রাজপুত্রেরা মহানন্দে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগলেন। অস্থায়ী আবাসের কাছাকাছি পদ্মদিঘির ধারে, ফুলের বাগানে, গঙ্গার হাওয়ায়। খাওয়া-দাওয়াও চলল নিজের ইচ্ছামতো। এ ওকে খাইয়ে দিচ্ছে, এ ওর সঙ্গে কথা বলছে–এরই মধ্যে দুর্যোধন পরম বন্ধুর মতো ভীমকে নিজে হাতে খাইয়ে দিলেন কত কিছু–স্বয়ং প্রক্ষিপতে ভক্ষ্যং বন্ধ্রে ভীমস্য পাপকৃৎ। দুর্যোধন ঠান্ডা মাথায় আগে থেকেই ভীমের খাদ্যে বিষ মাখিয়ে রেখেছিলেন। তার মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা, ভীমকে খাওয়াবার জন্য তিনি কতই যেন ব্যগ্র। সকলের মধ্যে যখন সকলেই এ-ওকে খাওয়াচ্ছে–পরস্পরস্য বন্ধ্রেভ্যো দদুর্ভক্ষ্যাংস্ততস্ততঃ–সেখানে দুর্যোধনকে সন্দেহ করারও কিছু রইল না। কিন্তু দুর্যোধনের হৃদয়েও বিষ, খাবারেও তিনি বিষ মাখিয়েছেন, পাকা অভিনেতার মতো মুখে তিনি অমৃতের ধারা ছুটিয়ে দিলেন–ভাই এটা একটু খেয়ে দেখ, আরে এটা খেলে না–বাচামৃতকপ্পোথ ভ্রাতৃবচ্চ সুহৃদ যথা।
ভীমসেন নিজে এমনিতে পেটুক মানুষ। তার আর ভাইরা সকলে মিলে যা খান, তিনি নিজে একা তাই খান। ভাল-মন্দ খাবার পেলে আর কোনও জ্ঞান থাকে না তার। এখানে এই প্রমোদ কুটীরে তার জন্য এত আয়োজন করে রেখেছেন দুর্যোধন! ভীম বড় খুশি হলেন। দুর্যোধনের মনে যে পাপ থাকতে পারে–সে কথা তিনি ভাবতেই পারলেন না। তিনি খুব খেলেন, মনের আনন্দে খেলেন–প্রতীচ্ছিতঞ্চ ভীমেন তং বৈ দোষমজানতা। দুর্যোধন ভীমের কাণ্ড দেখে মনে মনে খুব হাসলেন–হৃদয়েন হসন্নিব। শুধু তাই নয়, মনে মনে ভবিষ্যতের নিঃসঙ্কট রাজসুখ কল্পনা করে নিজেকে সম্পূর্ণ কৃতকৃত্য মনে করলেন।
এবারে জলক্রীড়া। একবার হুল্লোড় তোলার সঙ্গে সঙ্গে পাণ্ডব-কৌরব বালকেরা সকলেই জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এ ওর গায়ে জল ছিটোচ্ছে, এ ডুব-সাঁতার কাটছে, ও লুকোচ্ছে, এ ধরছে–এরকম করে যত বিচিত্র পদ্ধতিতে খেলা যায়, তেমনি খেলা হল। খেলার হুল্লোড়ে দিন গড়িয়ে বিকেল হল। সকলেই পরিশ্রান্ত। জল থেকে উঠে ভাল ভাল জামা-কাপড় পরে অনেকেই বললেন–আজকে এই অস্থায়ী আবাসেই কাটিয়ে দেব। নিঃসন্দেহে এই জনা কয়েকের মধ্যে দুর্যোধন এবং তাঁর আরও দু-একটি ভাই ছিলেন।
কেমন বিষ দিয়েছেন দুর্যোধন যার ক্রিয়া অত্যন্ত ধীর। কারণ খাবারের সঙ্গে মেশানো বিষ খেয়েও ভীম জলক্রীড়া করেছেন অন্যদের সঙ্গে সমানতালে। শরীরের ব্যায়ামও তার যথেষ্ট হয়েছে। কিন্তু শেষে যেন আর তিনি পেরে উঠছেন না। যেখানে জল-ক্রীড়ায় মত্ত ছিলেন তিনি, সে জায়গাটা অস্থায়ী আবাস থেকে একটু দূরেই হবে। ভীম তার ক্রীড়া সহচরদের সঙ্গে একই সময় পারে উঠলেন, কিন্তু বিষক্লান্ত শরীরটাকে আর যেন তিনি বইতে পারছেন না। প্রমাণকোটিরই এক জায়গায়, যেখানে শীতল বাতাস বয়ে আসছে গঙ্গা থেকে, ভীম সেখানে শুয়ে পড়লেন কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে। শ্রান্ত-ক্লান্ত দেহে শীতল বাতাস লাগতেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়লেন তিনি। বিষের ক্রিয়া অনেকক্ষণ আগেই শুরু হয়েছে, আর তার জেগে থাকবার উপায় নেই–বিষেণ চ পরীতাঙ্গঃ সুস্বাপা বাপ্য তৎস্থল।
০৯৫. প্রমাণকোটিতে গঙ্গার তীরে
৯৫.
