হয়তো এই কারণেই আমাদের শাস্ত্রে পঞ্চাশোৰ্ব্বে বনে যাবার বিধান। পঞ্চাশে নাই হোক, মানুষ যেদিন তার কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি পায় সেদিনও যদি বুড়ি গিন্নিটির হাত ধরে কাশী-বৃন্দাবনে নতুন সংসার পাততেন, তাহলে তার বার্ধক্যের মধুরতাটুকু পুত্র-পুত্রবধূর যৌবনের কাছে পদে পদে বিপর্যস্ত হত না অন্তত। কাশী-বৃন্দাবনের বদলে শালবনী, মধুবনী কি পুরী-ডায়মন্ডহারবারেও আপত্তি নেই, অন্তত আজকের পরিবর্তিত সমাজের নিরিখে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্যের নিরিখে সে আপত্তি নেই, কিন্তু সত্যিই বেরিয়ে পড়াটা দরকার। যে। মায়াটুকু আছে, সে শুধু পুত্র-কন্যার ওপর নিক্সের মায়া, কারণ পুত্র-কন্যার আপন মায়ার স্থান তৈরি হয়ে যায়। আপনিই তার আধার তৈরি হয়। আমার–তোমার যৌবনগত অবস্থার সময়টা বিচার করলেই তা নিরপেক্ষভাবে বেরিয়ে আসবে! আমার-তোমার ওপর পিতা-মাতার যে মায়া ছিল, পিতা-মাতার ওপর আমার তোমার কি তাইই আছে?
সংসারে যখন অধিকার থাকে না, প্রাধান্য থাকে না, তখন শুধু বয়সের ভার চাপিয়ে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না বলেই পদে পদে বিপর্যস্ত হতে হয়–ব্যাসের ভাষায় সেই দিনগুলি হল কষ্টের দিন, যা আমাদের মনোমত নয়, তাই যেন পাপের দিন বলে মনে হয়– শঃ পাপিষ্ঠদিবসঃ। স্তব্ধ-স্তম্ভিত বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সেদিন শুধু দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলে–কালে কালে কী হল? কী দেখেছি আর কী হল?
ব্যাস চান না তার জননী তার জীবনের সমস্ত সাহংকার পূর্বচেতনা নিয়ে হস্তিনার রাজবাড়িতে বসে মনোকষ্ট পান। প্রত্যেক বৃদ্ধ বৃদ্ধাই যেমন মনে করেন–তাদের পূর্বকালই ভাল ছিল, যে কাল চলছে বা যে কাল আসছে, তা ভয়ঙ্কর, ঠিক তেমন করেই ব্যাস জননী সত্যবতীকে বললেন–মা ভয়ঙ্কর সময় আসছে, মা! ভয়ঙ্কর সময় আসছে, সমাজে দোযের অন্ত থাকবে না। ধর্ম, সদাচার সব লুপ্ত হয়ে যাবে। সে এক ভয়ঙ্কর সময়–ঘোরঃ কালঃ ভবিষ্যতি। এই যে আজকে তোমার কুরুদের দেখছ–এদের অন্যায়ে পৃথিবী সুস্থ থাকবে না–কুরূণামনয়াচ্চাপি পৃথিবী ন ভবিষ্যতি। তাই বলছিলাম তুমি আমার সঙ্গে চলো। তপোবনে গিয়ে যোগ অবলম্বন করো। কুরুবংশের এই ধ্বংস তুমি নিজের চোখে দেখো না।
জননী সত্যবতী তখন অতিশয় বৃদ্ধা। কুরুবাড়ির পুত্র-পৌত্রদের মায়ায় এতকাল তিনি তবু পড়েছিলেন। কিন্তু আর নয়। আজ তার ঋষির ঔরসজন্মা কন্যাকালের পুত্রটি তাঁকে নিতে এসেছেন। অতএব একটুও আপত্তি করলেন না তিনি। শুধু একবার পুরাতন অভ্যাসে অন্দরমহলের ভিতরে গিয়ে পুত্রবধূ অম্বিকার সামনে গিয়ে বললেন–হ্যাঁগা বউ! কী শুনলাম আজকে। শুনলাম–তোমার ছেলে ধৃতরাষ্ট্রের দুর্ব্যবহারে এই ভরতবংশ উচ্ছন্নে যাবে। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে পুরবাসীদেরও ধ্বংস অনিবার্য। আমার ছেলের ইচ্ছে, আমি বানপ্রস্থ যাই। তো তোমারও যদি তেমন ইচ্ছে থাকে, তবে পুত্রশোকাতুরা অম্বালিকাকে নিয়ে আমার সঙ্গে চলো।
