অন্য পাণ্ডব ভাইরা অন্তরের ভাবটুকু অনেকটাই গোপন করতে পারতেন, কিন্তু ভীম পারতেন না; আর পারতেন না বলেই নিজের অজান্তেই তিনি ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের ওপর অত্যাচার করে সুখী হতেন। কিন্তু তার অবদমিত দুঃখের প্রকাশ শক্তি এবং সুখের মাধ্যমে ঘটায় স্পষ্টতই কৌরবদের ওপরে এর প্রতিক্রিয়া হল। বিশেষ করে কৌরব-জ্যেষ্ঠ দুর্যোধন ভীমের সমস্ত আচরণটাকেই বাড়াবাড়ি বলে মনে করতে লাগলেন। ভীমের অতিরিক্ত শক্তি তার ক্ষতি করতে পারে–এইরকম একটা কুবুদ্ধি দুর্যোধনের অন্তরে ক্রিয়া করতে লাগল সেই সতেরো-আঠারো বছর বয়সেইভীমসেনস্য তজজ্ঞাত্বা দুষ্টং ভাবমদর্শরৎ।
সেই অল্প বয়সেই দুর্যোধনের ন্যায়-নীতি বোধ খুব প্রখর ছিল না। মহাভারতের কবি মন্তব্য করেছেন–ক্ষমতার মোহ এবং ঐশ্বর্যলোভ–এই দুটো কারণেই দুর্যোধন ভাবতে আরম্ভ করলেন কীভাবে ভীমের ক্ষতি করা যায়–মোহাঐশ্বর্যলোভাচ্চ পাপা মতি-রজায়ত। এতকাল দুর্যোধনই ছিলেন কুরুবাড়ির একচ্ছত্র রাজপুত্র। তিনি তার অধিকার প্রকাশ করতে কখন কুণ্ঠিত হতেন না। কুরুবাড়ির এই অধিকার এবং ঐশ্বর্য যখন দুর্যোধনের মনের আকাশে চাঁদের কলার মতো বেড়ে চলেছে, ঠিক তখনই তার মধ্যে ভীমসেনের রাহুচ্ছায়া দেখা দিল। দুর্যোধন ভাবলেন–ভীমের গায়ে শক্তি যথেষ্ট। কাজেই শক্তি দিয়ে তাকে কিছু করা যাবে না। ছলচাতুরী এমন একটা করতে হবে যাতে চিরদিনের মতো এটাকে ঠান্ডা করে দেওয়া যায়নিকৃত্যা সংনিগৃহ্যতাম্। দুর্যোধন ভাবলেন–আমরা যদি সকলে মিলে একদিকে থাকি, তবু একা ভীমই আমাদের সবাইকে বিপর্যস্ত করে দেয়স্পর্ধতে চাপি সহিতা অস্মানেকো বৃকোদরঃ।
ভীমকে কৌশলে কীভাবে বিপদে ফেলা যায় তার উপায় দুর্যোধনের চিন্তা করা হয়ে গেছে। মনে রাখা দরকার, দুঃশাসন, শকুনি, কর্ণ–এঁরা কেউই এখনও দুর্যোধনের পরামর্শদাতার ভূমিকায় আসেনি। ভীমের ব্যাপারে যে কুটিল সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা দুর্যোধন একাই নিচ্ছেন। তার মানে, সতেরো-আঠারো বছরের এক সদ্য-যুবকের মধ্যে কতখানি ঐশ্বর্যলিঙ্গা এবং প্রতিহিংসাবৃত্তি থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। দুর্যোধন ঠিক করলেন-ঘুমন্ত অবস্থায় ভীমসেনকে ফেলে দেব গঙ্গায়–তন্তু সুপ্তং পুরোদ্যানে গঙ্গায়াং প্রক্ষিপামহে। তারপর ওই ছোটভাই অর্জুন আর বড়ভাই যুধিষ্ঠিরকে বেঁধে রাখব বন্দিশালে।
দুর্যোধন ওই বয়সেই রাজা হবার স্বপ্ন দেখছিলেন। হয়তো সেইভাবে তার মনটাও গড়ে উঠেছিল। কারণ তাঁর পিতা দুর্যোধনের জন্মলগ্নেই তাকে রাজা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। নিজে রাজ্য পাননি বলে এই ভাবনাটা তার মধ্যে গেড়ে বসেছিল। তারপর বহুকাল পাণ্ডু এবং তাঁর পুত্রদের অনাগমনে ধৃতরাষ্ট্র তার নিজের রাজ্যলাভের স্বপ্ন দুর্যোধনের অন্তরে প্রোথিত করতে পেরেছিলেন। দুর্যোধনও তাই এই কচি বয়সেই এমন সর্বনেশে কথা ভাবতে পারছেন। ভীমকে মেরে যুধিষ্ঠির-অর্জুনকে কারাগারে বন্দী করে তিনি যে সিদ্ধি চান, তা হল নিঃশত্রুক রাজ্যলাভ–প্ৰসহ্য বন্ধনে বধ্ব প্রশাসিয্যে বসুন্ধরাম্।
