মাদ্রী সহমরণে গেলেন মানে, তিনি স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় ঝাঁপ দিলেন, তা নয় কিন্তু। মাদ্রী যোগবলে আপন মৃত্যুবরণ করলেন। সেকালের দিনে মুনি-ঋষি থেকে আরম্ভ করে রাজা এবং অন্যান্য মহাসত্ত্ব ব্যক্তিরাই যোগ-সাধনা জানতেন। যোগ-সাধনার দ্বারা প্রাণবায়ু নিরোধ করার কৌশল যাঁরা জানতেন, তাদের মরণ ছিল অনায়াম। মাদ্রী সেই যোগজ মৃত্যু ঘটালেন নিজের।
অল্প ব্যবধানে মহারাজ পাণ্ডু এবং তার প্রিয়া পত্নী মাদ্রীর মৃত্যুর পর শতশৃঙ্গবাসী মুনি-ঋষিদের মধ্যে এক প্রস্থ আলোচনা হল। তপস্বীরা বললেন–মহাত্মা পাণ্ডু রাজ্য এবং রাজত্ব ত্যাগ করে এই জায়গায় এসে তপস্যা করেছিলেন এবং আমরা তপস্বীরাই ছিলাম তার পরম আশ্রয়। তিনি তার শিশু পুত্রদের এবং জ্যেষ্ঠা মহিষী কুন্তীকে আমাদের কাছেই গচ্ছিত রেখে স্বর্গে গেছেন–প্রদায়োপনিধিং রাজা পাণ্ডুঃ স্বর্গমিতো গতঃ। এই অবস্থায় আমাদের একটা কর্তব্য আছে। রাজার মৃত শরীর, তাঁর স্ত্রীর শব-দেহ এবং তার জীবিত পুত্র-পরিবারবর্গকে নিয়ে আমাদের উচিত হস্তিনাপুরে যাওয়া। এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত কাজ হবে।
ঋষি-মুনি-তপস্বীরা পরস্পর আলোচনা করে রাজা-রানীর শব-দেহ এবং সপুত্ৰক কুন্তীকে নিয়ে রওনা দিলেন হস্তিনাপুরের পথে। স্বামী এবং ছোট সতীন মারা গেছেন বলে কুন্তীর মনে দুঃখ কিছু কম ছিল না, কিন্তু এতদিন পরে তিনি হস্তিনাপুরে যাচ্ছেন, পুরাতন আত্মীয়-স্বজন সবার সঙ্গে দেখা হবে–এসব ভেবে তার কিছু আনন্দও হচ্ছিল। বস্তুত প্রিয়জনের বিয়োগ ঘটলে মানুষ স্বজনকেই কাছে পেতে চায়। স্বজনের কাছে শোক প্রকাশ করতে পারলে প্রাণে কিছু শান্তি আসে। সে জন্যও বটে, আবার হস্তিনাপুরের সকলের সঙ্গে এতদিন পর দেখা হবে, সে জন্যও কুন্তীর মনে কিছু সুখ আছে। সকলের সঙ্গে দেখা হবার ঔৎসুক্যেই শতশৃঙ্গ থেকে হস্তিনাপুরের দীর্ঘ পথ কুন্তীর কাছে অনেক সংক্ষিপ্ত মনে হল–প্রপন্না দীর্ঘমধ্বানং সংক্ষিপ্তং তদমন্যত।
মনস্বিনী কুন্তী ঋষিদের তত্ত্বাবধানে কুরু-রাজধানীর বিশাল দ্বারদেশে উপস্থিত হলেন। সঙ্গে যুধিষ্ঠির। তার বয়স তখন ষোলো। পনেরো বছরের ভীম এবং অর্জুনের বয়স চোদ্দো এবং নকুল-সহদেবের বয়স তেরো। পাঁচ ছেলেকে পাশে নিয়ে কুন্তী যখন রাজদ্বারে এসে পৌঁছলেন, তখন ঋষিরা দ্বাররক্ষীকে বললেন–রাজাকে জানাও আমরা তাঁর দর্শনপ্রার্থী দ্বারিনং তাপসা ঊচু রাজানঞ্চ প্রকাশয়।
দ্বাররক্ষীরা যখন হস্তিনাপুরের কার্যনির্বাহী রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে মুনিদের আগমন নিবেদন করল, তখন সবেমাত্র সকাল হয়েছে–মুহূর্তোদিত আদিত্যে। সঙ্গে সঙ্গে খবর ছড়িয়ে পড়ল রাজধানীর সর্বত্র। সমস্ত দিক থেকে কুরুদেশবাসী মানুষ ছুটে আসতে লাগলেন। অভিজাত সম্প্রদায় যানবাহনে চড়ে আসতে লাগলেন, নিম্নস্তরের মানুষ এলেন পায়ে হেঁটে। তপস্বীরা কুরুদেশের রানী এবং পাঁচটি ছেলেকে নিয়ে রাজদ্বারে প্রতীক্ষা করছেন–এই খবর এক অদ্ভুত কৌতূহল সৃষ্টি করল জনপদবাসীর মনে। অল্প সময়ের মধ্যেই রাজবাড়িতে ভিড় জমে গেল–মহান্ ব্যতিকরো ভবৎ।
