মৃগমুনির শাপের অন্তরে মহাভারতের কবির কী অভিপ্রায় লুকানো ছিল জানি না, তবে কবিত্বের সারমর্ম এই বুঝি–স্ত্রী-সহবাস রাজার বারণ ছিল। তাঁর মৃত্যু স্ত্রী-সহবাসের অব্যবহিত পরে সংঘটিত হওয়াতেই অভিশাপের অবতারণা করা হয়েছে হয়তো, এবং এই মৃত্যুকে বরণ করা হয়েছে জেনেশুনে।
মাদ্রী এখন খুবই বিস্রস্ত অবস্থায় আছেন। বসন্তের আভরণের সঙ্গে পাণ্ডুর মৈথুন-পূরাক্রম মিশ্রিত হওয়ায় তার পরিধেয় বাস এখন বিপর্যস্ত। রাজার আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি এখন কী করবেন কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু কুন্তীর উদ্দেশে চিৎকার করতে লাগলেন। কুন্তী তার পাঁচ পুত্রকে নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মাদ্রীর করুণ চিৎকার শুনে তিনি তার কাছে যাবার জন্য প্রস্তুত হলে মাদ্রী নিজেই নিজের বিস্রস্ত অবস্থা বুঝে কুন্তীকে বললেন–তুমি একা একবার এখানে এসো দিদি, ছেলেরা ওখানেই থাক–একৈব ত্বমিহাগচ্ছ তিষ্ঠত্রৈব দারকাঃ।
কুন্তী অজানা ভয়ে বালকদের এক জায়গায় রেখে নিজে এলেন মাদ্রীর কাছে। রাজাকে দেখে তার বুক কেঁপে উঠল। রাজা মৃত, ভূতলশায়িত। তার পাশে বিস্ৰস্তবাসে মাদ্রী। রাজাকে তদবস্থায় দেখে কুন্তীর যত না দুঃখ হল, তার চেয়েও বেশি রাগ হল মাদ্রীর ওপর। মাদ্রীর উদ্দেশে তিনি চেঁচিয়ে উঠে বললেন–সদাসর্বদা আমি রাজাকে রক্ষা করে চলতাম, যাতে স্ত্রী-মৈথুনে তার প্রবৃত্তিই না হয়। তিনি নিজেও এ ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন–রক্ষ্যমানো ময়া নিত্যং বনে সততমাত্মবান্। কিন্তু কেমন করে তারপরও এই ঘটনা ঘটল? কেন এবং কেমন করে হঠাৎ তিনি এইভাবে তোর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন–কথং ত্বম্ অভ্যতিক্রান্ত? মৃগমুনির অভিশাপের কথাও কি কিছুই মনে ছিল না। যেখানে তোরই উচিত ছিল রাজাকে বাঁচিয়ে চলা, সেখানে কেন এইভাবে তুই একা নির্জনে এসে রাজাকে ভোলালি–সা কথং লোভিবতী বিজনে ত্বং নরাধিপ? রাজাকে তো আমিও দেখেছি নাকি? শাপের কথা মনে করে বারবার তিনি দুঃখ করতেন আমার কাছে। আমি আমল দিতাম না। কিন্তু আজ কী এমন ঘটল যে, সব দুঃখ ভুলে গিয়ে তাঁর এত আনন্দের কারণ ঘটল? এত আনন্দ কি তোকে দেখে?
