দুর্বাসা যথেষ্টই রেগে গেছেন। ক্রোধ এবং পরুষ ব্যবহার করার ব্যাপারে তিনি যে অন্য সহৃদয় মুনি-ঋষিদের সঙ্গে তুলনীয় নন, এ বিষয়ে তিনি নিজেও অত্যন্ত সচেতন। দেবরাজের অবমাননায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত অভিশাপ উচ্চারণ করলেন, তুই যখন লক্ষ্মীমতী মালাটাকে মাটিতে ফেলে দিলি তথন আজ থেকে তোর স্বর্গরাজ্য লক্ষ্মীহীন হয়ে যাবে তস্মাৎ প্রণষ্টলক্ষ্মীকং ত্রৈলোক্যং তে ভবিষ্যতি। অভিশাপ শুনে সঙ্গে সঙ্গে দেবরাজ ইন্দ্র হুড়মুড়িয়ে নামলেন ঐরাবতের গজ আসন থেকে। মুনিকে প্রণাম করে তখন দেবরাজ ইন্দ্র অনুনয় বিনয় আরম্ভ করলেন, যাতে অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেন তাড়াতাড়ি। কিছুতেই কিছু হল না। দুর্বাসা বললেন, আমার দয়া-টয়া অত নেই বাছা– নাহং কৃপালু হৃদয়ো ন চ মাং ভজতে ক্ষমা। ওই সব দয়া-করুণা যাঁদের আছে, সেই গৌতম বশিষ্ঠ ইত্যাদি মুনিদের চিকৃত স্তবেই তোমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। আমি হলাম গিয়ে দুর্বাসা। পৃথিবীতে এমন কেউ নেই যে, আমার এই জটজুটধারী ভ্রূকুটি-কুটিল মুখখানি দেখে ভয় না পায়। আর তাছাড়া তুমি যে এই বারবার তখন থেকে অনুরোধ-উপরোধ করে যাচ্ছ, তার কোনও ফল হবে না। আমি ক্ষমা করব না- নাহং ক্ষমিষ্যে বহুন্য কিমুক্তেন শতক্রতো।
দুর্বাসা দুর্বার গতিতে চলে গেলেন। আহত মনে নানা আশঙ্কা নিয়ে দেবরাজও চলে গেলেন অমরাবতীতে। গিয়ে দেখলেন–সমস্ত স্বর্গভূমি তার নিসর্গ সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলেছে। গাছে পাতা নেই, ওষধি ফুল অপধ্বস্ত, শীর্ণ লতা-বল্লরী শীর্ণতরা–ততঃ প্রভৃতি নিঃশ্রীকং সশং ভুবন-ত্রয়। স্বর্গভূমির দেবতারা সব বিমনা হয়ে রইলেন, ঋষিদের মনে যজ্ঞে মন নেই, তপস্বীরা তপস্যা করেন না, মানুষেরা দান-ধ্যানে ভুলে গেল।
তৎকালীন দিনের সামাজিক প্রেক্ষাপটে যজ্ঞ-দান-তপস্যার বহুতর বিঘ্ন ঘটেছে মানেই অবস্থা যথেষ্ট সংকটময়। কিন্তু আমার প্রস্তাব এবং প্রকরণের জন্য যে সমস্যাটা দরকার, সেই সমস্যাটার কথা এইবার আসবে। পুরাণকার বললেন– স্বর্গের এই বিধ্বস্ত অবস্থায় সমস্ত লোক লোভে এমন উন্মত্ত হয়ে উঠল যে, সবাই ছোট-খাট জিনিস নিয়েও ঝগড়া করতে লাগল-লোভাপহতেন্দ্রিয়াঃ। স্বল্পে’ পি হি বভূবুস্তে স্বাভিলাষা দ্বিজোত্তম। সমস্ত জগৎ নিঃশ্রীক। এবং সত্ত্ব গুণ বিরহিত হওয়ার ফলে দৈত্য-দানবেরা এবার দেবতাদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা আরম্ভ করলেন। দেবতাদের শক্তি হল সত্ত্বগুণ আর সত্ত্বহীনতাই দৈত্য দানবের। শক্তি। ফলে এই সময়ে অসুর-দানবদের তেজোবৃদ্ধি ঘটায় তারা এবার দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করলেন এবং বলহীন দেবতাদের হারিয়ে দিলেন দেবান্ প্রতি বলোদ্যোগং চর্দৈতেয়-দানবাঃ। বিজিতান্ত্রিদশা দৈত্যৈঃ…