হয়তো ব্যাসের সঙ্গে জননী সত্যবতীর কথার কিছু তফাত হল। হয়তো ব্যাসের সাধারণ মন্তব্য সত্যবতীর মুখে আরও নির্দিষ্ট হল। হয়তো পনেরো বছরের ছেলে দুর্যোধনের জন্য ধৃতরাষ্ট্রের ব্যবহারে এমন কিছু ছিল, যা সত্যবতীর চোখে ভাল লাগেনি। কিন্তু ব্যাসের ঋষি-মনে তা সাধারণ কালের ছায়ামাত্র, দুর্যোধনের একক ব্যক্তিত্ব সেখানে কিছুই নয়। যা কিছুই হোক ব্যাস যা বোঝাতে চেয়েছেন, মনস্বিনী সত্যবতী তা বুঝেছেন। দুই পুত্রবধূর হাত ধরে বনে চলে গেলেন সত্যবতী।
মহাভারতের কবি তার নিজের জননীর অস্তকালের কথা সবিস্তারে লেখেননি। লেখেননি সেই দুটি ভয়ত্ৰস্তা রমণীর শেষ জীবনের কথাও, যাঁরা তাঁর সন্তান ধারণ করেছিলেন। এই তিন রমণীই ব্যাসের ব্যক্তিগত জীবনে ছায়া ফেলেছিলেন বলেই ঋষি এবং কবি এক মুহূর্তে এক কলমের খোঁচায় তাদের আয়ুঃশেষের বর্ণনা দিলেন–অতঃপর ঘোর তপস্যা করিয়া তাহারা। দেহত্যাগপূর্বক অভীষ্ট স্বর্গ লাভ করলেন–দেহং তত্ত্বা মহারাজ গতিমিষ্টাং যযুস্তদা।
.
৯৪.
পাণ্ডুর শ্রাদ্ধ-শান্তি হয়ে যাবার পর কুন্তী এবং পাণ্ডবরা যখন হস্তিনাপুরে আশ্রয় পেলেন, তখন নীতি-নিয়মমতো পাণ্ডবদের রাজপুত্রের মর্যাদা পাবার কথা। এই মর্যাদা যে পাণ্ডবরা পেতেনও না, তাও নয়। কিন্তু মহাভারতের কবি একটা অদ্ভুত মন্তব্য করেছেন এই জায়গায়। তিনি লিখেছেন–পাণ্ডবরা বেদোক্ত উপনয়ন-সংস্কার লাভ করেছিলেন যথাযথভাবেই, কিন্তু তারা শুধু খেয়ে-পরে বড় হচ্ছিলেন হস্তিনার রাজবাড়িতে–সংব্যবৰ্ধন্ত ভোগাংস্তে ভুঞ্জানাঃ পিতৃবেশ্মনি। অবশ্য এতকাল শতশৃঙ্গ পর্বতের মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা পাণ্ডবদের এসব ব্যাপারে যে খুব নজর ছিল অথবা তারা কিছু মনে করছিলেন, তা নয়। তবে একটা ঘটনা। তাদের চোখে কিছু খারাপ লেগে থাকবে।
হয়তো তাদের মনে আছে–যেদিন পিতৃহীন পাণ্ডবরা তাদের বিধবা মায়ের হাত ধরে শতশৃঙ্গবাসী মুনি-ঋষিদের সঙ্গে হস্তিনার রাজদ্বারে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন, সেদিন রাজবাড়ির সকলে তাদের দেখবার জন্য ভিড় করেছিল, শত উৎসাহ, ত্বরা এবং কৌতূহলের মধ্যে অন্য কেউ সেদিন, তেমন পরিপাটিভাবে বেরতে পারেননি। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের শত পুত্র দুর্যোধনরা একশো ভাই কিন্তু এই ত্বরিত-কৌতূহলের মধ্যেও সোনার গয়না পরে নানা সাজে সেজে হতশ্রী পিতৃহীন পাণ্ডবদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন–ভূষিতা ভূষণৈশ্চিত্রৈঃ শতসংখ্যা বিনিযুঃ। অর্থাৎ তারা যে রাজপুত্র, তারা যে রাজপুত্রের যোগ্য ভোগ লাভ করেন–এ ব্যাপারে দুর্যোধনেরা নিজেরাও যতটা সচেতন, ততটাই সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে চান অন্য লোকের মনে। এই ঘটনায় কুন্তী বা পাণ্ডবদের মনে কী একটুও লাগেনি? যুধিষ্ঠিরের মতো নরম মানুষের কিছু কিছু বোধ না হলেও, ভীম-অর্জুনের চোয়াল কি একটুও শক্ত হয়ে ওঠেনি এ ঘটনায়!
