পাণ্ডুর মৃত্যুর পর পৌর-জনপদবাসীদের মনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। হস্তিনায় ফিরেও তারা পাণ্ডুর জন্য কান্নাকাটি করছে, যেন এই মুহূর্তে তাদেরও স্বজন-বিয়োগ উপস্থিত হয়েছে। হস্তিনার রাজবাড়িতে এ এক ভয়ঙ্কর সন্ধিলগ্ন। পাণ্ডু মারা গেছেন, তার জ্যেষ্ঠা পত্নী কুন্তী পিতৃহীন পঞ্চপুত্রের হাত ধরে রাজধানীতে পৌঁছেছেন রাজকীয় পুনর্বাসনের আশায়, কিন্তু রাজধানীতে ফিরেও পঞ্চ পাণ্ডব এবং জননী কুন্তী বোধহয় তাদের পূর্বমর্যাদা ফিরে পাননি। মহাভারতের কবিও এ সম্বন্ধে স্পষ্টত কিছুই লেখেননি, কিন্তু এই করুণ সন্ধিলগ্নে, এক সাংঘাতিক ক্রাইসিসের মুহূর্তে তাকে আমরা স্বয়ং উপস্থিত হতে দেখছি।
মনে রাখতে হবে, কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন ব্যাস শুধু মহাভারতের কবি নন, তিনি পাণ্ডব-কৌরবদের পিতামহ। ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুর জন্মদাতা পিতা তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্থিতধী মুনি হলেও তিনিও মানুষ। আজীবন তপশ্চর্যার ফলে দুঃখ-সুখ, লাভ-অলাভ ইত্যাদি দ্বন্দ্ব তাকে দুঃখিতও করে না, সুখিতও করে না। কিন্তু তিনি যেহেতু একই সঙ্গে মহাভারতের কবি এবং সর্বোপরি এক মানুষ, তাই একটি মানুষের শূন্যতা তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দ্বীপজন্মা হওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনও নির্জনে দ্বীপের মতো নন। সমস্ত মানুষের মধ্যে তাঁর কবিসত্তা জড়িয়ে আছে। তাই আজকে তার মহাকাব্যের অন্যতম এক নায়কের যখন মৃত্যু হল, তখন তিনি শুধু তার পুত্র বলেই নয়, একটি মনুষ্যের মৃত্যু হল বলেই তার কবির অন্তরে এক অতি অদ্ভুত কষ্টবোধ হয়েছে। অন্য কবির ভাষায়–any mans death diminishes me, because I am involved in mankind.
মহাভারতের ভারত-সত্তা যেহেতু ব্যাসের অন্তরে বিরাজিত, তাই আজ এই করুণ মুহূর্তে তিনি হস্তিনাপুরে উপস্থিত হয়েছেন। সেই দিনটির কথা তার আজও মনে পড়ে? যেদিন তার বীভৎস অসুন্দর রমণেচ্ছু মূর্তি দেখে অম্বালিকা ম্লান পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। তার সেই অঙ্গজাত পুত্র মারা গেছেন অকালে। নিজের আত্মজ্ঞান এবং যোগোপলব্ধির দ্বারা সেই পুত্রশোক দমন করেছেন ব্যাস, কিন্তু একান্ত মানুষোচিত এবং কবিজনোচিত বেদনাবোধ ত্যাগ করতে পারেননি বলেই আজকে তিনি রাজপুরীতে উপস্থিত হয়েছেন তৃতীয় ব্যক্তির মতো।
তারই অঙ্গজাত প্রথম পুত্র ধৃতরাষ্ট্র এখন হস্তিনাপুরের কার্যনির্বাহী রাজা। পাণ্ডুর মৃত্যুর পরে তার স্ত্রীর কী গতি হবে, তার পঞ্চ পুত্র এই রাজ্যে কী মর্যাদায় থাকবে–এসব কূট প্রশ্নের মধ্যে তিনি যাননি অথবা এসব প্রশ্নের সমাধানও তিনি চাননি। ধৃতরাষ্ট্রের প্রশাসনে একবারও তিনি মাথা গলাননি। কিন্তু পূর্বাপর সমস্ত ঘটনার ওপর তার সজাগ দৃষ্টি আছে। দীর্ঘ পনেরো-কুড়ি বছর পাণ্ডু হস্তিনাপুরের রাজত্ব ছেড়ে শতশৃঙ্গবাসী হয়েছেন, কেন তিনি গেলেন, কেন তিনি ফেরেননি অথবা কেনই বা তাকে ফেরানো হয়নি–এসব প্রশ্ন তিনি করেননি। করেননি, কেননা, তিনি যতখানি ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডুর জন্মদাতা পিতা, তার থেকেও বেশি তিনি ঋষি, তার থেকেও বেশি তিনি কবি।