অসহায় বিপন্ন দেবতারা চিন্তিত মনে প্রজাপতিব্রহ্মার নিকট উপস্থিত হলেন। ব্রহ্মা তাঁদের সবাইকে নিয়ে উপস্থিত হলেন তিন ভুবনের পালক ভগবান বিষ্ণুর কাছে। বিষ্ণু দেবতাদের করুণ অবস্থা অনুভব করে বললেন, আমি তোমাদের সাহায্য করব, তোমরা সমুদ্র মন্থন করে অমৃত লাভ করার ব্যবস্থা করো-মথ্যতাম অমৃতং দেবাঃ সহায়ে ময্যবস্থিতে।
আমরা এতক্ষণে সেই প্রতিপাদ্য বিন্দুতে উপস্থিত হয়েছি, যেখানে পুরাণগুলি এবং মহাভারত একই কথা বলছে- দেবগণ তোমার অমৃত মন্থন করো। কিন্তু পুরাণগুলি ঘেঁটে মর্মকথা যেটা বেরিয়ে এল, সেটা হল-সমুদ্র মন্থনের কারণ, অর্থাৎ দেবভূমি স্বর্গরাজ্য নিঃশ্ৰীক, সৌন্দর্যহীন, বৃক্ষলতাহীন হয়ে গিয়েছিল, দেবতাদের কিছুই করণীয় ছিল না এবং অসুর দানবেরা স্বর্গরাজ্য দখল করে নিয়েছিল। ঠিক এই রকম একটা অবস্থায় মহাভারতের বর্ণনায় আমরা দেবতাদের সুমেরু পর্বতে আরোহণ করতে দেখেছি বস্তুত আমরাও একই সঙ্গে সেই সুমেরুর উচ্চ চুড়ে আরোহণ করে দেখতে পারতাম যে, জায়গাটা কেমন? কিন্তু সেই ভৌগোলিক বিবরণের আগে প্রয়োজনের প্রশ্নটা আছে–এই দেবতারা কারা? অসুর-দানবেরা কারা? অথবা আগে মানুষই বা কারা? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে দেবতাদের সমুদ্রমন্থনের। আগে আরও একবার আমাদের মহাভারত এবং পুরাণ সমুদ্র মন্থন করতে হবে। আরও একটা কথা হল সমুদ্রমন্থনের উপাখ্যান এমনই এক বিষয় যা শুধু উপাখ্যান বা আখ্যায়িকমাত্র নয়, সমুদ্র-মন্থনে যেহেতু ব্ৰহ্ম বিষ্ণু মহেশ্বর সহ সমস্ত অসুর-দানব নাগ এবং স্বর্গরাজ্যের দেবতা সকলেই ‘ইনভলভড’ সেই হেতু দেবতা, অসুর এবং অন্যান্যদের পরিচয় দেওয়া আমাদের। নিতান্ত আবশ্যক হয়ে পড়েছে। আমরা চাই, এই আবশ্যক কাজটা মহাভারতের সমুদ্রমন্থনের সূত্র ধরেই আসুক। তাতে দেবতা এবং অসুরেরা পিচ পরমেশ্বর বিষ্ণুও ঠিক কী ‘পোজিশনে দাঁড়িয়ে আছেন–সেটা বোঝা যাবে। তার পরে আরম্ভ হবে পরিচয় করিয়ে দেবার কাজ–দেবতা, অসুর, মানুষ—সবার।
মহাভারতে বিষ্ণু ব্রহ্মাকে বলেছেন–দেবতা এবং অসুরেরা সবাই মিলে সমুদ্র মন্থন করুক, তাতেই অমৃত পাওয়া যাবে দেবৈরসুরসঘৈশ্চ মথ্যতাং কলশোদধিঃ। ভগবান বিষ্ণুর আদেশটা যথেষ্টই পরিষ্কার। কিন্তু এই আদেশের মধ্যে যে গুপ্ত কথাটা আছে, সেটা বলতে মহাভারতের কবির রুচিতে বেধেছে। কিন্তু আমাদের ঐতিহাসিক পুরাণকারেরা সেই গুপ্ত কথাটা ফাস করে দিয়েছেন। আমরা এর আগে বলেছি যে স্বর্গভূমি তার সৌন্দর্য হারিয়েছিল এবং দৈত্য দানবেরা দেবতাদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্বর্গভূমি থেকে। তাদের যে লাভ খুব একটা হয়েছিল তা নয়, কারণ ধন-সম্পদহীন একটি গজভুক্ত কপিথবৎ ভূখণ্ড লাভ করে তাদের আর শ্রী বাড়বে কতটুকু। কিন্তু মনুষ্য-সমাজের চিরন্তন বিরোধিতার একটা মনস্তত্ত্ব এর মধ্যে আছে। একটি ভাঙা বাড়ি অথবা অনুর্বর ভূমি নিয়েও যদি জ্ঞাতিশত্রুতা বাধে, তবে জয়ী হলে সেই ভাঙা বাড়ি অথবা নিষ্ফলা ভূমির অধিকার বোধই কিন্তু পরম তৃপ্তি দেয়। হয়তো অসুরদেরও সেই তৃপ্তি হয়েছিল।
