যেত। ঠিক সেই কারণেই একটু দেরি লেগেছে ভীমকে চিনতে। কিন্তু পরিচয় পাবার সঙ্গে সঙ্গেই ওরে! এ যে আমার নাতির নাতি, বলে বাসুকি জড়িয়ে ধরেছেন ভীমকে–তদা দৌহিত্র-দৌহিত্রঃ পরিঃ সুপীড়িত।
বাসুকি ভীমকে পেয়ে পরম প্রীত হলেন। নাগদের সঙ্গে নিয়ে তিনি ভীমকে তার আপন নাগভবনে প্রবেশ করলেন। আর্যক শূরের নাতি বলে ভীমকে অনেক ধন-রত্ন, অনেক উপহার দিয়ে বাসুকি তার মনের প্রসন্নতা জ্ঞাপন করতে চাইলেন। নাগ-জনজাতির লোকরাও এতক্ষণে ভীমকে বেশ বুঝে নিয়েছে। আর্যসংস্কৃতির প্রতিভূ হলেও এই মানুষটা যে একটু অন্যরকম এটা তারা বেশ বুঝে গেছে। তাছাড়া রতনে রতন চেনে অতএব বাসুকির নাগ-পার্ষদরা বলল–আপনি যদি এই মানুষটার ওপর এতই খুশি হয়ে থাকেন তবে একে এত ধনরত্ন উপহার দিয়ে কী হবে? একে আমরা বরং একটু নাগচিহ্নিত রস খাওয়াই–রসং পিবেৎ কুমারোয়ং ত্বয়ি প্রীতে মহাবল। আমাদের এই রস-কুণ্ডের একেক কুণ্ড রস খেলে এ ছেলে একশো হাতীর বল পাবে শরীরে। কাজেই যতক্ষণ এই রসচর্চা হয়, তার জন্য ছেলেটিকে ছেড়ে দিন আমাদের হাতে–যাবৎ পিবতি বালোয়ং তাবদস্মৈ প্রদীয়তা।