প্রমাণকোটিতে গঙ্গার তীরে সন্ধ্যা নেমে আসছিল। উদকক্ৰীড়ন নামক অস্থায়ী আবাস-গৃহে একটু একটু করে আলো জ্বলে উঠছিল। জলবিহার সেরে শ্রান্ত-ক্লান্ত বালকদের কেউ কেউ ঠিক করলেন, ওই অস্থায়ী আবাস-গৃহেই থেকে যাবেন। তারা স্নানের পর পরিষ্কার জামা-কাপড় পরে আলস্যে রাত কাটিয়ে দেবেন বলে ঠিক করলেন। কেউ থাকছেন, কেউ যাচ্ছেন, কেউ বস্ত্র পরিধান করছেন, কেউ খাবার খাচ্ছেন–এমন হট্টগোলের মধ্যে কে গেল, কে থাকল–এটা কেউ ভাল করে খেয়াল করলেন না।
ওদিকে অস্থায়ী আবাস থেকে বেশ খানিকটা দূরে যেখানে গঙ্গা থেকে উঠেই ভীম শুয়ে পড়েছিলেন ভূমিশয্যায়, সেখানে তার ওপর নজর রাখছিলেন শুধু একটি মাত্র লোক। তিনি দুর্যোধন। আমাদের ধারণা–পাকা খুনী মানুষ যদি তার নিচ্ছিদ্র পরিকল্পনার কথা কাউকে না জানায় এবং ঠান্ডা মাথায় খুন করে, তবে তার পরিকল্পনা সত্যিই নিচ্ছিদ্র হলে তার ধরা পড়বার সম্ভাবনা খুব কম থাকে। কিন্তু পাকা খুনীও তার খুনের কথা চেপে রাখতে পারে না, অনেক সময় কাছের মানুষকে সে বলে ফেলে। বলে ফেলতে ইচ্ছে করে, না বলে পারে না। আর দ্যএইখানেই সব গণ্ডগোল হয়ে যায়। এই দৃষ্টে এই সতেরো আঠারো বছর বয়সেই দুর্যোধন পাকা খুনীর মতোই ব্যবহার করছেন। তার পরিকল্পনার কথা কেউ জানে না, এমনকি তার প্রিয় ভাই দুঃশাসনও না। ভীম জল থেকে ওঠার পর থেকেই তিনি শুধু নজর রাখছেন প্রমাণকোটির একান্তে দাঁড়িয়ে।
ভীমের বড় ঘুম আসছে। প্রমাণকোটির গঙ্গাতীরে সন্ধ্যাচ্ছায়া ঘনীভূত হবার সঙ্গে ভীমের চোখেও নেমে এল অনন্ত আঁধার। কিছুই তিনি বুঝতে পারছেন না, বিচার করতে পারছেন না, শুধু আঁধার ঘনিয়ে আসছে চোখে, শত রাত্রির আঁধার। ভীম সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে রইলেন নিশ্চিন্ত নিদ্রায়। ভীমকে সম্পূর্ণ স্থির হয়ে যেতে দেখে দুর্যোধন একা তাঁর কাছে এসে দাঁড়ালেন। তারপর শক্ত লতা-গাছিতে বেঁধে ফেললেন ভীমকে, যাতে কোনও ভাবে সংজ্ঞা ফিরে এলেও অন্য কোনও উপায়ে ভীম নিজেকে বাঁচাতে না পারেন। গঙ্গার তীরে একা এবং একা ভীমকে লতার বাঁধনে বেঁধে–তত বধ্বা লতাপাশৈ–ভমিং দুর্যোধনঃ স্বয়ম্-দুর্যোধন ভীমকে ফেলে দিলেন গঙ্গায়–স্থলাজ্জলমপাতয়ৎ।