ভীমসেনের ব্যাপারে কী করবেন, সেটা সিদ্ধান্ত নেবার সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোধন ভীমের ছিদ্র খুজতে লাগলেন। অন্যদিকে ভীমকে নিজের জালে ফেলার জন্য তার নিজের পরিকল্পনাটি ছকতে লাগলেন নিচ্ছিদ্রভাবে। এই পরিকল্পনা করবার সময়ে তার একটুও ভাবান্তর হল না, কাক-পক্ষীও তাঁর অন্তর-কূট জানতে পারল না। পাকা খুনীর মতো ঠান্ডা মাথায় তিনি কার্যসিদ্ধির পথে এগোতে লাগলেন। আগে তিনি সবার মধ্যে বেশ রটিয়ে দিলেন–অমুক দিন অমুক জায়গায় আমরা সবাই জলক্রীড়া করতে যাব। সবাই তাতে মনে মনে খুশি। ভীমও বোধহয় প্রতিযোগিতা-জয়ের আগাম আনন্দে খুশিই ছিলেন মনে মনে।
দুর্যোধন যে রকম পরিকল্পনা করেছেন, তাতে মনে হবে যেন এক বিরাট পিকনিকের পরিকল্পনা হয়েছে দূরে কোনও রম্যস্থানে। জায়গাটার নাম প্রমাণকোটি। হস্তিনাপুর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা গেলে গঙ্গার তীরে এক ছায়াসুনিবিড় স্থানে পিকনিক-স্পট ঠিক হয়ে গেল দুর্যোধনের নির্দেশে। রাজবাড়ির জলক্রীড়া, তার ঠাটবাটও সেইরকম। গঙ্গার তীরে অস্থায়ী কতগুলি ঘর তৈরি করা হল, কিন্তু সে ঘরগুলিও ভারি সুন্দর, বাসযোগ্য তো বটেই। এখনকার দিনে অস্থায়ী ক্যাম্পগুলির চতুর্দিকে যেমন ক্যাম্বিসের কাপড় দেওয়া হয়, তেমনি তখনকার দিনের এমনি সাধারণ কাপড়ের সঙ্গে কম্বল, ভেড়ার লোমের তৈরি কাপড় এগুলি দিয়ে বিচিত্র সব ঘর তৈরি হল–চেল-কম্বলবেশ্মানি বিচিত্রানি মহান্তি চ। এই অস্থায়ী আবাসের শিল্পশৈলীও অসাধারণ। গঙ্গার তীর থেকে খুঁটি পুঁতে পুঁতে সেই আবাসের অর্ধেকটা তুলে দেওয়া হল জলের ওপর, অপর অর্ধেক রইল স্থলে-স্থলং কিঞ্চিদুপেত্য হ।
ঘরের মধ্যে এখানে সেখানে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয় সাজিয়ে রাখা হল। স্নানের আগে, পরে, মাঝখানে যখন তখন খাবার ব্যবস্থা। শিল্পীরা সমস্ত ঘর-বাড়ি সাজিয়ে দিল বিশাল বিশাল চিত্রকর্ম টাঙিয়ে দিয়ে, ধ্বজ-পতাকা উড়িয়ে দিয়ে। দুর্যোধন এই অস্থায়ী আবাসের নাম দিলেন উদক-ক্রীড়ন।–উদক-ক্রীড়নং নাম কারয়ামাস ভারত।
সব কাজ শেষ হলে দুর্যোধন পাণ্ডবদের বললেন–চলো ভাইসব। গঙ্গাতীরে চলো। সেখানে পরমানন্দে জলবিহার করা যাবে। কথাটা সরল যুধিষ্ঠিরের কানে বেশ ভালই লাগল। ভাইদের নিয়ে তিনি কৌরবদের সঙ্গে চললেন প্রমাণকোটিতে। রথ চলল, হাতি চলল, রাজপুত্রেরা যথোপযুক্ত বাহনে চড়ে রাজধানী হস্তিনাপুর ছেড়ে প্রমাণকোটিতে, যেখানে কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম নেই, কুরুরাজবংশের বিশ্বস্ত প্রাচীনেরা নেই, সোজা কথায়, দুর্যোধনের কোনও ঝামেলা নেই।
