মুনিদের অভিপ্রেত ছিল–পাণ্ডুর প্রথম পত্নী এবং তাঁর পুত্রেরা যাতে হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতে পুনর্বাসিত হন। সেই কাজের কথাটুকু শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই তারা চলে গেছেন। যাতে প্রতিবাদ বা সংশয়ের সুযোগই না আসে, সেই কারণেই তড়িঘড়ি চলে গেলেন মুনিরা–ক্ষণেনান্তৰ্হিতাঃ সর্বে তাপসাঃ গুহ্যকেঃ সহ।
হস্তিনাপুরের কার্যনির্বাহী রাজা ধৃতরাষ্ট্রের ঘাড়েই সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ল। তিনি ছোট ভাই বিদুরকে ডেকে বললেন–মহারাজ পাণ্ডু এবং তার স্ত্রীর সকারের ব্যবস্থা করো রাজকীয় মর্যাদায়। রাজা এবং রানীর অনন্তকাল স্বর্গবাসের জন্য দান-ধ্যানের ব্যবস্থা করো। পণ্ড, বস্ত্র, স্বর্ণ–যে যা চায় তাই দাও। পাণ্ডু এবং মাদ্রীর দেহ একত্রে আবৃত করে দাহের ব্যবস্থা করো, যাতে বায়ু এবং সূর্যও মাদ্রীর দেহটি দেখতে না পান–যথা চ বায়ু-নাদিত্যঃ পশ্যেতাং তাং সুসংবৃতাম্।
এই প্রসঙ্গে দু-একটি কথা বলে নেওয়া ভাল। প্রথম কথা হল–সতেরো দিন আগে পাণ্ডু এবং মাদ্রী মারা গেছেন এবং তাদের দেহদুটি যথাসম্ভব অবিকৃত অবস্থায় হস্তিনাপুরে যেভাবে নিয়ে আসা হয়েছে, তাতে বোঝা যায় যে, মহাভারতের প্রাচীনেরা তেমন কিছু প্রলেপন-অনুলেপনের কথা জানতেন যাতে মৃতদেহ অন্তত কিছুদিন অবিকৃত থাকে। দ্বিতীয়ত মাত্রা যে পাণ্ডুর সঙ্গে সহমৃতা হলেন, এটাতে যেন কখনই সতী-প্রথার কথা স্মরণে না আসে। মাদ্রীকে কেউ স্বামার চিতায় আরোহণ করতে বলেননি, তিনি নিজেও স্বামীর চিতায় ঝাঁপ দেননি। স্ব-সহবাসে স্বামীর মৃত্যু ঘটায় তার মনে যে অনুতাপ জন্মেছিল, তাতে তিনি স্বেচ্ছায় আপন সহজাত সংস্কারে যোগজ মৃত্যু বরণ করেছিলেন। এর সঙ্গে সতীদাহ প্রথার কোনও সম্বন্ধ নেই। তৃতীয়ত ধৃতরাষ্ট্র যে মাদ্রীকে অসূর্যম্পশ্যা অবস্থায় দাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে এটা মনে করার কারণ নেই যে, তিনি পর্দা-প্রথা পছন্দ করতেন। মহাভারতের রমণীরা অনেক বিষয়েই খুব স্বাধীন ছিলেন এবং ধৃতরাষ্ট্রের এই আদেশও মাদ্রীর স্বাধীন ইচ্ছার মূল্যই সূচনা করে।
যাইহোক, ধৃতরাষ্ট্রের আদেশ অনুসারে বিদুর পাণ্ডুর সৎকারের বিধি-ব্যবস্থায় মন দিলেন। রাজপুরোহিতরা ঘৃতপূর অগ্নিপাত্র নিয়ে নগরের বাইরে গেলেন। পাণ্ডুর জ্ঞাতি, বন্ধু এবং অমাত্যরা পাণ্ডু এবং মাদ্রীকে একটি শিবিকায় স্থাপন করে বস্ত্রের দ্বারা তাদের মৃতদেহ আবৃত করলেন। সময়োপযুক্ত রাশি রাশি ফুল-মালা, গন্ধ সেই আবৃত শরীর দুটিকে মৃত্যুর সহনীয়তা প্রদান করল–তাং তথা শোভিতাং মাল্যৈবাসোভিশ্চ মহাধনৈঃ। পৌর-জনপদবাসীরা কেউ শব-শরীরের ওপর ছাতা ধরে রইল, কেউ চামর দোলাতে লাগল, অনেকে এই রাজকীয় শবযাত্রায় বাদ্যধ্বনি করতে করতে এগিয়ে চলল। প্রিয় রাজার মৃত্যুতে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র সকলেই শোক-সন্তপ্ত হয়ে মৃতদেহের পিছন পিছন চলল।