কুন্তী অনেক বকাবকি করলেন মাদ্রীকে কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তার চেতনা হল যে, যিনি গেছেন, তিনি আর ফিরবেন না। দুঃখে কষ্টে তার হৃদয় মথিত হল। বুঝলেন যে, এখানে মাদ্রীর যত দোষ, রাজারও ঠিক ততটাই। করুণাঘন স্বরে তখন তিনি মাদ্রীর হাত ধরে বললেন–তবু তোর কত ভাগ্য বোন। তুই তাঁর সানন্দচিত্ত পরিহৃষ্ট মুখখানি শেষবারের মতো দেখেছিস–দৃষ্টবত্যসি যদবং প্রহৃষ্টস্য মহীপতেঃ। আমি তো তাও দেখিনি। মাদ্রী এতক্ষণে একটু সাহস পেলেন। বললেন–দিদি! আমি বহুবার তাকে বারণ করেছি, কিন্তু তিনি বাধা মানেননি। শোনেননি আমার কথা–আত্মা ন বারিতোনেন সত্যং দিষ্টং চিকীর্ষণ।
কুন্তী মাদ্রীর কথা বুঝলেন। তারপর তাকে বুঝিয়ে বললেন–যাক, যা হবার তা হয়েই গেছে। কিন্তু আমি তার জ্যেষ্ঠা ধর্মপত্নী। অন্তত ধর্মের ফল তো আমারই প্রাপ্য। কাজেই আমাকে যেন তুই সহমরণে যাবার পথ থেকে নিবৃত্ত করিস না–অহং জ্যেষ্ঠা ধর্মপত্নী জ্যেষ্ঠং ধর্মফলং মম।
কথাটার মধ্যে সামান্য একটু কথা আছে। আসলে যাঁকে প্রথম বিবাহ করা হত, সেই রমণী পুত্রবতী হলে, সেই রমণী এবং পুত্রের মাধ্যমে ধর্মফল লাভ করতেন বলে মনে করতেন আগেকার মানুষ। সেই জন্যই মাদ্রীর প্রতি কুন্তীর এই কুটিল ইঙ্গিতটুকু আছে। ভাবটা এই আমি রাজার ধর্মবাসনা পূরণ করেছি, আর তুই তার কামনা পূরণ করেছিস। এখন তুই আমার মৃত স্বামীকে রেখে উঠে আয়। আমাদের ছেলেগুলিকে মানুষ করার দায়িত্ব নে–উত্তিষ্ঠ ত্বং বিস্জ্যৈনমিমা পালয় দারকা।
মাদ্রী সানুনয়ে কেঁদে বললেন–আমার এই যৌবন এই বয়স। রাজার সঙ্গে কাম উপভোগ করে মোটেই আমার তৃপ্তি শেষ হয়ে যায়নি। এই আমার স্বামী আমার সঙ্গে মিলিত হতে গিয়েই মারা গেলেন। আমার ইচ্ছে, আমি অন্তত পরলোকে গিয়েও তার বাসনা পূরণ করব–তমুচ্ছিন্দ্যামস্য কামং কথং ন যমসাদনে। আরও একটা কথা এবং এর চেয়ে বড় সত্যি আর নেই। আমি তোমার ছেলেদের সঙ্গে নিজের ছেলের মতো ব্যবহার হয়তো করতে পারব na। হয়তো কেন পারবই না–ন চাপ্যহং বর্তয়ন্তী নির্বিশেষং সুতেষু তে। কিন্তু তোমাকে দেখেই বুঝি–আমার পুত্রদের প্রতি তুমি নিজের পুত্রের মতোই ব্যবহার করতে পারবে। অতএব সেই জন্যই তুমি আমাকে সহমরণে যাবার অনুমতি দাও–জ্যেষ্ঠে মাম্ অনুমন্যতা।
.
৯৩.
মরণকালে মানুষ যা চায়, পরলোকে তাই পায় বলে মানুষের একটা সংস্কার ছিল। মহারাজ পাণ্ডু যেহেতু রমণকালেই মৃত্যুমুখে পতিত হলেন তাই মাদ্রী ভেবেছিলেন–তিনি অনুমৃতা হলে পাণ্ডু মাদ্রীর মাধ্যমেই সেই সুখাভিলাষ পূরণ করতে পারবেন–মাং হি কাময়মানোয়ং রাজা প্রেতবশং গতঃ। মাদ্রী কুন্তীকে আবারও অনুনয় করে বললেন–তুমি আমার ছেলে দুটিকে নিজের ছেলের মতো মানুষ কোরো। আর আমার শরীরটিকে রাজার মৃত-শরীরের একত্র আবৃত করে দাহ কোরো। আমার এই আর্জিটা যদি রাখো, তবে বুঝব তুমি আমার প্রিয় কাজটিই করেছ–দগ্ধব্যং সুপ্রতিচ্ছন্নমতদর্থে প্রিয়ং কুরু। তুমি চিরকালই আমার ভাল চেয়েছ, কাজেই এবারও তুমি তাই করবে, দিদি।
