সে যাক গে, পাণ্ডবরা কুরুবাড়িতে এমনিতে ভালই ছিলেন। সর্বক্ষণ অলস অবসরে খেলাধুলো করে বেড়ানোটাই তাদের প্রধান কাজ ছিল। সেকালের দিনে পাঁচ বছর বয়স থেকে পড়াশুনো আরম্ভ করেই খেলাধুলো সব ভুলে গেলাম–এমনটি হত না। মানুষের জীবনে অনন্ত অবসর ছিল, অনন্ত কৌতুক ছিল, লোক-ব্যবহার ছিল সহজ সরল। ফলে এই ষোলো-সতেরো বছর বয়সেও পাণ্ডবদের আমরা খেলাধুলোয় মত্ত হতে দেখছি। এই খেলাধুলোর প্রধান দোসর অবশ্যই কৌরবরা একশো ভাই। সংখ্যায় অধিক, এতগুলি বন্ধুপ্রতিম ভাইয়ের সঙ্গে পাণ্ডবদের খেলাধুলো ভালই জমে উঠত–ধার্তরাষ্ট্রৈস্ট সহিতাঃ ক্রীড়ন্তো মুদিতাঃ স্বয়ম্।
পাণ্ডবদের শারীরিক শক্তি এবং বাড় বোধহয় কৌরবদের থেকে বেশি ছিল। আমরা শতশৃঙ্গ পর্বতেই দেখেছি–পাণ্ডবদের শারীরিক শক্তি এবং বৃদ্ধি লক্ষ্য করে শতশৃঙ্গবাসী মুনি-ঋষিরা একেবারে অবাক হয়ে যেতেন–বিস্ময়ং জনয়ামাসুমহর্ষীনাং সমীয়ুষা। হয়তো তথাকথিত ইন্দ্র, বায়ু ইত্যাদি দেবতা বা প্রাচীন আর্য-প্রতিভূ প্রধানদের ঔরসজাত বলে অথবা শতশৃঙ্গের পাহাড়ী এলাকায় বেড়ে ওঠার ফলে পাণ্ডবদের শক্তি কৌরবদের চেয়ে কথঞ্চিৎ বেশি ছিল এবং হয়তো তার ফলেই খেলাধুলোয় কৌরবরা তাঁদের সঙ্গে খুব পেরে উঠতেন না–বালক্রীড়াসু সর্বাসু বিশিষ্টাস্তে তদাভব।
বিশেষত মধ্যম পাণ্ডব ভীমসেন। তখনকার দিনে খেলাধুলোর যে নানা বৈচিত্র্য ছিল, তা তো নয়। গ্রামকেন্দ্রিক সভ্যতায় আমরাও যেমনটি দেখেছি–ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়াটাও যেমন খেলার মধ্যে ছিল, পথে-ঘাটে গ্রাম্য মাঠে দৌড়নোটাও তেমন খেলার মধ্যে ছিল। দূরে একটি লক্ষ্যবস্তু রেখে দৌড়ে সেটা আহরণ করা অথবা বড় জোর বন্দুক-ক্রীড়া বা বল খেলাটাই সেকালের বালকক্রীড়ার চরম। সেই কন্দুক বা বলটিও আমাদের ছোটবেলার মতো বাতাবি লেবুর বল কিনা কে জানে। কিন্তু ঢিল ছুঁড়তেই বলা হোক, অথবা দৌড়ের প্রতিযোগিতা, ধুলো ছোঁড়াই হোক অথবা লক্ষ্য-আহরণ–এই সমস্ত খেলাতেই ভীমের সঙ্গে কেউ পেরে উঠতেন না। এমনকি খাবার খাওয়াটা যদি কমপিটিশনে খেলার মর্যাদা লাভ করে, তাতেও ভীমের সঙ্গে কৌরব-ভাইদের কেউই জেতার আশা রাখতেন না–ধার্তরাষ্ট্রান্ ভীমসেনঃ সর্বান্ স পরিমর্দতি।
খেলার ব্যাপারে ভীমের প্রকৃতিটাও ছিল একটু স্যাডিস্ট ধরনের। অন্যকে কথঞ্চিৎ কষ্ট দিয়ে আনন্দ লাভ করাটা তার ক্রীড়া-সরসতার অঙ্গ ছিল। ধরুন, কৌরবভাইদের খেলা বেশ জমে উঠেছে, এই অবস্থায় কৌরবদের কয়েকটি শক্তি-বলহীন ভাইদের জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ভীম তাঁদের লুকিয়ে রাখলেন দূরে গাছের আড়ালে এবং তাও জোর করে, ভয় দেখিয়ে–হর্ষাৎ প্রক্রীড়মানাংস্তান্ গৃহ্য রাজন্ বিলীয়তে। দূরে তাদের লুকিয়ে রেখেই যে ভীম নিশ্চিন্তে বসে রইলেন, তা নয়। মাঝে মাঝে তাদের মাথায় গাঁট্টা মারা, দুজনের মাথা ধরে ঠোকাঠুকি করা, এগুলি ছিল ভীমের ক্রীড়া-ব্যসনের অঙ্গ–শিরঃসু বিনিগৃহ্যৈতা যোধয়ামাস পাণ্ডবঃ।