এরপর গঙ্গার তীরে একটি বনের মধ্যে যথাসম্ভব সমতল ভূমির ওপর শবদেহবাহী শিবিকাটিকে রাখলেন পঞ্চপাণ্ডব ভীষ্ম এবং বিদুর। তারপর দাহকার্যের প্রক্রিয়ায় একবার শবদেহ-দুটি অগুরু-চন্দনে লেপন করানো হল, একবার স্বর্ণকুম্ভের জলে স্নান করানো হল, আবার পুন্নাগ ফুলের নির্যাস মাখিয়ে সাদা কাপড় দিয়ে তাদের মুড়ে দেওয়া হল। সেই সময় পাণ্ডুকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছেন। মাদ্রী তেমনি আবৃতা অবস্থায় পুষ্পে গন্ধে মাল্য সুশোভনা হয়েই আছেন। এবার পুরোহিতদের অনুমতি নিয়ে সুগন্ধী চন্দন কাঠ, স্থলপদ্মের কাঠ এবং আরও সব সুগন্ধী কাঠ দিয়ে পাণ্ডু এবং মাদ্রীর দাহকার্য সম্পন্ন করা হল।
পঞ্চপাণ্ডব, ভীষ্ম, বিদুর এঁরা সব আগে থেকেই কাঁদছিলেন। কিন্তু পাণ্ডুর দেহটি ভস্মীভূত হবার পর পাণ্ডুর স্নেহময়ী জননী অম্বালিকা মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়লেন। যে শরীর তিনি গর্ভে ধারণ করেছিলেন, যে শরীরকে তিনি স্নেহ-মমতায় বড় করেছেন, সেই শরীরের এতটুকু অবশেষও রইল না। অম্বালিকা মূৰ্ছিত হয়ে পড়লেন। ওদিকে পাণ্ডুর জ্যেষ্ঠা মহিষী কুন্তীকে আর বাগ মানানো যাচ্ছিল না। তার করুণ আর্তনাদে গঙ্গার তীরভূমি, বন-বনান্তের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। পৌর-জনপদবাসীরা তার দুঃখে সমদুঃখিত হয়ে আর্তনাদ করতে লাগলেন–কুন্ত্যাশ্চৈবার্তনাদেন সর্বাণি চ বিচুশুঃ। কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম, বিদুর, ধৃতরাষ্ট্র এবং কুরুকুলের বিধবা রমণীরা পঞ্চ পাণ্ডব এবং কুন্তীকে সঙ্গে নিয়ে পুণ্যবাহিনী গঙ্গায় স্নান-তর্পণ করলেন।
গঙ্গার তীরে একটি অস্থায়ী আবাস নির্মিত হল। সেখানে কুরুবংশীয় জ্ঞাতি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মাটিতে শুলেন। পৌর-জনপদবাসীরাও রাজভক্তিতে পাণ্ডব এবং অন্যান্য কুরুবীরদের সঙ্গে বারোদিন সমস্ত আমোদ ত্যাগ করে একই অশৌচব্রত পালন করলেন। তেরো দিনের দিন পাণ্ডু এবং মাদ্রীর শ্রাদ্ধ-কার্য, দান-ধ্যান এবং মহাগুরু নিপাতের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হল।
এই ঘটনার পর আমরা পাণ্ডবদের হস্তিনায় ফিরে আসতে দেখছি। কিন্তু ভারি আশ্চর্য, পিতৃহীন পঞ্চপাণ্ডবদের সহযাত্রী হিসেবে এখানে ধৃতরাষ্ট্র বা অন্য কোনও মহান কুরুবংশীয়দের কথা একবারও উল্লেখ করলেন না মহাভারতের কবি। আমরা দেখছি–পাণ্ডবদের অশৌচান্তে হস্তিনাপুরের পুরবাসীরাই পাণ্ডবদের সঙ্গে নিয়ে হস্তিনায় ফিরছে–পাণ্ডবান ভরতভা। আদায় বিবিশুঃ সর্বে পুরং জানপদস্তুদা। এই একটি মাত্র পংক্তিতেই মহাভারতের কবি বুঝিয়ে দিলেন, হস্তিনাপুরের কার্যনির্বাহী রাজশক্তি নয় পাণ্ডবদের পিছনে রইল মানুষের শক্তি। তাদের শক্তিই তাদের মৃত রাজার পুত্রদের পুনর্বাসন ঘটাবে।