এক ঋষি-কবি যখন আপন বংশজের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন, তখন ওই সব রাজনৈতিক কূটের মধ্যে না গিয়ে তিনি ইঙ্গিতে কথা বলেন। সবচেয়ে বড়ো কথা–এই হস্তিনাপুরে তার জন্মদাত্রী মা রয়ে গেছেন, এবং তিনি যথেষ্ট ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা। যে সব প্রশ্ন তিনি করেননি, সে সব প্রশ্ন যে কোনও মুহূর্তে তার মুখ দিয়ে বেরতে পারে। জননী সত্যবতী ছাড়াও এখানেই রয়ে গেছেন ধৃতরাষ্ট্র পাণ্ডুর মা অম্বিকা এবং অম্বালিকা। তাদের একজন এখনও পুত্রবতী, অন্যজন পুত্রহীনা। জননী সত্যবতী তো বটেই, অম্বিকা-অম্বালিকাও এখন যথেষ্ট বয়স্কা মহিলা।
এঁদের সবার কথা মনে করে, কুরুবাড়ির বিশাল দুর্ঘটনার কথাটাও যথেষ্ট খেয়াল করে কবি-ঋষি তার জননী সত্যবতীর কাছে উপস্থিত হলেন। মহারাজ শান্তনুর যে বংশ সত্যবতীর চেষ্টায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, অন্যের ঔরসজাত হলেও যে পৌত্রের মাধ্যমে তিনি হস্তিনাপুরের রাজাকে পেয়েছিলেন, সেই পৌত্রের মৃত্যুতে বৃদ্ধা সত্যবতী প্রায় অচেতন অবস্থায় শোকাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন নিজের ঘরে। ব্যাস সেই ঘরে উপস্থিত হলেন স্থিতধী ঋষির গাম্ভীর্যে। ডাকলেন–মা! ওঠো। মনে রেখো–তোমার সুখের দিন চলে গেছে। এখন যে দিন আসবে তা হবে ভীষণ থেকে ভীষণতর–অতিক্রান্তসুখাঃ কালা পর্যপস্থিত দারুণাঃ। কাল, আগামিকাল বলে যে সময়টাকে তুমি সুখের ভাবছ, সেই কাল আরও কষ্ট বয়ে নিয়ে আসবে দিন, দিন। কেন জান, পৃথিবী আজ তার যৌবন হারিয়ে ফেলেছে–শঃ স্বঃ পাপিষ্ঠদিবসঃ পৃথিবী গতযৌবনা।
মানুষের পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনে এর থেকে দামী উপদেশ বুঝি আর কিছু হতে পারে না। পৃথিবী তার যৌবন হারিয়েছে–এই কথাটি প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনে এমন ধ্রুব সত্য যে, আমরা ইচ্ছে করেই এই হৃতযৌবনা পৃথিবীর কথা ভুলে যাই। মানুষের যতদিন কর্মদক্ষতা থাকে, যতদিন সংসার–পরিবারের ওপর তার আধিপত্য থাকে, পৃথিবীর যৌবনও তার কাছে ততদিনই। তারপর পুত্র-কন্যা যখন বড় হয়, সংসার যখন আপনি নিয়মে পুত্র-পুত্রবধূর হাতে চলে যায়, তখনি পিতা-মাতার কাছে পৃথিবী গতযৌবনা। কিন্তু মানুষ সংসারের ওপর তার পূৰ্বাধিকার ভুলতে পারে না বলেই গতযৌবনা পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে নিজেকে বারংবার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠা আর আসে না, কারণ ততদিনে যৌবনবতী পৃথিবী ধরা দিয়েছে তারই পুত্র-পুত্রবধূর কাছে।