বাইরে ঋষি-মুনিরা দাঁড়িয়ে আছেন শুনে কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম এবং মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়-বিদুরকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ির বাইরে এলেন অভিবাদন জানাতে। ওদিকে বৃদ্ধা রানী সত্যবতী, অম্বিকা-অম্বালিকা এবং গান্ধারীও বেরিয়ে এলেন অন্তঃপুরের মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে।
এগুলো হল সেকালের দিনের প্রোটোকল। ঋষি মুনিরা এলে এইরকম ঠাটে-বাটেই তাদের অভিনন্দন জানাতে হবে। সঙ্গে থাকতে হবে রাজবাড়ির পুরোহিতকেও। কৌরব-কুলের প্রধান পুরুষেরা সপুরোহিত রাজদ্বারে এসে অভিবাদন জানিয়ে সেইখানেই বসে পড়লেন। তাঁদের দেখাদেখি পৌ-জনপদবাসীরাও সকলেই বসে পড়লেন মাটিতে। কুন্তীর সঙ্গে যে মুনি-ঋষিরা এসেছিলেন, তারা রাজবাড়ির ভিতরে ঢুকতে চান না বোধহয়। তারা কুন্তীর কথা বলতে এসেছেন বটে, কিন্তু মহারাজ পাণ্ডুর অবর্তমানে যে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তাতে এই রাজবাড়িতে যদি কুন্তী এবং তাঁর পুত্রদের জায়গা না হয়, তাহলে মুনি-ঋষিরাই তার আবাসনের ব্যবস্থা করবেন–এইরকম একটা ধারণা থেকেই তারা রাজবাড়ির ভিতরে প্রবেশ করেননি হয়তো।
যাই হোক, পাণ্ডুর জ্যৈষ্ঠা পত্নী ফিরে এসেছেন, অথচ তার সঙ্গে পাণ্ডু নেই, তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী মাদ্রী নেই অথচ এঁদের সঙ্গে কতগুলি পনেরো-ষোলো বছরের ছেলে–এত সব দেখে পৌর-জনপদবাসীদের আলাপ, সংশয় এবং বিচিত্র সিদ্ধান্তের অন্ত রইল না। কুরুবৃদ্ধ ভীষ্ম এবার হাত তুলে ইঙ্গিত করলেন তিনি কিছু বলতে চান। নিমেষের মধ্যে জনতার মুখ স্তব্ধ হল। ভীষ্ম মুনি-ঋষিদের পায়ে পাদ্য-অর্ঘ্য নিবেদন যথানিয়মে অভিবাদন শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই জটাধারী এক বৃদ্ধ মুনি ভীষ্মকে উদ্দেশ্য করেই বলতে আরম্ভ করলেন–আপনাদের কুরুরাজ্যের উত্তরাধিকারী মহারাজ পাণ্ডু স্বেচ্ছায় তার রাজসুখ ত্যাগ করে আমাদের নিবাস শতশৃঙ্গ পর্বতে গিয়েছিলেন। সেখানে অলৌকিক উপায়ে ধর্মদেবের কাছ থেকে এই জ্যেষ্ঠ পুত্র লাভ করেছেন। এঁর নাম যুধিষ্ঠির–সাক্ষাদ্ধৰ্মাদয়ং পুত্ৰস্তত্র জাতত যুধিষ্ঠিরঃ।
বৃদ্ধ ঋষি একে একে ভীম, অর্জুন এবং মাদ্রীর দুই পুত্রকেও পরিচয় করিয়ে দিলেন ভীষ্ম এবং অন্যান্যদের সঙ্গে। পাণ্ডু যে বহুকাল অপুত্রক ছিলেন এবং সে জন্য হস্তিনা-নিবাসী রাজ-পরিবারের সংশয় জন্মাতে পারে ভেবেই বৃদ্ধ ঋষি তদানীন্তন সংস্কারের কথাই যেন স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন–মহারাজ পাণ্ডু বনে থেকেও পৈতৃক বংশ স্থাপন করে গেছেন–এষ পৈতামহো বংশঃ পাণ্ডুনা পুনরুদ্ধৃতঃ। তাছাড়া পুত্রেরা যথেষ্ট গুণবান, আপনারা তাদের দেখে খুশি হবেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যথেষ্ট সৎপথে থেকেও এতগুলি গুণবান পুত্র লাভ করেও আজ থেকে ঠিক সতেরো দিন আগে পাণ্ডু পরলোক গমন করেছেন–পিতৃলোকং গতঃ পাণ্ডুরিতঃ সপ্তদশেহনি। পাণ্ডুর মৃত্যু দেখে তাঁর সহধর্মচারিণী মাদ্রী-দেবীও স্বামীর সঙ্গে সহমৃতা হয়ে পতিলোক গমন করেছেন। এই দুটি তাদের শব-দেহ আর এই তাঁদের পাঁচটি পুত্র। যাঁরা বেঁচে আছেন–অর্থাৎ এই কুন্তী এবং পাণ্ডুর পাঁচ পুত্র–আপনারা তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করবেন বলে আশা করি–ক্রিয়াভিরনুগৃহ্যাং সহ মাত্রা পরন্তপাঃ।