প্রতিদিনের একঘেয়ে ঢিল ছোঁড়া আর দৌড়নো ভীমের বেশি পছন্দ হয় না। একটু বৈচিত্র্য সৃষ্টি করতে গেলেই সেটা আবার অন্যের পক্ষে অসহনীয় হয়ে যায়। গায়ে যার অতিরিক্ত শক্তি, সে আবার তেমন করে অন্যের কষ্ট বোঝেও না। ভীমেরও তাই হয়েছে। তিনি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রগুলিকে মাঝেমাঝেই মাটিতে চিৎ করে শুইয়ে ফেলেন তারপর তাঁদের চেপে ধরে হাত-পা ধরে টানেন। তারা যখন কষ্ট পেয়ে কাঁদতে থাকেন, তখন তাদের মাথাটা ঘষে দেন মাটিতে–চকর্ষ ক্রোশতোং ভূমৌ ঘৃষ্টজানুশিরোংসকান্। গ্রাম্য-ক্রীড়ার লিস্টিতে অন্যতম মজার খেলার উৎস হল নদীর জল। কিন্তু এখানেও ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেদের রক্ষে নেই। ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা জলে নেমে জলক্রীড়া করছে–এমনটি দেখলেই ভীমও জলে নামবেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের কয়েকটি ছেলেকে তিনি বেশ কিছুক্ষণ জলের তলায় চুবিয়ে রাখবেন জোর করে। এরপরে যখন তাদের দম ফাটার জোগাড় হবে, তখন তিনি ছেড়ে দেবেন তাদের আস্তে স্ম সলিলে মগ্নো মৃতকল্পান্ বিমুঞ্চতি। মজার জন্য ধৃতরাষ্ট্রের যেসব ছেলে গাছে উঠেছেন, তাঁদের ভীম একবার দেখতে পেলে সেই গাছ ধরে এমনই নাড়া দেবেন যে, ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেগুলি ঝুপ ঝুপ করে পড়ে যাবেন ফলের সঙ্গে–সফলা প্রপতন্তি স্ম দ্রুতং এস্তা কুমারকাঃ।
ভীমের এই ক্রীড়াবেগ অন্য কারও সহ্য না হবারই কথা। তার অতুলনীয় শারীরিক শক্তি আছে, তাঁর শক্তির উদ্বৃত্তটুকু এই ধরনের কষ্টকর ক্রীড়াবেগে পরিণত হয়। কিন্তু মুশকিল সেই শক্তির ভার ধৃতরাষ্ট্রের ছেলেরা সইবেন কেন! মহাভারতের কবি ভীমের একটু সাফাই গেয়েছেন এই সময়ে। বলেছেন ভীম যে এই ধরনের ছোট-খাট অত্যাচার করতেন খেলার সময়, সেগুলি কোনও দ্রোহ-চেতনা থেকে করতেন না। তার বয়সটা কম ছিল, অতএব সেই বয়সের চাপল্যেই এইসব দুষ্টবুদ্ধি তাঁর মাথায় চাপড়–বাল্যাৎ, ন দ্রোহচেতসা। কিন্তু বালকোচিত চপলতার জন্যই হোক অথবা শারীরিক শক্তির অতিরেকের ফলেই হোক, ভীমের এই খেলার অত্যাচারে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রদের কাছে ভীম যারপরনাই অপ্রিয় হয়ে উঠলেন–অপ্রিয়েতিষ্ঠদত্যন্ত।
বস্তুত ভীম যে কেন এই ধরনের অত্যাচার করতেন, তার কারণ মহাভারতের কবি যত সরলভাবেই ব্যাখ্যা করুন, এই অত্যাচারের মূলে ছিল কৌরব-পাণ্ডবের বিষম স্থিতি। অন্য জায়গা থেকে এসে পাণ্ডবরা ধৃতরাষ্ট্রের রাজবাড়িতে জায়গা পেয়েছিলেন। এতকাল যে রাজকুমাররা স্বচ্ছন্দ স্বাধীন ছিলেন। এখন তাদের সমমর্যাদার প্রতিযোগী হয়ে এসেছেন পাণ্ডবরা। এটা যেমন কৌরব-ভাইদের মন ভাল লাগছিল না, তেমনি পাণ্ডবদের অবচেতন মনেও এই ঘটনা ক্রিয়া করছিল। তারা যতই রাজপুত্র হোন, দীর্ঘকাল পরে রাজবাড়িতে এসে নিজেদের মর্যাদা তারা লাভ করছিলেন না নিশ্চয়। কৌরব-ভাইরা অত্যন্ত সচেতনভাবে সাহংকারে যেভাবে রাজপুত্রের চাল-চলন প্রকাশ করতেন, জন্ম থেকে রাজবাড়িতে না থাকার ফলে সে চাল-চলন পাণ্ডবদের রপ্ত ছিল না। কিন্তু নীতিগতভাবে সেই রাজপুত্রের মর্যাদা নিশ্চয়ই তাদের আকাঙ্ক্ষার বস্তু ছিল এবং সেইজন্যই তা পাণ্ডবদের অবচেতনে ছিল।
